আবার সবাই চুপ থেকে বিষয়টা নিয়ে ভাবলো। শেষ পর্যন্ত রেমরেম তার ভারী গলায় বললো, আপনার পরিকল্পনাটা বেশ ভালো তায়তা। আর আমার বিশ্বাস আপনি নিশ্চয়ই দলকে বিভক্ত করার পরিকল্পনাটাও ঠিক করে ফেলেছেন। আমি মৃদু হেসে মাথা নেড়ে সায় দিলাম।
সেনাপতি রেমরেম, আপনি অগ্রবর্তী দলের অধিনায়কত্ব নিয়ে যাবেন। এই দলে অর্ধেক মানুষ আর উটগুলো থাকবে। এছাড়া রাজকুমারী তেহুতি আর বেকাথাও আপনার সাথে যাবেন। ক্রেটান মেয়েটি-লক্সিয়াসও ওদের সাথে যাবে।
রেমরেম গদগদ কণ্ঠে বললো, আমি সত্যি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ মহান তায়তা। আমার প্রতি আস্থা স্থাপন করে আপনি আমাকে বাধিত করেছেন।
তারপর আমি একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আবার বললাম, দুই সপ্তাহ পর ঘোড়াগুলো নিয়ে আমি আপনাদের অনুসরণ করবো। দ্বিতীয় দলে আমার সাথে ক্যাপ্টেন জারাস আর কর্নেল হুই থাকবেন। ঘোড়াগুলো সামলাতে আমার হুইকে প্রয়োজন হবে। তার দিকে তাকাতেই সে ঘাড় কাত করে সায় দিল। তার প্রিয় ঘোড়াগুলো থেকে আলাদা হওয়াটা তার সহ্য হবে না। তারপর জারাসের দিকে তাকিয়ে বললাম, আর এখন থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে আশা করি নিরাপদ সফরের জন্য তোমার ক্ষত ভালোভাবে সেরে উঠবে।
আর এটাই ছিল আমার পরিকল্পনার ভেতরের বৈশিষ্ট্য। রাজকুমারীরা রেমরেমের সাথে আগেই চলে যাবে। আর আমি দ্বিতীয় দলে আমার সাথে ক্যাপ্টেন জারাস আর কর্নেল হুইকে রাখবো। এক চালে আমি মেয়েদেরকে ছেলেদের কাছে থেকে আলাদা করলাম আর সেই সাথে জারাস আর সমস্ত পশু সঠিক পরিমাণে পানি পান করে ভালো অবস্থায় ব্যবিলন পৌঁছাবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আমার রাজকুমারীও গায়ে কারোও স্পর্শ না নিয়ে সেখানে পৌঁছাবে।
আমি তেহুতির দিকে তাকাতে চাচ্ছিলাম না। আশা করছিলাম এখানে সে কোনো ধরনের চালাকি খাটাতে পারবে না।
তবে পরিষ্কার কণ্ঠে সে বললল, না। আমার মনে হয় এটা মোটেই ভালো পরিকল্পনা হল না তায়তা। আবার সে আমাকে তাতা না বলে তায়তা বলে সম্বোধন করলো।
আমি জামার হাতার ভেতর থেকে রাজকীয় বাজপাখির সীলমোহরটা বের করলাম। এটা সবসময় আমার সাথেই রাখি। যখনই প্রয়োজন তখনই সর্বোচ্চ ক্ষমতাটি দেখাতে হবে।
কথাটা শুনে দুঃখিত হলাম রাজকুমারী। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, সেনাপতি রেমরেমের মতো আপনিও এই ব্যবস্থা গ্রহণের গুরুত্বটি বুঝতে পারবেন। এই কথাটি বলার সময় বাজপাখির সীলমোহরটা হাতের দুই আঙুলের মাঝে নিয়ে ঘষতে লাগলাম।
ওহো, তুমি এই বাচ্চাদের খেলনাটা আমাকে দিতে চাচ্ছো? আমার উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই সে হাত বাড়িয়ে ছোঁ মেরে সীলমোহরটা আমার হাত থেকে নিয়ে নিল। হঠাৎ এই কাণ্ডে আমি এততাই হতচকিত হয়ে গিয়েছিলাম যে কোনো বাধা দেওয়ার আগেই জিনিসটা আমার হাতছাড়া হয়ে গেল।
এটার সম্পর্কে লোকে যা বলে তা কি সত্যি তায়তা?
