রেমরেম আর আমি উভয়েই নির্বাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
রেমরেমের মুখের ভাব বদলে গেল। আমি জানি সে বুঝতে পেরেছে তার সমস্ত আশা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। সে নিশ্চিত ছিল যে সুমেরিয়ার রাজা নিমরদ আমাদের একজন শক্তিশালী মিত্র হবে। তার সে আশায় ফাট তুর পানি ঢেলে দিয়েছে।
এদিকে আমি অবশ্য অনুপ্রাণিত হলাম। আমার কাছে এখন সামনে যাওয়ার পথ পরিষ্কার হয়েছে। নিমরদ এখন দেউলিয়া হয়েছে। সে তার দেশ আর সেনাবাহিনী হারাবার পথে। নিদারুন হতাশায় সে নিশ্চয়ই এখন ভয়ভাবনাহীন এবং যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণে অকুণ্ঠিত। আমার কাছে প্রায় দশ লাখ রূপা আছে। চারচাকার ঘোড়ার গাড়ির পাদানিতে কাঠের নকল তক্তার নিচে আর উটের দুইপাশে ঝুলানো থলেতে এগুলো লুকানো রয়েছে। এছাড়া রাজার উপত্যকায় ফারাওয়ের রাজকোষে শত শত লাখ রূপা মজুত রয়েছে। সুতরাং রাজা নিমরদ আর সুমেরিয়া এখন আমাদের। আমি তাকে যে কোনো দাম হাঁকতে পারবো, সে তা প্রত্যাখ্যান করতে পারবে না।
প্রথম হাতুড়িটি এখন আমার হাতে এসে গেছে। যদিও আমার শব্দচয়নে রেমরেম বেশ কিছুক্ষণ গাইগুই করলো। অন্য হাতুড়িটি ক্রিট দ্বীপে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। রূপার বিনিময়ে এর মূল্য সামান্য। তবে কৃপণতা আর হৃদয়বিদারণের মূল্য অনেক বেশি হতে পারে।
.
পরদিন সকালে নতুন প্রেরণা নিয়ে ঘুম থেকে উঠলাম। আমার প্রধান ক্রীতদাস রুস্তি প্রাতরাশ নিয়ে এল। আর সেই সাথে আমার প্রিয় মদও আনলো। মদের গোলাপজল মিশিয়ে চত্বরে পায়চারি করতে করতে গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে নিচের বিশাল নদীর দিকে তাকালাম। সময়ের শুরু থেকেই এই নদীটি ছিল ইতিহাসের একটি কেন্দ্রবিন্দু।
রাজা নিমরদের আর্থিক দূরবস্থার সংবাদ, চোখের সামনে বিশাল নদী আর দূরের বরফাচ্ছাদিত পর্বত চূড়ার সৌন্দর্য আর হাতে সুস্বাদু মদের গ্লাস থাকা সত্ত্বেও আমি অনুভব করলাম আমার মনের ফুর্তি উবে যাচ্ছিল। আমি জানি অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় আমার চোখ এড়িয়ে গেছে। মাথার চারদিকে একটা মশার মতো এটি গুঞ্জন করছে তবে আমি তাড়াতে চেষ্টা করেও তা করতে পারছিলাম না।
অরেকবার পায়চারি করে ঘুরতেই দেখলাম রুস্তি আমার দিকে আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে রয়েছে। সে বললো, কিছু হয়েছে প্রভু?
