আমি দেখলাম দুঃখে আর হতাশায় তার চেহারা বদলে যাচ্ছে। লক্ষ্য করলাম হঠাৎ তার চোখের কোনে পানি টলটল করে উঠছে। এখন আর সে অভিনয় করছে না।
আমি জানি তুমি আমাকে অচেনা বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে। সেখানে একজন বৃদ্ধলোকের হাতে আমাকে তুলে দেবে, যার সারা শরীরের চামড়া কুঁচকানো আর বিবর্ণ; হাতগুলো ঠাণ্ডা। আর তার নিঃশ্বাসের দুর্গন্ধে বমিতে আমার পেট গুলিয়ে উঠবে। সে আমার সাথে নোংরা কাজ করবে… আবার কান্নার দমক থামিয়ে বলে চললো, এগুলো ঘটার আগে আমার মাকে তুমি যা দিয়েছিল তা আমি একবারের জন্য চাই। আমি এমন একটি মানুষকে চাই, যে আমার মুখে হাসি এনে দেয় আর যার কারণে আমার হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়। আমি এমন একজন মানুষকে চাই যে আমাকে সত্যিকার ভালোবাসে আর যাকে আমিও সত্যিকার ভালোবাসি।
আমি মৃদু কণ্ঠে বললাম, তুমি জারাসকে চাও। সে চিবুক তুলে সজল চোখে আমার দিকে তাকাল।
হ্যাঁ আমি জারাসকে চাই। শুধু একবার ভালোবেসে সেই মূল্যবান বস্তুটিকে বুকে চেপে ধরে রাখতে চাই। আমি জারাসকে আমার স্বামী হিসেবে চাই। শুধু সামান্য সময়ের জন্য যদি তুমি এটুকু আমাকে দাও, তাহলে আমি সানন্দে গিয়ে ফারাও, মিসর আর তোমার জন্য আমার অতি প্রিয় তায়তার জন্য যেকোনো দায়িত্ব পালন করবো।
তাহলে প্রতিজ্ঞা কর তেহুতি। একথা কখনও কাউকে বলবে না, এমনকি তোমার নিজ সন্তানদেরও বলবে না।
সে শুরু করলো, কিন্তু আমার মা… কিন্তু আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, তোমার মায়ের বেলায় ভিন্ন পরিস্থিতি ছিল। তোমার বেলায় তা হবার নয়। তোমাকে কথা দিতে হবে।
তারপর সে রাজি হয়ে বললো, ঠিক আছে আমি কথা দিচ্ছি। তার কথা আমার বিশ্বাসযোগ্য মনে হল।
তবে তোমাকে বুঝতে হবে তুমি কোনোদিন জারাসের সন্তান গর্ভে নিতে পারবে না।
এরকম না হলে ভালো হত তায়তা। ছোট্ট একটি নিজের জারাস পেলে আমি খুবই খুশি হতাম। কিন্তু আমি জানি তা হবার নয়।
প্রত্যেক মাসে যখন তোমার নারীত্বের লাল ফুলটি ফোঁটার সময় হবে, তখন আমি তোমাকে একটি নির্যাস খেতে দেবো। শিশুটি তখন তোমার রক্তস্রাবের সাথে বের হয়ে আসবে।
একথা ভেবে আমি কাঁদবো।
সর্বাধিরাজ মিনোজের স্ত্রী হওয়ার পর জারাসকে সারাজীবনের জন্য ভুলে যেতে হবে। তুমি ক্রিটের রাজকীয় হেরেমে থাকবে। জারাস মিসরে যাবে। তুমি আর কখনও তার দেখা পাবে না। বুঝতে পেরেছ তেহুতি? সে ঘাড় নেড়ে সায় দিল।
আমি আদেশের সুরে বললাম, উচ্চারণ করে বল, যে আমার কথা বুঝেছ।
সে পরিষ্কার কণ্ঠে বললো, হ্যাঁ বুঝেছি।
