জারাস আবার আমাকে নিশ্চয়তা দিয়ে বললো, না, না মোটেই না। কোনো অসুবিধা নেই প্রভু। বরং এটাকে আমি বিরাট একটি সম্মান আর বিশেষ অনুগ্রহ মনে করবো।
তাহলে শুরু করে দাও। আমার খুব কৌতূহল হচ্ছে জানতে যে, তুমি তাকে দিয়ে কি করতে যাচ্ছ। এনিয়ে আর চিন্তা করার দরকার নেই, তবে কথাটা আক্ষরিক অর্থে ঠিক ছিল না। বরং এটা ছাড়া অন্য বিষয়ে খুব কম চিন্তা করেছি। পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে জারাস আর তেহুতিকে নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় কাটালাম।
জারাস প্রতিদিন আরও শক্তিসঞ্চয় করতে লাগলো।
রোজ সকালে সূর্য উঠার সময় থেকে শুরু করে দুপুর পর্যন্ত তার লোকদেরকে নিয়ে উঁচুনিচু ময়দানে দৌড়াত। আমিও ওদের সাথে দৌড়াতাম। আমার অসাধারণ শক্তি এবং সহিষ্ণুতা ছিল আর আমি আমার চেয়ে বয়সে অর্ধেক লোকদের সাথে প্রতিযোগীতা করতে পারতাম।
প্রথম প্রথম আমি দেখতাম সে কি পরিমাণ কষ্ট সহ্য করছে আর অবাক হলাম লক্ষ করে যে, আমি ছাড়া আর সবার কাছ থেকে সে তার কষ্ট লুকিয়ে রাখতে পেরেছে। তবে কিছুদিন পরই আমার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আর তার পল্টনের লোকদেরকে নেতৃত্ব দিয়ে গান গাইতে গাইতে দৌড়াতে লাগলো। অনেক সময় আমার রসিকতায় মনখুলে হাসতেও লাগলো।
তার অধ্যবসায় আর আত্ম-উন্নতির ক্রমাগত প্রচেষ্টাকে সমর্থন করলাম। তবে সবকিছুরই একটা পরিমিতি বোধ থাকা দরকার। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে যে আচরণ স্বাভাবিক, তা আমাদের মতো সমাজের উপরের স্তরের মানুষের জন্য শোভনীয় নয়।
যখন আমার সাথে পরামর্শ না করে সে সিদ্ধান্ত নিল যে, এখন থেকে প্রতিদিন সকালে সবাই পিঠে একটা করে বালুর বস্তা নিয়ে দৌড়াবে, তখন আমি বুঝতে পারলাম অন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আমি অবহেলা করে চলেছি। মরুভূমির মধ্য দিয়ে নির্বোধের মতো ছুটাছুটি করে কতগুলো তরুণ ষণ্ডার সাথে প্রতিযোগীতা করার চেষ্টা না করে, আমাকে রাজকুমারীদেরকে গণিতের বিজ্ঞান আর জ্যোতিষতত্ত্ব শিক্ষা দিতে হবে। এছাড়া দেবতাদের বংশবৃত্তান্ত নিয়ে রচিত গবেষণাকর্মটির শেষ অধ্যায়গুলো রচনার কাজটিও সমাপ্ত করা দরকার।
তাছাড়া আমি মনে করি পেশিশক্তির চেয়ে মনকে সবসময় প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
.
