সুতরাং ময়াগুহায় পুনরায় ফেরার পঞ্চম দিনে আমি সেনাপতি রেমরেম আর কর্নেল হুইকে আমার নতুন নির্দেশ জানাবার জন্য আমার তাঁবুতে ডেকে পাঠালাম। জারাসকেও সভায় উপস্থিত হতে বললাম। স্বভাবতই আমার উদ্দেশ্য ছিল যে, সে আর হুই কেবল শ্রোতা হিসেবে থাকবে, কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নিতে পারবে না।
আমরা চারজন সবেমাত্র আলোচনার টেবিলে বসে চমৎকার মদের গ্লাসে চুমুক দিতে যাবো, ঠিক তখনই আমি অনুভব করলাম কেউ আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। পেছন ফিরে দেখলাম রাজকুমারী তেহুতি তার বিশেষ সুগন্ধী গায়ে মেখে যেন ভাসতে ভাসতে তাবুর দরজা দিয়ে ঢুকেছে।
আমার কারণে আপনাদের আলোচনা থামাবেন না। আমাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে আপনাদের আলোচনা চালিয়ে যান। আমি একটি কথাও বলবো না। চুপ করে বসে থাকবো, আপনারা টেরও পাবেন না যে আমি এখানে রয়েছি।
সে একটি চমৎকার সোনালি রঙের মিহি রেশমী পোশাক পরে রয়েছে। এটা আমি অনেক দাম দিয়ে থিবসের বাজার থেকে তার জন্য কিনেছিলাম। তখন সে নিজেই আমাকে বলেছিল ক্রিটে পৌঁছার পর যখন তাকে সর্বাধিরাজ মিনোজের সামনে প্রথম হাজির করা হবে, তখন সে এই পোশাকটি পরবে। হয়তো আমাদের মধ্যেকার সেই চুক্তিটি সে ভুলে গেছে।
তার পায়ে রূপার স্যান্ডেল। গলায় ঝুলছে একটি হাথোরের হার আর অন্য আরেকটি উজ্জ্বল চকচকে, সম্ভবত নীলকান্ত মণি আর পান্নার হার। সুন্দর পরিপাটি চুল আর মুখে চমৎকার হাসি।
এরকম সুন্দর তাকে আমি আর কখনও দেখিনি।
সোনালি পোশাকের ঘের উড়িয়ে সে আমার পায়ের কাছে বসলো। দুই কনুই হাঁটুতে রেখে চিবুক দুই হাতের মাঝে রাখলো, যাতে আমি যে হীরার আংটিটা দিয়েছিলাম তার উপর আলো ঠিকরে পড়ে জ্বলজ্বল করে উঠলো। তারপর এক পাশে জারাসের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে নিরীহ চেহারা নিয়ে মৃদু হাসলো।
বুঝি না মেয়েরা কীভাবে সবকিছু আগেভাগে জেনে ফেলে? এই সভা সম্পর্কে আমি তাকে জানাইনি; সত্যি বলতে কী সভার মাত্র এক ঘন্টা আগে অন্যদের ডেকেছিলাম। আর কী আলোচনা হবে তাও বিন্দু বিসর্গ কাউকেই জানাইনি। সে নিশ্চয়ই জানতো না এখানে কী হতে যাচ্ছে। তারপরও সে এখানে যুদ্ধের সাজে সেজে এসেছে আর তার চোখের দৃঢ় দৃষ্টি দেখে আমার তাই মনে হল।
তোমাদের যা আলোচনা চালিয়ে যাও তায়তা। আমি কথা দিচ্ছি মাঝখানে কিছু বলবো না।
আমি ইতস্তত করে বললাম, ধন্যবাদ, মহামান্য রাজকুমারী। ভাবলাম তার সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়াবার কি কোনো উপায় আছে? অবশ্যই আছে। আমি ফারাওয়ের সিলমোহর বহন করছি। আমি একজন রাজার কন্ঠ হয়ে কথা বলছি। কেউ আমার বিরুদ্ধাচরণ করার সাহস করবে না? কাজেই সাহস সঞ্চয় করলাম।
