সেখানে জারাস তার অধীনস্থ লোকদের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। ওরা সবাই অর্ধেক বর্ম পরেছিল, তবে শিরস্ত্রাণের মুখের ঢাকনি উপরের দিকে উঠানো থাকায় সবার মুখ দেখা যাচ্ছিল। তলোয়ার খাড়া করে ঠোঁটে চুঁইয়ে ওরা সবাই ঋজু আর স্থির হয়ে অভিবাদনের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
জারাস গর্জে উঠলো, লড়াই শুরু! সামনের বারোজন তলোয়ার হাতে দ্রুত সামনে বামদিকে ঝুঁকে পড়। এক…।
লোকগুলো সমস্বরে চিৎকার করে উঠলো, এক! তারপর নিখুঁতভাবে সকলে তলোয়ার বাগিয়ে একযোগে সামনে বামদিকে শরীর বাঁকিয়ে ঝুঁকে পড়লো, তারপর আবার আগেকার অবস্থানে ফিরে এলো। রোদে তলোয়ারের পাতগুলো সোনার মত চকচক করে উঠলো।
তারপর হঠাৎ সামনের সারির মধ্যখানে একটি ছোটখাট মানুষের দিকে আমার নজর পড়লো। প্রথমে আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না আমি কী দেখছি। তারপর বুঝলাম না ঠিকই দেখেছি, এটা তেহুতি। সে রক্ষীবাহিনীর আঁটোসাটো পোশাক পরে রয়েছে। তার নুবিয় উপজাতীয় পরিচারিকাদের মধ্যে অন্তত তিনজন সূচিশিল্পে পটু ছিল, ওরা নিশ্চয়ই এক বেলাতেই পোশাকটা সেলাই করে দিয়েছে। আর সেনাবাহিনীর সাথে থাকা কামার তার হালকা পাতলা গড়নের সাথে খাপ খাইয়ে বর্মটি তৈরি করে দিয়েছে। সেনাবাহিনীর নিয়মিত একটি ভারী তলোয়ার হাতে ধরে রয়েছে, যা বিশেষত তার জন্যই তৈরি করা হয়েছে।
মুখে রক্তিমাভা, ঘামে ভেজা চুল লেপ্টে রয়েছে আর গায়ে সেঁটে থাকা আঁটো জামাটাও ঘামে ভেজা। আমি আতঙ্কিত হলাম। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল একটি চাষার মেয়ে, যে সারাদিন তার স্বামীর ক্ষেতে কাস্তে হাতে ফসল কেটেছে কিংবা নিড়ানি দিয়েছে। তাকে ঘিরে রয়েছে একদল রুক্ষ চেহারার সৈন্য। আর সে এমন আচরণ করছিল যেন, তার চেহারা বা রাজকীয় পদমর্যাদা নিয়ে এদের মাঝে থেকে সে মোটেই লজ্জিত নয়।
আমি অবশ্য তাকে জারাসের কাছ থেকে তলোয়ার চালানো শিখতে বলেছিলাম। এমনকি এই পরিকল্পনায় উৎসাহও জুগিয়েছিলাম। তবে আমার ধারণা ছিল সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে নিভৃতে এই প্রশিক্ষণ চলবে আর কেউ তা দেখতে পাবে না।
দেবতারা সাক্ষী দেবেন যে, সাধারণ মানুষদের আমি অবজ্ঞার চোখে দেখি না। কিন্তু তাই বলে এতো উচ্চ মর্যাদার আসন থেকে নিচে নেমে সাধারণ মানুষের কাতারে এসে তাদের প্রতি সৌজন্য দেখানোরও একটা সীমা আছে।
আমার প্রথমে ইচ্ছা হচ্ছিল কুচকাওয়াজের ময়দানের মধ্য দিয়ে ছুটে গিয়ে তেহুতির ঘাড় ধরে টেনে রাজকীয় শিবিরের ভেতরে নিয়ে যাই। আর তাকে ধমক দিয়ে বলি যেন সে যথাযথ পোশাক পরে আর জনসাধারণের মাঝে গেলে তার আচরণ যেন আরও শোভন হয়।
তারপর আমার মাঝে সুবুদ্ধির উদয় হল। আমি জানি পুরো পল্টনের মাঝেও আমার কথা অমান্য করতে সে মোটেই ইতস্তত করবে না, যার ফলে ওরা যে সম্মানের চোখে আমাকে দেখতো তা ম্লান হয়ে যাবে।
