একটু কঠিন স্বরে আমি বললাম, তুমি আমাকে বলতে ভুলে গেছ যে তাই না তেহুতি? প্রায় এক মাস হল তোমার রজঃস্রাব হয়নি, অথচ আমাকে কথা দেওয়া সত্ত্বেও তুমি এই সত্যটা আমার কাছে গোপন রাখার চেষ্টা করেছ।
সে ফিসফিস করে বললো, আমি তোমার সাথে প্রতারণা করতে চাই নি। আমি শুধু আর কিছুদিন বাচ্চাটাকে আমার ভেতরে জীবিত রাখতে চেয়েছি। আমি অবশ্যই তোমাকে বলতাম তায়তা। বিশ্বাস কর সত্যি বলতাম।
হ্যাঁ, অবশ্যই বলতে, তবে অনেক দেরি করে। তোমার এই হঠকারিতা আর স্বার্থপরতা দিয়ে তুমি নিজের জীবন আর মিসরের রাজপরিবারকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছ।
বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে সে বললো, আর কখনও এরকম করবো না তায়তা। তারপর চোখের পানি লুকাতে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
আমি রাগত স্বরে বললাম, তা তো বলবেই। এসো আমার সাথে।
কোথায় যাবো?
মন্দির প্রাঙ্গণে আমার কামরায়।
নিচে আস্তাবলে তার সাথে দেখা করতে যাওয়ার আগে আমি একটা আরক তৈরি করে রেখেছিলাম। এক ধরনের বুনো কাটা গাছের শুকনো ছাল পানিতে ফুটিয়ে রেখে গিয়েছিলাম। এটা নীল নদীর উৎসের ওপারে অনেক দূরের পতিত জায়গা থেকে এনেছিলাম। ফিরে আসার পর দেখলাম বিষাক্ত রসটা ইতোমধ্যে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। তেহুতিকে শোবার ঘরের একটা কৌচে বসতে বললাম। তারপর পেয়ালাটা এনে কালো চোলাইকরা রস পুরোটা তাকে খাওয়ালাম। রসটা পিত্তকোষের মত তিক্ত কিন্তু তারপরও রেহাই দিলাম না। তিনবার সে বমি করে রসটা উগড়ে ফেলতে চেষ্টা করলো কিন্তু আমি শক্ত রইলাম।
পেয়ালাটা শূন্য হওয়ার পর তার চেহারা দেখে মায়া হল। ইতোমধ্যে তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে প্রায় সাদা হয়ে গেছে, চোখদুটো রক্তলাল আর পানিতে টলটল করছে।
আমি সত্যি দুঃখিত তায়তা। খুব বোকামি করেছি। আমি তোমার বিশ্বাস ভঙ্গ করেছি, জানি আর কখনও তুমি আমাকে ক্ষমা করবে না।
তার পাশে বসে তাকে জড়িয়ে ধরলাম, তারপর তার কান্না থামা পর্যন্ত তাকে ধরে দোলাতে থাকলাম। যখন সে ঘুমিয়ে পড়লো তখন একটা পশমি কম্বল দিয়ে তার শরীর ঢেকে দিলাম। তারপর নিচে গিয়ে বাকি দুটি মেয়ের সাথে দেখা করলাম। ওদেরকে বুঝিয়ে বললাম তেহুতি হঠাৎ একধরনের সংক্রামক আর ক্ষতিকারক জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে। ছোঁয়াচে এই জ্বর যাতে ওদের মধ্যে সংক্রমণ না হয় তাই তেহুতি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তার সাথে দেখা করা যাবে না।
তারপর তেহুতি যেখানে শুয়েছিল সেখানে ফিরে গেলাম। এরপরের যন্ত্রণাদায়ক দুটি দিন তার পাশেই কাটালাম। দিনের বেলা গল্প বলে, বীণা বাজিয়ে আর তার প্রিয় গানগুলো গেয়ে শোনালাম। আর রাতে একটা অসুস্থ শিশুর মতো তার সেবাশুশ্রূষা করতে লাগলাম যতক্ষণ না অষুধের প্রভাবে সে ঘুমিয়ে পড়ে।
তৃতীয় রাতে তার গোঙানী আর প্রচণ্ড ব্যথায় কাতরানি শুনে আমি ঘুম থেকে জেগে উঠলাম। আমি তাকে দুহাতের মধ্যে জড়িয়ে ধরে দোলাতে লাগলাম আর নানারকম প্রবোধবাক্য শোনাতে লাগলাম। তারপর একসময় অনুভব করলাম তার গর্ভে মোচড়ানি শুরু হয়েছে। আমি তার পেট মালিশ করতে লাগলাম যাতে ব্যথা কম হয় আর মরা জিনিসটি বের করাতে ভালো দেবতার কাজে সহায়তা করে।
