তাহলে তোমার নিজেকেই ঐ গুহায় গিয়ে আংটিটা খোঁজ করা উচিত।
এতক্ষণ নিজে যে কথাটা সে ভাবছিল সেটার দিকে আমাকে ঠেলে দিয়ে এবার সে বেশ উৎসাহ নিয়ে বললো, আরে একথাটা তো আমি আসলেই ভাবিনি! তুমি ঠিকই বলেছো তায়তা। আমারই যাওয়া উচিত।
কিন্তু তুমি তো একা যেতে পারো না। তোমার সাথে আমার কাউকে পাঠাতে হবে। হুই তো অবশ্যই নয়, কেননা তুমি তো আবার বিদেশিদেরকে বিশ্বাস করো না। তারপর বিষয়টা নিয়ে একটু চিন্তা করার ভান করে বললাম, সেনাপতি রেমরেমকে পাঠানো যেত, কিন্তু সে তো এখন এখানে নেই। অন্য সময় হলে আমি যেতাম, কিন্তু আমার পিঠ ব্যথা করছে আর আমার বিশ্রাম নেওয়া দরকার। একথাটা বলে আমি কোমরের পেছনের দিকে হাত রেখে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলাম।
সে আমার দিকে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, আহা, আমার তায়তা! আমি আর তোমাকে শরীরে কোনো ধরনের কষ্ট নিতে দেবো না।
আমি বললাম, পেয়েছি পেয়েছি! ক্যাপ্টেন জারাসকে তোমার সাথে পাঠাব।
কথাটা শোনার সাথে সাথে সে চোখ নামিয়ে নিল। বুঝতে পেরেছে। আমি তাকে পরীক্ষা করছিলাম। এবার সে আমার দিকে তাকিয়ে ভান করা ছেড়ে দিয়ে হেসে উঠলো, তারপর আমার গলা জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বললো।
আমি তোমাকে ভালোবাসি, সত্যি সত্যিই তোমাকে ভালোবাসি তায়তা।
আমিও তাকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বললাম, ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হয় যদি সেই দুষ্টু আংটিটা আমার কাছে রেখে যাও, কারণ এবার হয়তো সত্যিই এটা তোমার আঙুল থেকে পড়ে যেতে পারে।
সে তার আস্তিনে হাত ঢুকিয়ে যখন আবার বের করলো তখন হাতটা মুষ্টিবদ্ধ ছিল। তবে নিরাপদ দূরত্বে রেখে বললো, এটা ছাড়া আর সবকিছু দিয়ে আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে পারি।
তারপর মুঠোটা খুলতেই সেই বিখ্যাত হীরার আংটিটা তার তালুতে দেখা গেল।
যখন আমি ফিরে আসবো তখন এটা আমার হাতের আঙুলে থাকবে আর কখনও আঙুল থেকে খুলবো না। এটা সবসময় জারাসের প্রতি ভালোবাসার চিহ্ন হয়ে থাকবে। এমনকি কর্তব্যের খাতিরে যদি তাকে চিরদিনের জন্য ত্যাগ করতে হয়, তারপরও এই আংটি তার স্মৃতি হয়ে আমার কাছে থাকবে।
ঘন্টাখানেকের মধ্যে সে আর জারাস দুটো ঘোড়ায় চড়ে দক্ষিণদিকে ছুটে চললো। তাদের দেহরক্ষীদলও একটু পর তাদের অনুসরণ করলো।
কর্তব্য থেকে এ-ধরনের গহিত বিচ্যুতি আমার মনে একটু অপরাধ বোধ জাগাল। তারপর যখন মনে পড়লো আমার অতি প্রিয় দুইজন তরুণ মানুষকে খুশি হওয়ার সামান্য সুযোগ দিতে পেরেছি তখন মন থেকে এই অপরাধবোধ ভাবটি ম্লান হয়ে গেল।
.