আমি লক্ষ করলাম অস্ত্রধারীদের মধ্য দিয়ে সে এমন সাবলিল আর নিপুণতার সাথে মসৃণভাবে এগিয়ে চলেছে যে, তার চারপাশের শক্তিশালী যোদ্ধাদেরকে মনে হচ্ছিল হেঁচড়িয়ে চলা হাল চাষ করা কৃষক। সে একবারও ভুল পদক্ষেপ ফেলেনি কিংবা ছন্দ হারায়নি। সাবলীলভাবে তলোয়ারটি এক হাত থেকে অন্য হাতে নিচ্ছে আর লাফ মেরে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে দ্রুত তলোয়ার চালাচ্ছে। বাম আর ডান, দুই হাতেই সমানতালে তলোয়ার চালাচ্ছে। তার চোখেমুখে পূর্ণ মনোযোগ এবং দৃঢ় সংকল্প ফুটে উঠেছে। সে অত্যন্ত চমৎকার এবং উচ্চপর্যায়ের দক্ষতা প্রদর্শন করছিল। ভারী তলোয়ার ধরা সরু হাতে যে প্রচণ্ড শক্তি আছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তলোয়ার ঘুরাবার সময় বাতাসে সাঁই সাঁই শব্দ উঠছে। সবশেষে সে তলোয়ারটি এমনভাবে সামনে বাড়িয়ে ধরলো, যেন এটি পালকের মতো হালকা, ভারী কোনো ধাতু নয়। তারপর একটি হাতির দাঁতের মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়াল।
জারাস নির্দেশ দিল, আরামে দাঁড়াও! সাথে সাথে দর্শকরা খুশিতে ফেটে পড়ে একযোগে হাততালি দিয়ে আর পা মাটিতে দাপিয়ে আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলো। তারপর একটি কণ্ঠ তার নামের প্রতিটি অক্ষর আলাদা আলাদাভাবে উচ্চারণ করলো:
তে-হুঁ-তি! সাথে সাথে আর সবাই তার সাথে গলা মিলিয়ে ডেকে উঠলো, তে-হুঁ-তি!
তারপর শুরু হল সম্মিলিত কণ্ঠে স্তব। আমিও এই বীর বন্দনায় সামিল হলাম। তে-হুঁ-তি।
প্রশান্ত গাম্ভীর্য আর পদমর্যাদা ভুলে গিয়ে আমিও ওদের সাথে গলা মিলিয়ে স্তব শুরু করলাম।
.
পরিশেষে উত্তর থেকে একজন বার্তাবাহক উটে চড়ে ময়াগুহায় এলো। সে সেনাপতি রেমরেমের কাছ থেকে বার্তা নিয়ে এসেছে যে, দুই সপ্তাহ বিশ্রাম নেওয়ার পর তার অগ্রবর্তী দলটি জয়নাব মরুদ্যান থেকে সামনের দিকে যাত্রা শুরু করার জন্য প্রস্তুত হয়েছে।
সে জানিয়েছে সবকিছু ঠিক আছে। তার দলের কারও কোন ক্ষতি হয়নি কেবল একটি উট সে হারিয়েছে। সে আমাকে তাড়াতাড়ি জয়নাব মরুদ্যানের দিকে রওয়ানা হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়ে বলেছে মরুদ্যানটি এখন খালি এবং এর মাটির নিচের ঝরণা থেকে প্রচুর পানি এসে জলাধারটি পূর্ণ হয়েছে।
যথারীতি আমি জারাসকে নির্দেশ দিলাম, তবে শিবির উঠিয়ে সমস্ত মালামাল ভারবাহি পশুর উপর তুলতে দুইদিন লেগে গেল। এর ফাঁকে জারাসকে আমার তাঁবুতে ডেকে পোশাক খুলে তার ক্ষতটা পরীক্ষা করলাম। দেখলাম সে শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছে। যে জায়গায় অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল সেজায়গাটি ঘন কালো লোমে ঢাকা পড়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে। সে আমাকে আশ্বস্ত করলো যে পেটের ভেতরে ক্ষত সৃষ্টি হলেও এখন তার পাকস্থলী ঠিক আগের মতো কাজ করছে। সেদিন সকালেই আমি দেখেছিলাম সে পুরো বর্ম পরে আর কাঁধে একটি বালুর বস্তা নিয়ে দশ লিগ লম্বা একটি দৌড় থেকে সবার আগে ফিরে এসেছিল।
