তারপর আমি স্বস্তি পেলাম যখন দেখলাম বেকাথা মাটিতে দুপায়ের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে আর প্রচণ্ড রাগে আর লজ্জায় কাঁপছে। আসলে সে মাটিতে এক জায়গায় স্তূপ করা ঘোড়ার বিষ্ঠার উপর পড়েছিল। একারণে ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়লেও তার হাতপা ভাঙেনি আর সম্ভবত এজন্যই তার জীবন রক্ষা পেয়েছে। তবে ঘোড়ার নাদি মাখামাখি হয়ে তার চেহারা বিশ্রী হয়ে এক অপমানকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
তার পা থেকে মাথার লাল চুল পর্যন্ত ঘোড়ার সবুজ নাদিতে মাখামাখি হয়ে রয়েছে। হুই ছুটে তার কাছে পৌঁছাবার পর কেবল তার দিকে তাকিয়ে রইল। সে বুঝে উঠতে পারছিল না এ পরিস্থিতিতে তার কী করা দরকার। আর বেকাথাকে সান্ত্বনা দেবার জন্য আমি তার কাছে পৌঁছার আগেই, হুই এমন একটি কাজ করলো যাতে বিষয়টা জটিল হয়ে দাঁড়াল। সে বেকাথার অবস্থা দেখে হেসে ফেললো।
সাথে সাথে বেকাথা তার স্বভাবসুলভ প্রতিক্রিয়া দেখাল। প্রচণ্ড রাগে সে প্রায় উন্মাদ হয়ে গেল। তখনও তার ডান হাতে গোলকটা ধরা ছিল। সে সোজা এটা হুইয়ের মাথা লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারলো। হুই হঠাৎ এ-ধরনের আক্রমণ আশা করেনি, তাই সে নিজেকে বাঁচাতে পারলো না। ভারী গোলকটার চামড়া রোদে শুকিয়ে হাড়ের মতো শক্ত হয়ে ছিল। এটা তার চওড়া নাকের বাঁশির উপর আঘাত হানতেই ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরতে শুরু করলো। এতেও বেকাথা ক্ষান্ত হলো না।
সে যে ঘোড়ার বিষ্ঠার গাদার উপর দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকে নিচু হয়ে দুই হাত ভরে নাদি তুলে নিয়ে হুইয়ের দিকে ছুটে গিয়ে তার ভাঙা নাকের উপর ঘসে দিল।
তারপর শীতল কণ্ঠে বললো, তুমি যদি মনে কর আমাকে দেখে তোমার হাসি পাচ্ছে, তাহলে এবার নিজের চেহারাটা দেখো কর্নেল হুই। তারপর সে ঘুরে মাঠ থেকে বের হয়ে সোজা রাজকীয় শিবিরের দিকে হেঁটে চললো। দর্শকদের মধ্যে কেউ আর হাসার সাহস করলো না, এমনকি আমিও না।
হুইকে আর কখনও রাজকীয় খাবার টেবিলে আমন্ত্রণ করা হয়নি আর রাজকুমারীদের ঘোড়ায় চড়া শেখানোর জন্য ডাকা হয়নি।
এর কয়েকদিন পর যখন বেকাথা আর লক্সিয়াস নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল তখন আড়াল থেকে আমি তাদের কথা শুনে ফেললাম। রাজকুমারীদের লেখাপড়ার জন্য শ্রেণিকক্ষ হিসেবে একটা তাঁবু আলাদা করে রাখা হয়েছিল। ওরা সেখানে মিনোয়ান ভাষায় কথা বলছিল। আমি এই তাবুর পেছনে দাঁড়িয়ে বাইরে পাহাড়চূড়াগুলোর বিভিন্ন রঙের দৃশ্য উপভোগ করছিলাম। অবশ্যই আমি আমার ছাত্রীদের কথোপকথন আড়ি পেতে শুনছিলাম না। তবে তাঁবুতে ঢোকার মুখে এই জায়গায় এসে একটু থামতেই ওদের কিছু কথা অসাবধানতাবশত আমার কানে এলো।
লক্সিয়াস বেকাথাকে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কি এখনও কর্নেল হুইকে ক্ষমা করোনি?