আমি আশা করিনি যে ওই দুইজন খুব শিঘ্রই ময়াগুহা থেকে ফিরে আসবে। তবে ওরা আমাকে হতাশ করেনি। জয়নাব মরুদ্যানে প্রায় এক সপ্তাহ অপেক্ষা করার আগেই ওরা ফিরে এল।
আমার তাঁবুর সামনে পৌঁছে ঘোড়া থেকে নামার সময় তেহুতি ফিসফিস করে জারাসকে বললো, তুমি এখানে অপেক্ষা কর। আমাকে তার সাথে একা কথা বলতে হবে।
ওরা রৌদ্রে দাঁড়িয়েছিল আর তাই আমি যে তাঁবুর ছায়া থেকে ওদের লক্ষ্য করছিলাম, তা ওরা দেখতে পায় নি। সেজন্য তেহুতির ঠোঁট নড়া দেখে আমি তার কথা বুঝতে পারছিলাম।
সে দৌড়ে তাবুতে ঢুকলো। আমি তার দিকে এগিয়ে যেতেই সে খুশিতে অস্ফুট চিৎকার করে আমার বাহুর মাঝে এলো। তাকে জড়িয়ে ধরার পর আমি বুঝতে পারলাম এই অল্প সময়ের মধ্যেই সে অলৌকিকভাবে শৈশব অবস্থা থেকে পূর্ণ নারীতে পরিণত হয়েছে, অপরিশোধিত ধাতু থেকে রাজকীয় স্বর্ণ হয়েছে।
তাকে চেপে ধরেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, যা খুঁজতে গিয়েছিলে তা কি পেয়েছো?
ও হ্যাঁ, পেয়েছি। এই কথা বলে তার হাতের মুঠো আমার সামনে খুলে ধরলো। হীরাটা চমকাচ্ছে, তবে তার চোখের মতো উজ্জ্বল নয়। আমি এটা ভালোবাসি, তবে গুহায় অন্য যে সম্পদ পেয়েছি তা আরও ভালোবাসি।
তারপর সে অকপটভাবে বললো, আমি তোমাকে সবকিছু খুলে বলবো। যা যা হয়েছে সব বলবো।
তাঁবুর ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম বেচারি জারাস তখনও সেখানে চাপা আর লজ্জিত মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঠিক একটি ছোট্ট ছেলের মতো যে, আপেল বাগানে আপেল চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে আর এখন মার খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি এটা নিয়ে আর কথা না বাড়িয়ে তাকে যেতে দিলাম।
পুরো শিবিরটি হাসি ঠাট্টায় ভরে গিয়ে এখন একটি আনন্দের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি বেশ অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম যে, জারাস আর তেহুতি বেশ সতর্কতার সাথে তাদের রোমান্সের বিষয়টি লুকিয়ে রেখেছে। মনে হল আমি ছাড়া সম্ভবত আর কেউ তা জানেনা। এমনকি বেকাথাও নয়। মনে বেশ পরিতৃপ্তি অনুভব করলাম যে, এই দুজনের ভালোবাসার আমি অভিভাবক হয়েছি। মনে পড়লো অনেক আগে তেহুতির বাবা-মার ব্যাপারেও একই ভূমিকা আমি পালন করেছিলাম।
জয়নাব মরুদ্যানে আমাদের বেশিদিন থাকা হয়নি। আমরা এগিয়ে চললাম। বিশাল এই ধু-ধু প্রান্তরে রেমরেম আর দলবল আমাদের জন্য যে পথ নির্দেশনা রেখে গিয়েছিল তা অনুসরণ করে সপ্তাহের পর সপ্তাহ চলতে লাগলাম। মরুভূমিতে এমন এক সৌন্দর্য আর মহিমা আছে যা, পৃথিবীর অন্য কোথাও নই। এই স্থান উত্তেজিত মনে প্রশান্তি এনে দেয় আর দেবতার কাছাকাছি আসার সুযোগ করে দেয়। এটা ছিল আমার জীবনের অত্যন্ত স্মরণীয় আর তৃপ্তিদায়ক একটি সময়।
