ময়াগুহা ছেড়ে বের হওয়ার সময় আমি বেকাথাকেও আমাদের সাথে ঘোড়ায় চড়ে যেতে বলেছিলাম। কিন্তু আমাকে অবাক করে সে এই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছিল, আমি তাকে যে প্রাচীন মিসরীয় লিপির লেখ্যপট দিয়েছিলাম, সে তা নিয়ে কাজ করতে চাচ্ছে। বেকাথা খুব একটা মনোযোগী কিংবা পরিশ্রমী ছাত্রী নয়, তাই তার একথায় বেশ অবাক হয়েছিলাম। অবশ্য এখন আমি জানতে পেরেছি কে তাকে হঠাৎ লেখার দিকে মনোযোগ দিতে আগ্রহী করেছে।
প্রথম লিগ আমি আর তেহুতি পাশাপাশি নীরবে ঘোড়ায় চড়ে চলতে লাগলাম। তারপর হঠাৎ সে জিজ্ঞেস করলো, তুমি আমার বাবাকে খুব ভালো করে জানো তাই না? অথচ আমি কিছুই জানি না। তুমি এর আগে কখনও তার সম্পর্কে কিছুই বলে নি। এখন বল না তায়তা।
মিসরের সবাই তোমার বাবা সম্পর্কে ভালো করেই জানে। তিনি ছিলেন স্বর্গীয় দেবতা ফারাও ম্যামোস। বংশধারার অষ্টম পুরুষ। তিনি ছিলেন সাম্রাজ্যের স্তম্ভ, ন্যায়পরায়ণ, মহান, সর্বদ্রষ্টা, দয়ালু…।
সে সরাসরি অস্বীকার করে বললো, না, তিনি তা ছিলেন না। দয়া করে। আমাকে মিথ্যা বলো না তায়তা। হঠাৎ এই অভিযোগে আমি হতবুদ্ধি হয়ে তার দিকে ঘুরে তাকালাম।
হেসে বিষয়টার পরিসমাপ্তি করার চেষ্টা করে বললাম, তাহলে আমি হয়তো ভুল জেনেছি! ফারাও না হলে তোমার মতো একজন মেয়ের পিতা তাহলে কে সেই সৌভাগ্যবান লোক। আমার সত্যি তাকে হিংসা হচ্ছে।
আমার আসল বাবা ছিলেন মহান তানুস। আর তার বাবা ছিলেন পিয়াংকি, প্রভু হারাব। তার মা ছিলেন একজন মুক্ত তেহেনু ক্রীতদাসী। যার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে আমি সোনালি চুল আর নীল চোখ পেয়েছি। লোকে বলে তিনি খুবই সুন্দরী ছিলেন। আমার বাবাও তার মায়ের কাছ থেকে অপরূপ দৈহিক সৌন্দৰ্য্য পেয়েছিলেন। সবাই বলে তিনি ছিলেন মিসরের সবচেয়ে সুন্দর পুরুষ।
আমি বললাম, কে তোমাকে এসব আজেবাজে কথা বলেছে?
আমার নিজের মা লসট্রিস বলেছেন। এখন বল তিনিও মিথ্যা বলেছেন।
আমি হতভম্ব হয়ে পড়লাম। ফারাওয়ের সিংহাসন আর মিসরের অস্তিত্বের ভিত্তি পর্যন্ত কেঁপে উঠতে শুরু করেছে। আর আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়তে যাচ্ছে। এমন বিপজ্জনক কথা আমি কখনও শুনিনি।
হা করে তার দিকে তাকিয়ে বললাম, একথা আর কাকে বলেছে?
কাউকেই না; শুধু তোমাকেই বললাম।
তুমি কি জানো একথা আর কাউকে বললে কি পরিণতি হতে পারে?
ঘোড়ার জিন থেকে ঝুঁকে এক হাত বাড়িয়ে আমার হাত ধরে সে সান্ত্বনার সুরে দিয়ে বললো, প্রিয় তায়তা। আমি এতো বোকা না।
এবার আমি বেশ জোরে বললাম, তুমি কি নিশ্চিত যে, তোমার ভাইকে একথা বলনি? ফারাও কি একথা জানেন? আর বেকাথা? তাকে বলেছো?
