পর পর তিনরাত ভোজ চললো। তিনটি বাচ্চা উট জবাই করে সুস্বাদু মাংসগুলো পঞ্চাশটা অগ্নিকুণ্ড জ্বেলে তাতে ঝলসানো হল। প্রতি সন্ধ্যায় রাজকুমারী তেহুতি পনেরোটি বিয়ারের বড় পিপা খুলে সবার মধ্যে বিতরণ করতে নির্দেশ দিলেন। আমার কাছে এটা একটু বেশি বাড়াবাড়ি মনে হলেও, কিছু বললাম না। বরং আমি নিজেও দুএক মগ খেলাম। তবে ফারাওয়ের প্রাসাদের মাটির নিচের ভাণ্ডার থেকে আনা মদের ব্যাপারে আমি যত্নবান ছিলাম। কেননা আমি জানি এই অমৃত সুধা সাধারণ সৈন্যদেরকে দেওয়া মানে শুধু শুধু অপচয় করা।
রাজদরবারের যন্ত্রীরা আমাদের জন্য যন্ত্রসংগীত পরিবেশন করলো আর সবাই আগুনের চারপাশে নেচে গেয়ে কাটাল। রাজকুমারীরা আমাকে গান গাইতে অনুরোধ করতেই আমি জারাসকে ডেকে নিলাম। এর আগে যখনই সুযোগ পেতাম তখনই আমি তাকে গানের তালিম দিতাম। গান গাওয়ার তার যে স্বাভাবিক প্রতিভা ছিল, আমি তা ঘসে মেজে আরও পরিশীলিত করে তুলেছিলাম। যখন আমরা যুগলবন্দী গান গাইতে শুরু করলাম তখন শ্রোতারা বাকরুদ্ধ হয়ে শুনতে লাগলো। ওরা নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গিয়েছিল পাছে গানের একটা কলিও বাদ না যায়।
.
বেশ খুশিমনে আমি ঘুমাতে গেলাম। প্রায় সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়লাম। সাধারণত আমার গভীর ঘুম হয় না। যেহেতু আমার মন সবসময় কর্মতৎপর আর সতর্ক থাকে তাই গভীর ঘুম হওয়ার মতো বিলাসিতা আমার পোষায় না।
একটু পরই ঘুম ভেঙে যেতেই বুঝতে পারলাম কেউ চুপিচুপি আমার তাঁবুতে ঢুকেছে। ঘুটঘুঁটে অন্ধকারের মধ্যে সে আমার বিছানার উপর ঝুঁকে রয়েছে। আমি তার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। দরজার পাহারা এড়িয়ে যে লোক রাজকীয় তাবুর মধ্যে ঢুকতে পেরেছে সে নিশ্চয়ই সাংঘাতিক লোক এবং তার উদ্দেশ্য ভালো হওয়ার কথা নয়।
কোনো ধরনের শব্দ কিংবা নড়াচড়া না করে আমার বিছানার মাথার কাছে সবসময় বিশেষ খাপে যে ড্যাগারটা ঝুলছে তার দিকে হাত বাড়ালাম।
তাঁবুর কাপড়ের মধ্য দিয়ে তারার আলো ভেতরে ঢুকেছে আর রাতের বেলা আমার দৃষ্টিশক্তি অত্যন্ত প্রখর হওয়ায় আমি আততায়ীর মাথার অবয়ব আন্দাজ করতে পারলাম। ডানহাতে ড্যাগারটা খাপ থেকে টেনে বের করার সাথে সাথে বাম হাত দিয়ে আততায়ীর গলা শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরলাম।
আমি তাকে সাবধান করে বললাম, নড়াচড়ার চেষ্টা করলেই আমি তোমাকে মেরে ফেলবো। আগুন্তুক একটি ছোট মেয়ের মতো গুঙিয়ে উঠলো। সেই সাথে তার নিঃশ্বাসের মিষ্টি গন্ধ আর বুকের স্ফিতি অনুভব করলাম।
আমাকে মেরো না তায়তা। আমি বেকাথা! আমি এমনিতেই মরে যাচ্ছিলাম। তোমার কাছে এসেছি যাতে তুমি আমাকে বাঁচাও। রক্তপাত হয়ে আমি মরে যাচ্ছি। দয়া করে আমাকে মরতে দিও না।
সাথে সাথে তাকে ছেড়ে লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নামলাম। একমিনিটের মধ্যে তেলের প্রদীপটা জ্বালালাম। বেকাথা ইতোমধ্যে আমার বিছানায় কুঁকড়ে শুয়ে তলপেট চেপে ধরে কাতরাতে শুরু করেছে। খুব ব্যথা করছে তায়তা। দয়াকরে ব্যথাটা ভালো করে দাও।
আমি তাকে দুইহাতের মধ্যে যত্ন করে ধরে জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় রক্ত ঝরছে বল?
