জোর হাওয়া এসে পাল ফুলিয়ে নিয়ে বিশাল নদীর বুকে বজরাটি দ্রুত ভেসে চললো। খোলা ডেকে শিল্পীরা যন্ত্রসঙ্গীত পরিবেশন করতে লাগলো, ভাঁড় আর হাতের ভেল্কি দেখিয়ে অন্যান্য পেশাদার বিনোদনকারীরাও তাদের পরিবেশনা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করলো। বেকাথা আমাকে বাও খেলায় হারাল আর জারাস তেহুতিকে তার সাম্প্রতিক কবিতা আবৃত্তি করে শোনাল। এসব কবিতা অবশ্য যুদ্ধ জয়ের বর্ণনা আর মৃত্যুর কথা ছিল না। এতে ছিল ভগ্ন হৃদয় আর প্রতিদানহীন আবেগের কথা, যা রাজপরিবারের অন্তত একটি সদস্যের চোখে অশ্রু এনে দিয়েছিল।
বিনোদনের পাশাপাশি আমি ফাট তুরের সাথে পরামর্শ করতে লাগলাম কীভাবে রাজা নিমরদের সেনাবাহিনী আর রথীদের কাজে লাগানো যায়।
.
আমার জীবনে এমন অবাক খুব বেশি হই নি। নগরীর যে বর্ণনা শুনে আমি মনে করেছিলাম অতিশয়োক্তি এখন মনে হল তা আসলে কম বলা হয়েছিল।
নদীর দুই তীর জুড়ে বিস্তৃত এই উজ্জ্বল চকচকে নগরীর তুলনায় একশো ফটকসহ আমার সুন্দর থিবসকে একটি সাদামাটা গ্রাম মনে হল। এর আগে বিভিন্ন অট্টালিকার যেসব চিত্র আর স্কেচ আমি দেখেছিলাম এখন সেই স্থাপনাগুলো দেখে চিনতে পারলাম। তবে এই বিস্ময়বহ কর্মগুলোকে প্যাপিরাসে তুলে ধরাটা অনেকটা এক বালতি লোনা পানিতে মধ্য সাগরকে দেখানোর মতো মনে হল।
চকচকে সাদা মার্বেল পাথরে তৈরি মারদুকের প্রাসাদটি নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত। ফাট তুর গলুইয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়ে আমার সন্দেহ নিরসন করে তা নিশ্চিত করলো।
পুব থেকে পশ্চিমে প্রাসাদটি অর্ধলিগ পর্যন্ত বিস্তৃত আর থিবসের ফারাওয়ের প্রাসাদের তিনগুণ উঁচু। এর সামনের দিকে নদীর উত্তর দিকে রয়েছে ঝুলন্ত উদ্যান। মারদুক এমনভাবে এটি তৈরি করেছে যাতে প্রাসাদের প্রত্যেক অলিন্দ আর বারান্দা থেকে এই চমৎকার জিনিসটি সম্পূর্ণভাবে দেখা যায়।
প্রাসাদের সামনে অনেক উঁচুতে কতগুলো খোলা গ্যালারির সমন্বয়ে বাগানটি গড়ে উঠেছে। মারদুকের স্থপতিরা তাদের সৃজনী ক্ষমতা দিয়ে এমন একটি দৃষ্টিবিভ্রম সৃষ্টি করেছিল যেন বাগানগুলো মাটির উপর দাঁড়িয়ে নেই, এগুলো অলৌকিকভাবে আকাশ থেকে ঝুলে রয়েছে। এগুলো এমন কোণে কাত করা রয়েছে যে, নদীর বিপরীত তীরে প্রাসাদ থেকে একজন পর্যবেক্ষক গ্যালারি জুড়ে একটি অরণ্য সৃষ্টি করা প্রতিটি গাছ আর চারা দেখতে পাবে।
নীল নদীর তীরে মেশিরে বিরাট এলাকা জুড়ে ফারাও আমাকে যে জমি দান করেছিলেন, তারপর থেকেই বৃক্ষরোপনের বিষয়ে আমার আগ্রহ আচ্ছন্নতার পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। এখন আকাশের বুকে এই চমৎকার বাগানটি দেখে আমার নিজের উর্বর জমিগুলোকে নগণ্য মনে হল।
