আপনার অনুরোধ মতো নদীপথে যাওয়ার জন্য আমি দশটি বড় আর আরামদায়ক বজরা ভাড়া করেছি। যাত্রার জন্য আপনি যখনই তৈরি হবেন তখনই এই বজরাগুলো রাজকুমারী আর আপনার প্রতিনিধি দলের বর্ষীয়ান সদস্যসহ আপনাকে নিয়ে নদীর উজানে ব্যবিলনের দিকে রওয়ানা দেবে। স্বভাবতঃ আমিও আপনাদের সাথে যাবো। তবে অত্যন্ত সম্মানের সাথে আমি আপনাকে জানাতে চাই, কাফেলার বড় অংশটির আগেই হাঁটাপথে ব্যবিলনে পৌঁছে সেখানে আপনার আগমনের জন্য অপেক্ষা করা উচিত।
ফাট তুর সেই বিশাল জিগুরাট অর্থাৎ সিঁড়ি-পিরামিড আকৃতির মন্দির এলাকায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা করেছিল। সেখানে পৌঁছে সবাই স্থির হতে না হতেই সূর্যাস্তের সময় হল। থিবস থেকে যেসব সুন্দর পোশাক-আশাক, অলংকার ইত্যাদি সাজগোজের জিনিসগুলো আনা হয়েছে, আমি রাজকুমারী আর মেয়েদেরকে এবার সেগুলো বাক্স থেকে বের করতে বললাম। ব্যবিলনে রাজা নিমরদের দরবারে হাজির হওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে ওরা এবার পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আর ফিটফাট হওয়ার সুযোগে পেয়েছে।
রাজকুমারীদেরকে বুঝিয়ে বললাম, ওদের সাজসজ্জা আর সুন্দর চেহারা দিয়ে রাজা নিমরদ আর ক্রিটের রাষ্ট্রদূতকে মুগ্ধ করে দেওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কেননা এই রাষ্ট্রদূতই আবার সমস্ত বিষয় তার প্রভু সর্বাধিরাজ মিনোজের কাছে তুলে ধরবে।
সুবিশাল মন্দির চত্বরে বসে তারাভরা আকাশের নিচে ফাট তুর আর রেমরেমের সাথে নৈশভোজ করলাম। সকালেই ইউফ্রেটিস নদী থেকে ধরা এক হাত লম্বা পার্চ মাছ দিয়ে উদর পূর্তি করলাম। সেই সাথে নদীর তীরবর্তী বাগানের আঙুর চোলাই করে তৈরি করা লাল মদ পান করলাম।
খাওয়াদাওয়ার পর আমাদের মূল উদ্দেশ্য–হাইকসোদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরিকল্পনার আলোচনায় মনোযোগ দিলাম।
আপনারা জানেন আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে রাজা নিমরদ আর সর্বাধিরাজ মিনোজ, উভয়কেই যেকোনো ভাবেই হোক ভুলিয়ে ভালিয়ে ফারাওয়ের সাথে একটি সামরিক মিলনের মধ্যে আনা। এটা অর্জন করতে পারলে আমরা রাজা গোরাবকে কামারের নেহাইয়ে ফেলে তিনটি হাতুড়ি দিয়ে পিষে তাকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারবো।
রেমরেম বললো, আপনার কথাগুলো শুনতে ভালো লাগলেও আমার নৈতিক উন্নতি হল না তায়তা। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারলাম না কামারের। নেহাইটি কে আর হাতুড়িগুলোইবা কারা। আমি মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস নিলাম। অনেক সময় রেমরেমের সাথে আলোচনা করার সময় মনে হয়, যেন একজন পঙ্গুকে পর্বতের উপরে টেনে নিয়ে যাচ্ছি। প্রতিটি পদক্ষেপে তাকে সাহায্য করতে হয়।
দয়া করে আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি একটি রূপক ব্যবহার করছিলাম। বিষয়টা আমার আরও পরিষ্কার করে বলা উচিত ছিল। এখানে কামারের নেহাই হচ্ছে সাহারা মরুভূমি আর ক্রিট, সুমেরিয়া আর আমাদের মিসরের সেনাবাহিনী হচ্ছে হাতুড়ি।
রেমরেম বললো, তাহলে আপনার বলা উচিত ছিল গোরাবকে আমরা চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলবো। এই হাতুড়ি আর নেহাইয়ের কথা বলার বিষয়টা বেশ বিভ্রান্তিকর মনে হচ্ছিল। সরলভাবে সোজাসুজি কথা বললেই সবসময় ভালো হয়, তাই না?
কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে আমি বললাম, আপনার পাণ্ডিত্যপূর্ণ উপদেশের জন্য ধন্যবাদ রেমরেম। তারপর প্রসঙ্গ পালটে বললাম, আসলে আমি যে বিষয়টা বলতে চাচ্ছি তা হল, হাইকসোদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে আমরা যেরকম অঙ্গীকারবদ্ধ সেরকম মনোভাব ক্রিট কিংবা সুমেরিয়ার নাও থাকতে পারে। তারপর ফাট তুরের দিকে ফিরে বললাম, আপনার কাছ থেকে এ-বিষয়ে রাজা নিমরদের অবস্থান জানতে পারলে আমি খুশি হব। সম্ভবত আপনি এব্যাপারে আরও কিছু আলোকপাত করতে পারবেন।
ফাট তুর সায় দিয়ে মাথা কাত করে বললো, আমি অত্যন্ত আগ্রহের সাথে আপনার মুখোমুখি হয়ে বিষয়গুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা করার এই সুযোগের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কেননা কবুতরের পায়ে বেধে যে বার্তা পাঠানো হয় তাতে সবকিছু খুলে বলা যায় না। আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে, ১৪ বছর আগে তারা বাবা রাজা মারদক মারা যাওয়ার পর নিমরদ উত্তরাধিকার সূত্রে সিংহাসনের অধিপতি হয়েছেন।
আমি বললাম, হ্যাঁ, আমি তা জানি।
রাজা মারদকের রাজত্বের শেষ ত্রিশ বছর ব্যবিলন পুণর্নির্মাণের কাজে কেটে যায়। তিনি একে সৃষ্টির সবচেয়ে সুন্দর আর জমকালো নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
আসলেই আমি শুনেছিলাম যে মারদক বিশাল একটি কাজ করেছেন। তবুও আমার সন্দেহ থিবসের সৌন্দর্যের সাথে এর তুলনা চলে না।
এবার ফাট তুর মৃদু হেসে বললো, তাহলে আপনি সত্যি এবার অবাক হবেন। শোনা যায় রাজা মারদক এই পুনর্নির্মাণ কাজে ছয় লাখের উপর রূপা ব্যয় করেছেন। তবে এটি নিশ্চিত তার এই বাতিকের খরচ মেটাতে গিয়ে রাজকোষ প্রায় শূন্য হয়ে যায়।
একথা শুনে আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। উত্তর দিতে আমার একটু দেরি হয়ে গেল। তারপর সন্দিগ্ধভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে বললাম, আমি তো ভেবেছিলাম সুমেরিয়া ক্রিটের চেয়েও সম্পদশালী একটি রাষ্ট্র।
হ্যাঁ, অধিকাংশ লোক তাই মনে করে। আমি গত পাঁচ বছর ধরে ব্যবিলনে বসবাস করছি আর প্রথম প্রথম আমিও সুমেরিয়ার অতুল সম্পদের কাহিনী বিশ্বাস করতাম। মাত্র কিছুদিন হল আসল সত্যিটা জেনেছি। মন্ত্রীদের বেতন দেওয়ার মতোও যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ রাজা নিমরদের নেই। তার বেসামরিক শাসন ব্যবস্থা ছিন্নভিন্ন। অস্ত্রশস্ত্র আর প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে সামরিক বাহিনী অথর্ব হয়ে রয়েছে। বেতন না পেয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা দলে দলে পালিয়ে যাচ্ছে। তিনি হয়তো হাইকসোদের বিরুদ্ধে আক্রমণের জন্য যথাযথ সৈন্য সমাবেশ করতে পারবেন না, যদিও তিনি ভালোভাবেই জানেন তার দেশে বিপদের আশঙ্কা আছে।