মিনোজের সাথে বিয়ের রাতে আমি ভেড়ার রক্ত ভরে একটা রবারের ব্যাগ তোমাকে দেবো। সে যখন তোমাকে বিছানায় নেবে তখন এটা ফেটে যাবে। এটা তাকে তোমার কুমারীত্ব সম্পর্কে নিঃসন্দেহ করবে।
সে ফিসফিস করে বললো, বুঝতে পেরেছি।
আমি জোর দিয়ে বললাম, কাউকে একথা বলো না। বিশেষ করে বেকাথাকে অবশ্যই বলবে না। তার ছোট বোনটি সারাদিন গল্প করে বেড়ায় আর কোনো কথা গোপন রাখতে পারে না।
সে বললো, ঠিক আছে, কাউকে একথা জানাবো না। এমনকি আমার ছোট বোন বেকাথাকেও না।
তুমি কি জানো কি বিপদের মধ্যে তুমি পড়তে যাচ্ছো তেহুতি? তোমার জীবন মরণ তখন মিনোজের হাতে থাকবে। একজন রাজার সাথে প্রতারণা করা খুবই হঠকারিকতাপূর্ণ ব্যাপার। তোমাকে খুব সাবধানে থাকতে হবে যাতে ব্যাপারটা কোনোদিন জানাজানি হয়।
আমি বুঝতে পেরেছি। আমি জানি তুমিও আমার মতো একই ঝুঁকি নিচ্ছ। আর তাই আমি তোমাকে আরও ভালোবাসি।
অবশ্যই এই কাজটা একটা পাগলামি, তবে জীবনে আমি অনেক পাগলামো করেছি। শুধু একটি সান্ত্বনা যে এখনও হাতে প্রস্তুতি নেওয়ার কিছু সময় আছে। জারাসের জখম এতে একটি বাধা হয়ে আছে। ভালোবাসার এই উন্মাদনার কর্মকাণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো সুস্থ সে এখনও হয়নি। তবে যাইহোক সে দ্রুত আরোগ্যের পথে রয়েছে।
৫. কথা বলার অনুমতি
দুইদিন পর জারাস আমার কাছে এসে কিছু কথা বলার অনুমতি চাইল।
কখন থেকে তোমার আবার কথা বলার জন্য অনুমতির দরকার পড়লো? এর আগে তো অনুমতির কারণে আমার সাথে কথা বলা বন্ধ থাকেনি? এবার তাকে একটু বিব্রত মনে হল।
রাজকুমারী তেহুতি আমার কাছ থেকে অস্ত্র চালনার নিয়ম-কানুন আর তরবারি চালানো শিখতে চাচ্ছেন। আমি তাকে বলেছি এর জন্য আমাকে আপনার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে।
এটা খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ হলো না জারাস। মহামান্য রাজকুমারী যা চান, তা তিনি পান।
সে আমাকে নিশ্চয়তা দিয়ে তাড়াতাড়ি বললো, আমি তাকে কোনো অসম্মান করার জন্য একথা বলছি না। তার অবস্থা দেখে আমার হাসি পেল।
আমি বললাম, রাজকুমারী অত্যন্ত দক্ষ একজন তীরন্দাজ। খুব দ্রুত তীর ছুঁড়তে পারেন। তার দৃষ্টিশক্তি প্রখর আর বাহুতেও খুব জোর আছে। আমি নিঃসন্দেহ তিনি শিঘ্রই খুব ভালোভাবে তলোয়ার চালানো শিখতে পারবেন। আর এই দক্ষতা তার ভবিষ্যৎ জীবনে কোনো না কোনো সময় অবশ্যই কাজে আসবে। কে জানে? এটা হয়তো এক সময় তার জীবন বাঁচাতে পারে। আমি জানিনা কেন একথাটা বললাম। তবে ঘটনা যেভাবে গড়াচ্ছে তাতে মনে হয় আমার এই কথাটাই আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উক্তি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তার এই অনুরোধ রাখতে তোমার কি কোনো অসুবিধা আছে জারাস?।