আমার দুপায়ের মাঝখানে রক্ত ঝরছে। এটা বন্ধ করে দাও। আমি মরতে চাই না।
এবার আমি মনেমনে গুঙিয়ে উঠলাম। তাহলে এবার আমাকে একজনের জায়গায় দুজন রজঃস্বলা চঞ্চলা স্বাস্থ্যবতী বালিকাকে সামলাতে হবে।
তার মানে খুব শিগগিরই খাবার টেবিলের ওপার থেকে ছুঁড়ে মারা রুটির টুকরা আর খেজুরের বদলে কর্নেল হুইকে অন্য কিছু নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে হবে।
.
জারাসের জখম পুরোপুরি নিরাময় হওয়া পর্যন্ত আমি ময়াগুহায় অপেক্ষা করলাম। সে সুস্থ হলে দুই নদীর দেশ আর ব্যবিলনের পথে শেষ যাত্রাটি শুরু হবে। আমাদের সফরের এই অংশটুকু হবে সবচেয়ে দীর্ঘ আর কষ্টকর, তাই আমি তার শরীরের অবস্থা নিয়ে কোনোরকম ঝুঁকি নিতে চাইনি।
আমি অনেক সময় অবাক হতাম দেখে যে, একটি তরুণ শরীর কতটুকু কষ্ট সহ্য করতে পারে আর কত তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠতে পারে। মাত্র কয়েকদিন আগে শেয়াল তার নিতম্ব বরাবর তরবারি চালিয়ে দিয়েছিল, তারপর আমি তার পেট ফেঁড়ে নাড়িভূঁড়ি বের করে আবার সেলাই করে দিয়েছিলাম, অথচ তা সত্ত্বেও জারাস এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন সে থিবসে ফসল কাটার উৎসবে ফারাও যে বাৎসরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন তাতে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
প্রথম প্রথম সে তেহুতিকে সাথে নিয়ে পাহাড়ের চারপাশ ঘিরে হাঁটতো। পঞ্চাশ পদক্ষেপ যাওয়ার পরই পেট চেপে ধরে থামতে বাধ্য হত। তেহুতি সাহায্য করার জন্য হাত বাড়ালেও সরিয়ে দিত। আমি বার বার সাবধান করা সত্ত্বেও সে প্রতিদিন হাঁটার মাত্রা বাড়িয়ে দিত। কিছুদিন পর পুরো বর্ম পরে কাঁধে বেলেপাথরের একটি বড় টুকরা নিয়ে হাঁটতে শুরু করলো।
প্রতিদিন আমি তাকে পুরোপুরি নগ্ন করে তার ক্ষতের অবস্থা পরীক্ষা করতাম। মনে হল ক্ষতটা শুকিয়ে একটা হালকা দাগের মতো হয়ে যাচ্ছে। শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করার অসম্ভব ক্ষমতা ছিল তার। জোর করে সে তার আহত পেশিগুলো সঞ্চালন করতো, এতে আরও দ্রুত সে আরোগ্যলাভ করে উঠতে লাগলো।
জারাসের প্রতি আমার এক ধরনের সহজাত স্নেহ জেগে উঠছিল আর সে আমার রোগ নিরাময় ক্ষমতার একটি প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার শারীরিক দুর্বলতার কারণে আমি ভাবলাম ওরা আমার পরিকল্পনা বানচাল করার আগেই আমি এই সুযোগে তাকে রাজকুমারী তেহুতির কাছ থেকে আলাদা করে নিতে পারবো। অর্থাৎ মিসরের অস্তিত্বের স্বার্থে ক্রিটের সর্বাধিরাজ মিনোজ আর ফারাও ত্যামোসের মাঝে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য সযত্নে যে পরিকল্পনা করেছিলাম মাঝ পথে এসে তা যেন আবার ভেস্তে না যায়।
