বিকেলে সূর্যের তাপ কমে আসার পর আমরা ময়াগুহা থেকে যাত্রা শুরু করলাম। ক্ষয়িষ্ণ চাঁদের আলোয় পথ দেখে সারারাত চললাম। তারপর সকালে রোদের তাপ বেড়ে যাওয়ার পর আবার তাঁবু খাটালাম। ইতোমধ্যে বিশ লিগ দূরত্ব অতিক্রম করে এসেছি। মন প্রফুল্ল হল। নিজে বিশ্রাম নেবার আগে পুরো শিবিরের সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা ঘুরে দেখলাম। আমি সবসময় অবাক হতাম শুধু দুএকটা ভালো কথায় কীভাবে দলের সবচেয়ে নিম্নস্তরের সদস্যও কি-রকম খুশি হয়। একজন মানুষ অনেক সময় ভুলে যায় যে, তার চেয়ে কম বুদ্ধিমান লোক তাকে কীরকম সম্মান করে।
কিন্তু রাজকীয় শিবিরে ফিরে আসার সাথে সাথে মনের সমস্ত প্রশান্তি ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। আসলে একটু দূর থেকেই আমি শোরগোল আর চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে পাচ্ছিলাম। অবিরাম ক্রন্দন, কিছু হারাবার বিলাপ সবকিছু পরিষ্কার মরুর বাতাসে ভেসে আসছিল। সাথে সাথে ছুটতে শুরু করলাম, না জানি কী অঘটন ঘটেছে। নিশ্চয় কোন মৃত্যু কিংবা তেমন কোনো বিয়োগান্তক ঘটনা ঘটেছে।
রাজকীয় শিবির এলাকায় ঢুকে দেখলাম সমস্ত দাসদাসি আতঙ্কে হতভম্ব হয়ে রয়েছে। তারা আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারলো না। ওদের বোকামী দেখে অধৈর্য হয়ে একজন নুবিয় পরিচারিকার কাধ ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে তার স্বন্বিত ফেরাবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু এতে কোনো কাজ হলো না। বরং চারপাশের হট্টগোল এখন একটি পাগলাগারদে পরিণত হল।
তাড়াতাড়ি আমি মেয়েটিকে ছেড়ে দিয়ে তাকে আশ্বস্ত করলাম যে, আমি তার সতীত্ব হানি করতে যাচ্ছি না, তারপর দ্রুত তেহুতির তাবুর দিকে গেলাম। তাঁবুর ঢোকার মুখে উচ্চস্বরে বিলাপরত বেশ কয়েকজন মেয়েকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে রাজকুমারীর কাছে পৌঁছলাম। সে তার বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে রয়েছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার দমকে তার পুরো শরীর কেঁপে উঠছিল।
আমার গলার আওয়াজ শোনার সাথে সাথে সে লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো।
কী হয়েছে বাছা? কে মরেছে? এমন কী হয়েছে যে, তুমি কাঁদছো?
আমার আংটি! আমি আংটিটা হারিয়ে ফেলেছি…নিশ্চয়ই কেউ এটা চুরি করেছে।
প্রথমে আমি তার কথা বুঝতে না পেরে বললাম, কোন আংটি?