সেনাপতি রেমরেম জয়নাব মরুদ্যানের উদ্দেশ্যে চলে যাওয়ার পর, ময়াগুহায় অপেক্ষা করার সময় আমি পড়াশুনা আর ব্যবিলনে পৌঁছার আগে সমস্ত পরিকল্পনা সেরে নিচ্ছিলাম। সময় সুন্দরভাবে দ্রুত বয়ে যাচ্ছিল।
তবে এসময়ে আমাদের দলের মধ্যে বেশ উল্লেখযোগ্য আর বিস্ফারোন্মুখ কিছু ঘটনা ঘটে চলেছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল রাজকুমারী বেকাথা আর কর্নেল হুইয়ের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের অবসান।
বেকাথার অনুরোধে কর্নেল হুই রোজ বিকেলে তাকে অশ্বক্রীড়ার বিভিন্ন কলাকৌশল শেখাচ্ছিল। তার প্রশিক্ষণে বেকাথা দ্রুত একজন অসমসাহসিক অশ্বারোহীতে পরিণত হচ্ছিল। সে সবসময় নির্ভীক ছিল। ভারসাম্য বজায় রাখা আর ঘোড়ার জিনে বসা, এই সবদিকে দিয়ে সে হুইয়ের সেনাদের থেকে অনেক পারদর্শীতা অর্জন করেছিল। এরা বেশিরভাগ ছিল রথের চালক, তাই ঘোড়ার পিঠে চড়ার চেয়ে বরং ঘোড়ার পেছনে থাকতেই পছন্দ করতো।
অন্যদিকে বেকথা ঘোড়ায় চড়ার সময় দাঁড়িয়ে থাকতে পছন্দ করতো। এটা আমিই তাকে শিখিয়েছিলাম। ঘোড়ার চড়ার সময় সে সবসময় তার দক্ষতা দেখাতে পছন্দ করতো আর কোনো দর্শক থাকলে, তার কলাকৌশলগুলোও দেখাতে ভালোবাসতো।
এক বিকেলে হুই তাকে একটা গোলক নিয়ে খেলা শেখাচ্ছিল। গোলকটি ছিল ওজনে ভারী আর কাঁচা চামড়ার ফালি দিয়ে বানানো একটা বড় বল। এই খেলায় দুই দলে চারজন করে ঘোড়সওয়ার থাকে আর দুজন ঘোড়সওয়ার ডগা বাঁকানো একটি লাঠির ডগায় গোলকটা ধরে মাঠের শেষ প্রান্তে একটি চিহ্নিত করা জায়গায় নিয়ে যাবে। আর ওদের প্রতিদ্বন্দ্বিরা ওদেরকে বাধা দেবে। এটি ছিল হৈচৈ আর জোর জবরদস্তি করে খেলার মতো একটি প্রতিযোগীতা। অনেক দর্শকের চিৎকার আর হৈ হুল্লোড়ের মধ্যে এটা চলতো।
সেদিন বিকেলে হুই বেকাথাকে শেখাচ্ছিল কীভাবে ঘোড়ার পিঠ থেকে নিচু হয়ে বালুতে গড়ানো বলটা তুলে নেওয়া যায়। রোজকার মতো গোটা পঞ্চাশেক সৈন্য আর শিবিরের অলস কিছু লোক মাঠের দুইধারে সারবেঁধে দাঁড়িয়ে খেলাটা উপভোগ করছিল।
বেকাথার ঘোড়া টগবগিয়ে মাঠে ঢুকলো। তার দুই হাত মুক্ত ছিল আর সে হাঁটুর গুঁতো দিয়ে ঘোড়াকে সামলাচ্ছিল।
হুই মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে গোলকটা নিয়ে অপেক্ষা করছিল। বেকাথা মাঠে ঢুকতেই সে গোলকটা তার সামনে মাটিতে ছুঁড়ে মারলো। বেকাথা ঘোড়ার গদি থেকে একদিকে ঝুঁকে নিচু হয়ে গোলকটা তুলতে চেষ্টা করলো; তার দেহের সমস্ত ওজন জিনের একপাশের রেকাবের উপর ছিল। আমার মতে এটা ছিল অতি চমৎকার একটি ক্রীড়াশৈলী। সমস্ত দর্শক চিৎকার করে তাকে উৎসাহ দিয়ে চললো, আমিও তাদের সাথে যোগ দিলাম।
বিশাল ঘোড়াটির পিঠে বেকাথাকে দেখতে ডাইনিসুলভ মনে হলেও সে অনায়াসে নিচের দিকে ঝুঁকে মাটিতে গড়ানো গোলকটির চারটি পালকের হাতলের একটি ধরে ফেললো। খুশিতে আত্মহারা হয়ে সে বলটি তুলতে শুরু করলো।
তারপর হঠাৎ তার জিনের রেকাবের চামড়া ছিঁড়ে গেল আর সে ঘোড়ার জিন থেকে শূন্যে ছিটকে পড়লো। তবে সে মাটিতে পড়ার আগেই আমি তার দিকে ছুটে গেলাম। ভাবলাম হয় সে মরেই গেছে আর নয়তো সাংঘাতিকভাবে আহত হয়েছে। অন্যদিকে হুই আমার আগেই দ্রুত তার দিকে ছুটে গেল।