শূন্যে এই বাগানগুলো দেখে আমি ফাট তুরকে বললাম, আমি গাছ আর সবুজ বনানী ভালোবাসি। এটি আমার মনে আনন্দ দেয় আর আত্মার প্রশান্তি এনে দেয়।
ফাট তুর শুষ্ক মন্তব্য করলো, রাজা মারদুক নিশ্চয়ই আপনার মতোই গাছপালা ভালোবাসতেন। তবে এই লক্ষ্য অর্জন করতে গিয়ে তিনি তার জাতিকে দারিদ্রের মুখে ঠেলে দেন।
ভাবলাম প্রসঙ্গটা এখন পরিবর্তন করলেই ভালো হবে। রাষ্ট্রদূত জানে না যে আমার উটের হাওদার থলেগুলোতে বিশাল রূপার ভান্ডার আছে। তার একটি অসতর্ক মন্তব্য রাজা নিমরদকে এর অস্তিত্ব সম্পর্কে সাবধান করে দিতে পারে। প্রত্যেক শাসকই অর্থের জন্য ভেতরে ভেতরে লোলুপ দস্যু আর হিংস্র শিকারী হয়ে উঠে। আর নিমরদও যে সেরকম হয়ে উঠবে না তা ভাবার কোনো কারণ নেই।
আমি ফাট তুরকে জিজ্ঞেস করলাম, ওরা এই গাছগুলোতে কীভাবে পানি দেয়?
নদীর বুক থেকে বাগানের উপরের গ্যালারির সর্বোচ্চ বিন্দুতে বাঁকা হয়ে উঠে যাওয়া ব্রোঞ্জের স্তম্ভগুলো দেখিয়ে সে বললো, রাজা মারদকের প্রকৌশলীরা ঐ পানির প্যাঁচকলগুলো বানিয়েছে। আমি আরও ভালোভাবে লক্ষ্য করে দেখলাম স্তম্ভগুলো আসলে কতগুলো ফাপা নল, ধীরে ধীরে ঘুরছে।
এগুলো কীভাবে ঘুরছে?
ফাট তুর ব্যাখ্যা করলো, আপনি তাকালে দেখতে পাবেন, এগুলোর উপরে বাতাস কল রয়েছে। আর নদীতে পানি চালিত পাম্প আছে। নলের মধ্যে যে প্যাঁচগুলো আছে নদীর স্রোতের টানে তা ঘুরতে থাকে। ঘূর্ণায়মান প্যাঁচগুলো হাতার মতো পানি উপরের দিকে নলের একেবারে মাথায় উঠিয়ে নেয়। তারপর উপরের দিকে নির্দেশ করে বললো, ঐ যে দেখতে পাচ্ছেন?
আমি উপরে তাকিয়ে দেখলাম নদীর পানি উপরে উঠে নলের মাথার শেষ প্রান্ত থেকে একটি নালার মাধ্যমে থেকে নিচে গ্যালারীর সবজায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। কী সহজ পরিকল্পনা অথচ কি সুন্দর। এই বুদ্ধিটা আমার মাথায় কেন আসেনি ভেবে আমি লজ্জিত হলাম। মেশিরে আমার বাগানে ফেরার সাথে সাথে এই পরিকল্পনাটি কাজে লাগাবো। আমার জমিতে সার ব্যবহার করে উৎপাদন চারগুণ বাড়িয়েছি। আর এরকম পাঁচকলের মাধ্যমে জমিতে পানি ঢেলে তা আরও দ্বিগুণ করে তুলতে পারি। অবশ্য থিবসে কাউকেই বলার দরকার নেই যে এটা আমার আবিষ্কার নয়। মিসরে সবাই আমার সৃজনী ক্ষমতাকে সম্মানের চোখে দেখে। তাদের এই ধারণা বদলে দেবার কোনো দরকার নেই।
খুব উঁচু একটা পাথরের অট্টালিকা দেখিয়ে আমি বললাম, বাগানের পেছনে ঐ অট্টালিকাটা কী? এটা এতো উঁচু যেন পারস্য উপসাগর থেকে ভেসে আসা মেঘের পেটের সাথে এটা ঘষা খাচ্ছে।
