এভাবে উত্তরে যেতে যেতে একসময় আমরা রেমরেম আর দলের অন্য অংশের দেখা পেলাম। পূর্ব পরিকল্পনামতো ইউফ্রেটিস নদীর কেবল দশ লিগ দক্ষিণে আমাদের দুই দলের মিলন হল। অবশ্য এতো কাছে যে এরকম বিশাল একটি নদী রয়েছে তার কোনো চিহ্ন এখনও দেখা যাচ্ছে না। এখনও আমাদের চারপাশ ঘিরে রয়েছে রুক্ষ পাথরের পাহাড় আর ধূলিধূসর রোদে পোড়া উপত্যকা।
আমাদের এক চোখওয়ালা পথ নির্দেশক, আল-নামজু এবার আমাদেরকে শেষ মরুদ্যানে নিয়ে এলো। এই জায়গাটির নাম ধ্রুস। এখানে পনেরোটি কূপ রয়েছে, সবগুলোতে পরিষ্কার মিঠে পানি। এখান থেকে একটি জনবহুল গ্রাম, একটি খেজুর বাগান আর অন্যান্য কৃষিখামারে পানি সরবরাহ করা হয়। আমাদের এতো বড় একটি কাফেলার কয়েকদিনের প্রয়োজন মেটাবার মতো যথেষ্ট পরিমাণ পানি এখানে রয়েছে।
এখানে শিবির স্থাপন করার কিছুক্ষণ পর আল-নামজু আমার সামনে এসে নতমস্তকে দাঁড়াল।
তারপর বললো, পরম শ্রদ্ধেয় প্রভু তায়তা। এখান থেকে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে শালদিসে উর নগরীর কাফেলা চলার পথটিতে প্রচুর লোকচলাচল হয় আর এপথে পরিষ্কার দিক নির্দেশনা রয়েছে। নদীও কাছে। এপথে যেতে আপনাদের তেমন অসুবিধা হবে না।
সেক্ষেত্রে চুক্তি মোতাবেক উর পর্যন্ত পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে তোমারতো কোনো অসুবিধা হবার কথা নয় আল-নামজু, তাই না?
হে মহান প্রভু তায়তা। আপনার উপলব্ধি আর অনুকম্পার মিনতি করছি। আমার উর নগরীতে ঢোকার সাহস নেই, সেখানে আমার শত্রু রয়েছে। এখানকার আক্কাদিয়রা ভীষণ প্রতিহিংসাপরায়ণ আর বিপজ্জনক লোক। আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি দয়া করে আমাকে এখানেই ছেড়ে দিয়ে দক্ষিণে জুবায় ফিরে যাবার অনুমতি দিন। সেখানে আমার বড় ছেলে হারানোর শোক পালন করবো। একথা বলার পর তার শূন্য চোখের কোটর থেকে এক বিন্দু চোখের পানি মুছলো। দৃশ্যটা দেখতে বেশ বিসদৃশ।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে কি তুমি চুক্তি মোতাবেক পুরো পারিশ্রমিক দাবী করছো? একথা শোনার সাথে সাথে সে আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো।
আপনি আমার বাবা এবং প্রভু। যা আপনার মর্জি। আমি একজন গরীব মানুষ, আমাকে আমার ছেলে হারুন আর তার পুরো পরিবারের ভরণ-পোষণ করতে হবে। এটা আমার দুর্ভাগ্য।
তার দুঃখদুর্দশার ফিরিস্তি শুনতে শুনতে তার অনুরোধটি বিবেচনা করলাম। এটা সত্যি যে সে একজন বিশ্বাসঘাতক ছেলের বাবা আর একটি ছেলে তার জনকের মতো একই ছাঁচে হয়ে থাকে। অন্যদিকে তার নিজের ছেলেকে হত্যা করতে আমি তাকে বাধ্য করেছিলাম। এতেই কি তার ঋণ শোধ হয়নি? নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম। মনে হয় সে যথেষ্ট ভুগেছে।