এবার সে শান্ত কণ্ঠে আমাকে আস্বস্ত করে বললো, না। বেকাথা এখনও ছোট্ট একটি মেয়ে। আর মেমতো মরেই যাবেন, যদি তিনি জানতে পারেন যে তিনি সত্যিকার ফারাও নন।
এবার আমি সত্যি আতঙ্কিত হলাম। তার হাত ধরে জোরে জোরে নাড়তে নাড়তে বললাম, একথাও তোমার মা তোমাকে বলেছিলেন? তিনি তোমাকে
সবকিছু বলেছিলেন? দয়া করে বল আমি তোমার কথা ভুল শুনছি, তাই না?
তুমি আমার কথা ঠিকই বুঝেছো। আমার মা আমাকে বলেছেন যে, আমরা তিনজনই ফারাও ম্যামোসের নয়–মহান তানুসের সন্তান। আমরা তিনজনই অবৈধ সন্তান।
এসব কথা এখন আমাকে কেন শোনাচ্ছো তেহুতিঃ
কেননা আমিও শিঘ্রই একই অবস্থায় পড়তে যাচ্ছি যাতে আমার মা ধরা পড়ে গিয়েছিলেন। আর তুমি তাকে বাঁচিয়েছিলে। সে আমার দিকে তাকাতেই আমি অস্বীকৃতি জানিয়ে মাথা নাড়লাম।
সে আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো, এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ো না তায়তা। তুমি আমার মাকে বাঁচিয়েছিলে, এবার একই কাজ আমার জন্যও করবে।
এতোটুকু আসলে সত্যি। রানি লসট্রিস ছিলেন আমার জীবনের একমাত্র সত্যিকার ভালোবাসা। তবে এখন তিনি আর নেই আর তার জায়গায় তেহুতি রয়েছে। তার কোনো অনুরোধই ফেলতে পারবো না। তবে এক্ষেত্রে অন্তত আমার নিজের মতো শর্ত আরোপ করতে পারবো। নিশ্চিত তার মায়ের মতোই সে তা উড়িয়ে দেবে। তবে আমাকে অন্তত চেষ্টা করতে হবে।
বল আমার কাছ থেকে তুমি ঠিক কি চাও তেহুতি? আমার মার একজন রাজার সাথে বিয়ে হয়েছিল, তবে তার নিজের পছন্দমতো স্বামী ছিল। রাজার নয়, তিনি তার সন্তান গর্ভে ধারণ করেছিলেন। তবে তার নিজের পক্ষে তা করা সম্ভব ছিল না। তুমিই তাকে এসব করতে সাহায্য করেছিলে। তাই না?
আমি স্বীকার করলাম, হ্যাঁ তাই হয়েছিল। একথা বলা ছাড়া আর কোনো পথ আমার জন্য ভোলা ছিল না।
তেহুতি বলে চললো, জীবনের বেশিরভাগ সময় আমি আমার ভাইয়ের হেরেমে কাটিয়েছি। তার দুইশো জন স্ত্রী রয়েছেন, অথচ তিনি কেবল একজনকে ভালোবাসেন। মাসারা ছিলেন তাদের মধ্যে প্রথম স্ত্রী। তিনি তাকে তিনটি পুত্রসন্তান দিয়েছেন। তিনি যা পেয়েছেন সেরকম পেলে আমিও সন্তুষ্ট থাকতাম। তবে আমি অন্যান্য স্ত্রীদের দূরবস্থা দেখেছি। ওরা স্ত্রী হওয়ার পর বেশির ভাগের ক্ষেত্রে সারা জীবনে ভাই একবার কি দুবার তাদের কাছে গিয়েছেন। তুমি জান ওরা কী করে, তায়তা? একথা জিজ্ঞেস করতেই আমি মাথা নেড়ে না করলাম। ওরা নিজেদের মধ্যে খেলা করে। নিজেদের সন্তুষ্টির জন্য একজন পুরুষ না পেয়ে জঘন্য কাজকারবার করে। তার গা শিউরে উঠলো। তারপর সে বললো, কী দুঃখজনক। আমি ওদের মতো হতে চাই না।