শেষ পর্যন্ত হঠাৎ তীব্রবেগে এক ঝলক রক্ত আর শ্লেষ্মর সাথে এটা বের হতেই সে কোনোমতে কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠে বসে এটা দেখতে চাইল।
গর্ভের ফুলের সাথে শ্লেষ্ম আর রক্তমাখা এমন নোংরা একটি ছোট্ট মানব স্ক্রন লেগে রয়েছে যে, এটা দেখলে সে সারা জীবন দুঃস্বপ্ন দেখবে। তার অনুরোধ উপেক্ষা করে প্রাণহীন ছোট্ট জিনিসটি কাচিয়ে নিয়ে আমার রূপার মদের পাত্রে ভরলাম। তারপর রাত হতেই গোপনে আস্তাবলে গিয়ে ঘোড়ায় চড়ে নদীর তীরে গভীর জঙ্গলে গেলাম। সেখানে নদীর তীরে একটি বড় গাছের নিচে সেই ছোট্ট রূপার শবাধারে ভ্রুণটি মাটি চাপা দিলাম। তারপর সেখানেই হাঁটু গেড়ে বসে এই ছোট্ট আত্মাটির মঙ্গল কামনা করে শিশুদের দেবী আইসিসের কাছে প্রার্থনা করলাম।
আমার কামরায় ফিরে গিয়ে ভাবলাম তেহুতি নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু তার পাশে গিয়ে দেখলাম সে তখনও কাঁদছে। আমি তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে লাগলাম।
.
এরপর আর বারোটি রাত উরের মন্দির এলাকায় কাটালাম। ইতোমধ্যে তেহুতি তার ধকল সামলে সুস্থ হয়েছে আর চেহারায় আগের সৌন্দর্য ফিরে এসেছে।
শেষদিন রেমরেমকে নিয়ে আমি নগরীর ফটক দিয়ে বের হলাম। তাঁবুগুলো গুটিয়ে সবকিছু গোছগাছ করে ভারবাহি পশুগুলোর পিঠে তুলে ফেলা হয়েছে। এখন আমরা ব্যবিলনের পথে দীর্ঘ সফরের শেষ অংশ পাড়ি দেবার জন্য তৈরি।
রেমরেমের দেহরক্ষী দল তার জন্য অপেক্ষা করছিল। আমি তাকে বিদায় জানালাম। সে একজন দক্ষ সেনানায়ক এবং ভদ্রলোক।
আমি দাঁড়িয়ে দেখলাম সে তার কাফেলার একেবারে সামনে গিয়ে অন্যান্য সেনানায়কদের মাঝে অবস্থান নিল। তারপর ডান হাত উপরে তুলতেই সামনে এগোবার নির্দেশ দিয়ে শিঙা বেজে উঠলো। ঢাক পেটাবার তালে তালে ওরা হেঁটে চললো। ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে আমি উরের দিকে ফিরে চললাম।
নদীর তীরে এসে দেখলাম রাজকুমারীরা দলের অন্যান্য সঙ্গীদের নিয়ে জাহাজঘাটে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। ফাট তুর আমাদের জন্য যে বজরাগুলো ভাড়া করেছিল সেগুলো মাঝ নদীতে নোঙর করা রয়েছে। রঙিন পতাকা আর কাগজ দিয়ে এগুলো সজ্জিত করা হয়েছে। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে আমি রাজকুমারীদেরকে জড়িয়ে ধরার সাথে সাথে প্রথম বজরাটি নোঙর তুলে জাহাজঘাটে এলো। ফাট তুর পেশাগত দক্ষতার সাথে মাঝিমাল্লাদের যথাযথ নির্দেশ দিয়ে তৈরি করে রেখেছিল। সে রাজকুমারীদেরকে প্রথম বজরায় উঠিয়ে পেছনের দিকে একটি চমৎকার ডেকে বসাল। পরিচারকরা সোনার পাত্রে তাদেরকে শীতল মধূর শরবত পরিবেশন করলো। বিশেষভাবে সংরক্ষিত তাপনিরোধক বাক্সে জাগরোস পর্বতচূড়া থেকে দ্রুতগামি রথে করে বরফ এনে এই শরবত ঠাণ্ডা করা হয়েছে। রাজকুমারী কখনও এরকম সুশীতল এবং সুমিষ্ট শরবত পান করেনি। ওরা খুশিতে মাতোয়ারা হল।