বেকাথা উগ্রকণ্ঠে উত্তর দিল, আমি কোনোদিনই তাকে ক্ষমা করবো না। সে একজন অসভ্য গেয়ো ভূত। যখন আমি ক্রিটের রানি হব তখন তার মাথা কেটে ফেলার নির্দেশ দেবো।
ইস কী মজা হবে। আমাকে দেখতে দেবে?
এটা ঠাট্টা নয় লক্সিয়াস। আমি সত্যিই বলছি।
কিন্তু তুমি তো আমাকে আর তেহুতিকে বলেছিলে যে এই পৃথিবীতে সেই তোমার উপযুক্ত একমাত্র লোক?
এবার বেকাথার গলায় অহঙ্কারের সুর, আমি মত পাল্টেছি। তার মতো একজন বয়স্ক লোক দেখতে বিশ্রী, যে আচার ব্যবহার জানে না তার সাথে। আমার কী? যার আবার চল্লিশটা বিশ্রী চেহারা বউ আছে।
সে তেমন বয়ষ্ক নয় বেকাথা আর সে দেখতেও বেশ সুন্দর। আমি যদুর জানি থিবসে তার কেবল পাঁচজন বউ আছে আর ওরা দেখতেও বেশ সুন্দর।
বেকাথা দৃঢ়কণ্ঠে বললো, সে খুবই বুড়ো, এমনকি তায়তার চেয়েও বুড়ো। ভাঙা নাক আর মুখে ঘোড়ার নাদিসহ তাকে আমার মোটেই সুন্দর মনে হয় না। তার পাঁচ বউ তাকে নিয়ে থাকুক। আমার আর তাকে দরকার নেই।
বেকাথার এ-ধরনের রুঢ় শব্দ চয়ন আর আমার বয়স নিয়ে মানহানিকর মন্তব্য করাটা আমি ক্ষমা করলাম। এবার অন্তত একটা সমস্যার সমাধান হয়েছে। এখন থেকে তার বড় বোনের সাথে সাথে তারও কুমারীত্ব রক্ষা করতে আমাকে আর পাহারা দিতে হবে না।
আমি একটু গলা খাঁকারি দিতেই ওদের কথা থেমে গেল। তাবুর দরজা দিয়ে মাথা নিচু করে ঢুকে দেখলাম দুজনেই টেবিলে মাথা ঝুঁকে খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু লিখছে। আমি ওদেরকে প্যাপিরাসে লেখা মিসরের ইতিহাসের কয়েকটি অধ্যায় দিয়েছিলাম, সেগুলো ওরা ক্রেটান ভাষায় অনুবাদ করছে। আমি পাশে এসে দাঁড়ালেও বেকাথা মাথা তুলে আমার দিকে তাকাল না।
তোমার অধ্যবসায় আর প্রাচীন মিসরীয় লিপিতে চমৎকার হাতের লেখা দেখে আমি সত্যি খুশি হয়েছি রাজকুমারী। তবে তোমার বোন তোমার সাথে নেই কেন?
সে তার তুলিটি সামনের দিকে তুলে বললো, সে ওদিকে খুব ব্যস্ত রয়েছে। আমাকে বললো একটু পরেই এখানে আসবে। একথা বলেই সে আবার তার লেখার কাজে মনোনিবেশ করলো।
শিবিরের শেষ প্রান্তে কুচকাওয়াজের ময়দান থেকে রক্ষীদের গুঞ্জন আমি শুনছিলাম, তবে খুব একটা খেয়াল করিনি। এবার বেকাথার কথা শুনে আমার একটু কৌতূহল জাগতেই বিষয়টা কি জানার জন্য তাঁবু থেকে বের হয়ে সেদিকে চললাম। কুচকাওয়াজের ময়দানের চারপাশ ঘিরে বেশ কয়েকজন ঘোড়ার সহিস, পেশাদার চিত্তবিনোদনকারী, চাকরবাকর, ক্রীতদাস আর অন্যান্য অসামরিক লোক দল বেধে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওরা এমন মগ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, আমার লোকজন কনুই দিয়ে ধাক্কা মেরে ভীড় সরিয়ে আমার এগোবার জন্য পথ করে দিল। ময়দানের কিনারায় দাঁড়িয়ে আমি চারদিকে তাকিয়ে সাথে সাথে তেহুতিকে দেখতে পেলাম না।