ভদ্রমহোদয়গণ, আমি আমাদের পথপ্রদর্শক আল-নামজু আর রাজকীয় আস্তাবলের প্রধান রক্ষকের সাথে কথা বলেছি। ওরা সবাই আমার সাথে একমত হয়েছে যে আমাদের এই বিশাল দলটি আর বেশিদিন ময়াগুহায় থাকতে পারবে না। মনে রাখবেন আমাদের সমস্ত লোকজন আর রাজকুমারীরা ছাড়াও তিনশোর বেশি ঘোড়া আর উট রয়েছে। প্রতিদিন যে হারে আমরা এই পানি ব্যবহার করছি তাতে আর কিছু দিন পরই এই কুপের পানি সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যাবে। বুঝতেই পারছেন এর কী ভয়াবহ পরিণতি হবে।
দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে রেমরেম বললো, অবশ্যই! এ-বিষয়ে কোনো প্রশ্ন নেই, আমাদের এগোতেই হবে। তার দাড়ি রূপালি ধূসর রঙের হলেও আমি জানি তার আসল বয়স লুকোতে সে মেহেদি কলপ ব্যবহার করে উজ্জ্বল আদা রঙ করে রেখেছে। সে একজন মহান ব্যক্তি। একজন কুশলী আর সাহসী যোদ্ধা। একজন ভাইয়ের মতো তাকে আমি ভালোবাসি।
আমি তার দিকে তাকিয়ে সায় দিয়ে মাথা নেড়ে বলে চললাম, তবে ব্যাপারটা এতো সহজ নয় সেনাপতি রেমরেম। আল-নামজু আমাকে জানিয়েছে এর পরবর্তী মরুদ্যানের নাম হল জয়নাব অর্থাৎ দামী রত্ন। এটা আমাদের দুইশো লিগ সামনে রয়েছে। এই দূরত্ব যেতে দশদিন লাগবে। তার মানে যখন আমরা সেখানে পৌঁছাবো তখন আমাদের পশুগুলো পথশ্রমে ক্লান্ত আর তৃষ্ণায় কাতর হয়ে বিধ্বস্ত হয়ে পড়বে। ফলে তাদেরকে আবার যাত্রার উপযোগী করতে অন্তত দুই সপ্তাহ জয়নাব মরুদ্যানে বিশ্রাম দিতে হবে। কিন্তু জয়নাব একটি ছোট মরুদ্যান। ওতে যে পরিমাণ পানি আছে তা দিয়ে আমাদের মতো একটি বিশাল কাফেলার কয়েকদিনের বেশি চলবে না। কথাটা বলে এই কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থার একটি যৌক্তিক সমাধান বাতলাবার জন্য আমি রেমরেমের প্রতি তাকালাম। এতে হয়তো কিছুটা দোষ আমি অন্যের ঘাড়ে চপাতে পারবো, যখন রাজকুমারী তেহুতি আমার পরিকল্পনার সবদিক আঁচ করতে পেরে তুমুল হট্টগোল শুরু করবে। তবে সবাই নিশ্চুপ থাকায় বাধ্য হয়ে আমাকে সমস্ত দায়দায়িত্ব নিজ ঘাড়ে নিয়ে বিষয়টা খোলসা করতে হল।
এর একমাত্র সমাধান হল আমাদের দলকে দুই ভাগ করে অর্ধেক মানুষ আর পশুর দলটিকে আগেই জয়নাব পাঠিয়ে দেওয়া। অন্যদলটি এখানে আরও দুই সপ্তাহ থেকে আগের দলকে তৈরি হওয়ার সুযোগ দেবে। সফরের অবশিষ্ট অংশে আমাদেরকে এই বিভক্তি চালিয়ে যেতে হবে। দুই নদীর দেশে পৌঁছাবার পর আমরা আবার একত্রিত হব। এই উপায়ে আমরা কখনও পরিশ্রান্ত হয়ে পড়বো না আর পুরো দলকে একটি মাত্র মরুদ্যানে গিয়ে পানি নিয়েও কোনো সমস্যায় পড়তে হবে না।