চরিত্রগতভাবে আমি একজন দয়ালু মানুষ, তবে এটা হয়তো গুণের চেয়ে একটা দোষই হবে। আমি তাকে বললাম, তুমি আমাদের জন্য অনেক ভালো কাজ করেছে আল-নামজু। আমার আশীর্বাদ নিয়ে তুমি এবার যেতে পার। তারপর আমার থলে থেকে দুটি রূপার মেম মুদ্রা নিয়ে তার বাড়ানো হাতে তুলে দিলাম। তারপর সে আমার পায়ে চুমু খেয়ে চলে গেল।
চারদিন পর আমি শালদিসের উর নগরীর উপরে নিচু পাহাড়ে দাঁড়িয়ে এই প্রথমবারের মতো নিচে নগর আর সবুজ ইউফ্রেটিস নদীর দিকে তাকালাম। এই নদীটি যে আমাদের মা নীল নদের চেয়েও চওড়া এই সত্যিটি উপলব্ধি করতে পেরে আমি একটু বিরক্তি বোধ করলাম। কেননা এর আগে আমি মনে করতাম নীল নদই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নদী।
ইউফ্রেটিস নদীর দুই তীরে যতদূর চোখ যায় গভীর বনানী দেখা যাচ্ছে। বন কেটে বড় বড় কৃষি জমি তৈরি করা হয়েছে। রুক্ষ মরুভূমি পার হওয়ার পর প্রচুর গজিয়ে উঠা এই বিশাল শ্যামলিমা দেখে আমার মন ভরে গেল। আমি যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম ঠিক তার নিচেই নদীর তীরে উর নগরীর অবস্থান। এর ঠিক কেন্দ্রস্থলে রয়েছে ইশতার দেবীর বিশাল মন্দির। ইনি সুমেরিয় আর আক্কাদিয়দের প্রধান দেবী। এটি একটি পিরামিড আকৃতির ইমারত। একটির উপর একটি পাঁচটি চত্বর ধাপে ধাপে উপরের দিকে ছোট হয়ে চলে গেছে। এটি শুধু একটি মন্দির নয়, বন্যার সময় যখন নদীর কূল ছাপিয়ে নগরী আর আশপাশের সবজায়গা প্লাবিত হয়ে যায় তখন মন্দিরের পুরোহিত আর যাজিকারা এখানে আশ্রয় নেন।
আমরা নগরীর দিকে রওয়ানা দিলাম। দলের সবার আগে রেমরেম আর রাজকুমারীদের নিয়ে আমি ঘোড়ায় চড়ে চললাম। পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছার আগেই লাল কাদামাটির ইটের তৈরি শহরের প্রধান ফটকের ভেতর থেকে একদল নারী পুরুষ পুরোহিত আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে সামনে এগিয়ে এলো।
নদীর উজানে ব্যবিলন আর মাত্র একশো বিশ লিগ সামনে রয়েছে। সবেমাত্র বিশাল মরুভূমি পার হয়ে এসেছি, আর এখুনি রাজা নিমরদের রাজধানীতে পৌঁছাতে চাচ্ছিনা। আমি চাই আমাদের সম্পদ আর জাঁকজমক দেখিয়ে সুমেরিয়দের মাত করে দিতে। দীর্ঘ সফরের ক্লান্তির পর আমাদের চেহারার যে অবস্থা হয়েছে তাতে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ এবং সম্পদশালী রাষ্ট্রের প্রতিনিধির বদলে আমাদেরকে মরুভূমির একটি বেদুঈন যাযাবরের দল মনে হচ্ছে।
শোভাযাত্রাটি কাছে আসতেই আমি সামনের সারিতে পুরোহিত আর যাজিকাদের মাঝে রাষ্ট্রদূত ফাট তুরকে দেখেই চিনতে পারলাম। ফাট তুর হচ্ছেন সুমেরিয়ায় মিসরের রাষ্ট্রদূত। তার বর্তমান পদে আসার অনেক আগে থেকে আমরা পরস্পরকে চিনতাম। একজন পরিশ্রমী আর বিশ্বস্ত রাজকর্মকর্তা। সুতরাং আমি নিশ্চিত হলাম যে, ব্যবিলনে আমাদের পৌঁছার জন্য সমস্ত বন্দোবস্ত ঠিক মতোই করা হয়েছে। তাকে স্বাগত জানাবার জন্য আমি ঘোড়ার পিঠ থেকে নামলাম। তারপর দুজনে একসাথে নগরীর ফটকের দিকে হাঁটতে হাঁটতে পুরোনো বন্ধুর মতো কথা বলে চললাম।