লোকে কী বলে রাজকুমারী?
ওরা বলে এটা যার হাতে থাকে সে ফারাওয়ের কণ্ঠস্বরে কথা বলে।
হ্যাঁ, রাজকুমারী, কথাটা সত্যি।
তাহলে দেখো, এটা এখন কার হাতে আছে তায়তা।
ইতোমধ্যে তাঁবুর মাঝে থাকা অন্য তিনজনও বুঝতে পারলো যে এখানে একটা ইচ্ছাশক্তির লড়াই চলছে। ওরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর আমিও বুঝতে পারলাম আমাকে কীরকম হাস্যকর দেখাচ্ছে। অনুভব করলাম আমার ভ্রু কুঁচকাতে শুরু করছে, সাথে সাথে নিজেকে সামলে নিয়ে কপাল মসৃণ করে তেহুতির দিকে মাথা নত করে বললাম, আমি আপনার কাছ থেকে মহান ফারাওয়ের কণ্ঠস্বর শোনার জন্য অপেক্ষা করছি রাজকুমারী। রসিকতার সুরে কথাটা বলার চেষ্টা করলেও তা খুব একটা কাজে এলো না। এবার তেহুতির মুখের হাসি মুছে গিয়ে দুচোখ ভরে পানিতে টলটল করে উঠলো।
সে ফিস ফিস করে প্রায় বাষ্পরুদ্ধকণ্ঠে বললো, ওহো, তায়তা। আমার প্রতি এমন নিষ্ঠুর হয়ো না। তোমাকেই আমি আমার বাবা হিসেবে জানি। দয়া করে এভাবে আমাকে ফিরিয়ে দিও না। তুমি আমার ভাই আর আমার মাকে কথা দিয়েছিলে যে, সবসময় আমার দিকে খেয়াল রাখবে। তুমিই একমাত্র মানুষ যাকে আমি ভালোবাসি আর বিশ্বাস করি। তারপর সীলমোহরটা আমার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে ফুপাতে ফুপাতে, নাও এটা ধর! দরকার মনে হলে আমাকে দূরে পাঠিয়ে দাও। তুমি যা আদেশ করবে তাই আমি পালন করবো।
ঔৎসুক্য নিয়ে তাকিয়ে থাকা উপস্থিত শ্রোতাদের মুখের হাসি মুছে গেল। এবার ওদের চেহারায় হতাশার অনুভূতি আর আতঙ্ক দেখা গেল। সবাই একযোগে পাল্টা অভিযোগের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। হঠাৎ আমি একজন দুর্জন ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছি।
অবশ্য ওরা কেউ ধারণাই করতে পারেনি যে, আসলে সে কি নিখুঁত একজন অভিনেত্রী। আমাকে পুরোপুরি একজন কাপুরুষ বানিয়ে ছেড়েছে। মুহূর্তের মধ্যে আমি প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়েছি।
আমাকে ক্ষমা করো তেহুতি। বল তুমি কী চাও, আমি তাই দেবো তোমাকে।
সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বললো, বেকাথা আর আমি আমাদের আসল বাবা, শুধু তোমার সাথে থাকতে চাই। ব্যস এই। তবে সে জানে সে জিতেছে। যে লোককে নিয়ে আসল দ্বন্দ্ব চলছে, তার নাম উচ্চারণ না করেই সে তার কার্যোদ্ধার করতে পেরেছে।
.
চারদিন পর বিকেলে সেনাপতি রেমরেম দলের অর্ধেক মানুষ আর পশু নিয়ে দুইশো লিগ উত্তরে জয়নাব মরুদ্যানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। তেহুতিকে সাথে নিয়ে আমি পাঁচ লিগ পর্যন্ত রেমরেমকে এগিয়ে দিলাম। তারপর তাকে বিদায় জানিয়ে আমরা দুজন ময়াগুহার দিকে ফিরে চললাম। একটু পেছনে আমাদের দেহরক্ষী দল-নীল কুমির বাহিনীর বিশজন সদস্য আমাদের অনুসরণ করছে।