আমি তাকে আস্বস্ত করে বললাম, এমন কিছু নেই যা সামলানো যায় না। তারপর লেখার টেবিলে গিয়ে এক টুকরা প্যাপিরাসে কিছু লিখলাম। কাগজটা ভাঁজ করে রুস্তির হাতে দিয়ে বললাম, এখুনি এটি মহামান্য রাজকুমারী তেহুতির কাছে গিয়ে শুধু তার হাতে দেবে। তারপর প্রধান সহিসের কাছে গিয়ে বলবে দুটো ভালো ঘোড়ার পিঠে জিন চড়িয়ে বাইরে উঠানে প্রস্তুত করে রাখতে। আমি এখুনি সেখানে যাচ্ছি, সে যেন আমাকে অপেক্ষা করিয়ে না রাখে। রুস্তি আমার নির্দেশ পালন করতে ছুটে গেল।
আমি যা করতে চাই তা এই মন্দির এলাকায় সম্ভব নয়। কোনো সন্দেহ নেই এখানে পাথরের দেয়ালে ছোট ছোট কুঠরি, গোপন জানালা আছে আর কথা শোনার মতো গুপ্ত স্থানে রাজা নিমরদের শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা, নিদেন পক্ষে পুরোহিতদের চরেরাও কান পেতে রয়েছে।
পেয়ালার বাকি মদটুকু শেষ করে দ্রুত পাশের কামরায় গিয়ে ঘোড়ায় চড়ার পোশাকটা পরলাম। তারপর নিচে নেমে ভবনটির পেছনে আস্তাবলে গেলাম। তেহুতি প্রায় আধা ঘন্টা পর এলো। তাকে বেশ খুশি খুশি লাগছিল। হাসি হাসি মুখে তার সুন্দর চেহারায় এমন একটি রূপ ধারণ করেছে যা আর কখনও দেখা যায় নি। সে দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো, তারপর পায়ের আঙুলের ডগায় ভর দিয়ে আমার কানে কানে ফিস ফিস করে বললো, রুস্তি বললো, তুমি নাকি আমাকে একটা গোপন কথা বলবে। তাই সে জানাল অন্য মেয়েদেরকে যেন না জানাই যে আমি তোমার সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। তারপর সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে বললো, এবার বল! কী বলবে তায়তা। তুমি তো জানো গোপন বিষয় জানার জন্য আমি বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে পারি না।
সে বার বার অনুরোধ করলেও আমি তার কথায় কান না দিয়ে বললাম, চল এমন কোথায় যাই যেখানে আমরা একা হতে পারি। তারপর তাকে ঘোড়ার পিঠে চড়িয়ে দিলাম। দুজনে ঘোড়ায় চড়ে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে পৌঁছার পর আমি ঘোড়ার গতি কমিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে চললাম। দুজন পাশাপাশি চলতে লাগলাম।
তুমি এমন নিষ্ঠুর কেন হচ্ছো? আমি জানি তুমি আমার জন্য একটা উপহার এনেছো। অসিরিসের দিব্যি আমি আর এক মুহূর্ত দেরি সহ্য করতে পারছি না।
এবার তোমার জন্য আমি কোনো উপহার আনিনি। আমার শুধু একটা সহজ প্রশ্ন আছে। ময়াগুহা থেকে তুমি আর জারাস ফিরে আসার কত দিন হল?
ওহ, এটা তো বেশ সহজ প্রশ্ন। তারপর মাথার উপরে সূর্যের উচ্চতা অনুমাণ করে বললো, তেতাল্লিশ দিন আর প্রায় নয় ঘন্টা।
আমি মাথা নেড়ে বলো, তারপর কখন তুমি কিছু হারিয়েছ?
না তো এই যে দেখো! আংটিটা এখনও আমার আঙুলে রয়েছে। এই কথা বলে সে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। হীরাটা তার আঙুলে জ্বলজ্বল করছে।
আমি কোনো কথা না বলে ভাবলেশহীন চোখে তার দিকে তাকালাম। আমি চুপ করে থাকায় কিছুক্ষণ পর তার মুখ থেকে হাসি মুছে গিয়ে একটি বিভ্রান্তিকর অভিব্যক্তি ধারণ করলো। তারপর হঠাৎ সে বুঝতে পারলো আমার প্রশ্নটা কোনদিকে যাচ্ছে। এবার সে চোখ নামিয়ে নিল।