আড়ষ্টভাবে আঙুলগুলো ছড়িয়ে বামহাত সামনে বাড়িয়ে বললো, আমার আংটিটা নেই। যেটা তুমি আমাকে দিয়েছিলে। সেই জাদুর হীরার আংটিটা, যেটা তুমি তামিয়াত দুর্গ থেকে আমার জন্য এনেছিলে।
সমস্যাটি তেমন গুরুত্ব নয় বুঝতে পেরে আমি বললাম, ঠিক আছে তুমি শান্ত হও। আমরা এটা খুঁজে বের করবো।
কিন্তু যদি খুঁজে না পাও? এটাই একমাত্র জিনিস যা আমি পৃথিবীতে সবচেয়ে ভালোবাসি। এটা হারিয়ে গেলে আমি আত্মহত্যা করবো।
প্রথমে এই মেয়েগুলোকে এখান থেকে তাড়াতে হবে, তারপর আমরা শান্তভাবে নিজেদের মধ্যে বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে পারবো। হাতের ছড়ি আর মুখের সুন্দর ভাষা ব্যবহার করে ওদের সবাইকে তাবু থেকে বের করলাম। তারপর বিছানায় তেহুতির পাশে বসে ওর এক হাত ধরে বললাম,
এখন বল কখন, কোথায় এটা শেষ দেখেছ। আমার প্রশ্নটা শুনে সে একটু ভাবতে লাগলো। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম, এতো কান্নাকাটি, ফুপানো আর আত্মহত্যার হুমকি ইত্যাদি সত্ত্বেও তার সুন্দর চোখদুটো পানি শূন্য। এখন আমরা দুজন একা হওয়ার পর তাকে বেশ নিরুদ্বেগ মনে হচ্ছে। এমনকি মনে হচ্ছে যেন বিষয়টা সে বেশ উপভোগ করছে। সাথে সাথে আমার মনে সন্দেহ জাগলো।
বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠতেই সে বললো, হ্যাঁ, এবার ঠিক মনে পড়েছে! কোথায় হারিয়েছে এবার মনে পড়েছে। কাল বিকেলে ময়াগুহা ছেড়ে আসার আগে লক্সিয়াস, বেকাথা আর আমি শেষবারের জন্য জলাধারে সাঁতার কাটতে গিয়েছিলাম। মনে পড়েছে পানিতে নামার আগে আমি আংটিটা খুলে যে পাথরটার উপর সবসময় রাখতাম তার উপরে রেখেছিলাম। নিশ্চয়ই সেখানেই আংটিটা ফেলে এসেছি।
তার গুল মারা আর কল্পনার সাথে তাল মিলিয়ে বেশ গম্ভীরভাবে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ঠিক বলছো তো? অন্য কোথাও ফেলোনি তো?
সাথে সাথে সে আমাকে আস্বস্ত করে বললো, হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত। অন্য কোথাও অবশ্যই পড়েনি।
এবার আমি তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললাম, তাহলে তো ব্যাপারটা বেশ সহজ হয়ে গেল। তোমার দুশ্চিন্তা শেষ তেহুতি। আমি কর্নেল হুইকে ময়াগুহায় পাঠাবো। সে তার সবচেয়ে দ্রুতগামী ঘোড়ায় চড়ে সেখানে গিয়ে কাল সকালের আগে ফিরে আসতে পারবে।
একথায় সে হঠাৎ হতচকিত হয়ে গেল। সঙ্কটে পড়ে হাত কচলাতে কচলাতে বললো, কিন্তু…না, তুমি হুইকে সেখানে পাঠাতে পারবে না।
আমি সরলভাবে বললাম, কিন্তু কেন? হুইতো ভালো লোক।
সে একটু ইতস্তত করে তারপর বললো, জিনিসটা কোথায় ফেলে এসেছি সেটা হুইকে ঠিকমতো বুঝিয়ে বলতে পারবো না। হুই একজন বিদেশী। সে ভালোভাবে মিসরীভাষা বলতে পারে না।
আমি তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকালেও সে আমার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারছিল না। উচ্চারণ বিদেশি ঢংয়ের হলেও একটি পল্টনকে নেতৃত্ব দেবার মতো মিসরি সে ভালোই বলতে পারে। সে যে ওজর দেখিয়েছে আমি তা খন্ডন করা সত্ত্বেও তেহুতি বললো, আমি হুইকে বিশ্বাস করি না। মনে নেই সে কীভাবে আমাদের ছোট্ট বেকাথাকে নাজেহাল করেছিল। সে আংটিটা চুরি করে ফেলতে পারে। তাকে কোন কিছু দিয়ে আমি বিশ্বাস করতে পারি না।
