তারপর আমার অত্যন্ত পরিচিত কণ্ঠস্বরটি সাথে সাথে উত্তর দিল, দাঁড়াতে চেষ্টা করো না বোকা জারাস। চুপ করে শুয়ে থাকো। তোমার খুব বড়ধরনের জখম হয়েছে।
জারাসের কণ্ঠস্বর সচকিত আর হতবাক শোনাল, রাজকুমারী তেহুতি! আপনি আমার বিছানায়। আর আপনার গায়ে কোনো পোশাক নেই। তায়তা এঅবস্থায় আমাদেরকে দেখতে পেলে দুজনকেই মেরে ফেলবে।
খুশিতে নাচতে নাচতে আমি আবার কম্বলের ছাউনির নিচে ঢুকে তার বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে তাকে আস্বস্ত করে বললাম, এবার নয় জারাস। তবে এরপর হলে কিন্তু ছেড়ে দেবো না।
.
দিনের আলোয় জারাসকে আবার ভালোমত পরীক্ষা করলাম। তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় তার শরীর আমার হাতের মতো ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। পেটের বিরাট ক্ষতের উপরে যে সেলাইটা আমি দিয়েছিলাম সেখান থেকে ফুলে ওঠা কমে এসেছে। গন্ধ শুঁকে দেখলাম, পরিষ্কার মনে হল।
জারাসের খুব পানি পিপাসা পেয়েছিল, তেহুতি ওর জন্য বড় একজগ পানি নিয়ে এলো। সে পুরোটা খেয়ে শেষ করে আরও পানি চাইলো। আমি স্বস্তিবোধ করলাম। এটা একটা নিশ্চিত লক্ষণ যে তার অবস্থা উন্নতি লাভের পথে রয়েছে। তবে সেই সাথে মনে পড়ে গেল পানির বোতলগুলো প্রায় খালি আর সবচেয়ে কাছে পানি রয়েছে কেবল গুহায়, যেখানে বেকাথা আর অন্যান্যদের ফেলে এসেছি।
জারাস প্রতিবাদ করা সত্ত্বেও আমরা তাকে হাঁটতে বা উটে চড়তে দিলাম না। ওর জন্য একটা ঠেলাগাড়ির মতো বিছানা তৈরি করলাম। দুটো লম্বা বর্শার মাঝে ঘোড়ার কম্বল দিয়ে এটা তৈরি করলাম। একটা উটের হাওদার দুইপাশে পেছন দিকে বর্শাদুটার ডগা আটকিয়ে ঝুলিয়ে দিলাম। জারাসকে এই ঠেলার বিছানায় শোয়ালাম।
তেহুতি সেই উটে চড়ে বসলো। সে পেছনদিকে মুখ করে বসলো, যাতে জারাসের প্রতি নজর রাখতে পারে। উঁচুনিচু কিংবা পাথুরে জায়গা এলেই সে উটের পিঠ থেকে লাফিয়ে নেমে জারাসের পাশে এসে তাকে ধরে রাখলো যাতে তার বেশি ঝাঁকুনি না লাগে।
সারাপথ সে জারাসকে ধমকে চললো তাকে সাবধান হওয়ার জন্য।
তৃতীয়দিন বিকেলে জারাস জোর করে বিছানা থেকে নেমে কিছুক্ষণ হাঁটার চেষ্টা করলো। দু-দুবার হোঁচট খাওয়ার পর একজন বুড়ো মানুষের মতো হাঁটতে লাগলো। ঠেলার গায়ে একহাত আর অন্য হাত তেহুতির কাঁধে রেখে সে চলার চেষ্টা করলো। তেহুতি নানারকম উৎসাহব্যঞ্জক কথা বলে তাকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করলো। হাসি উঠলেই সে থেমে দুইহাতে পেট চেপে ধরলো, তবে সেজন্য হাসি থামাল না।
আবার বিশ্রামের জন্য থামতেই আমি আবার উদ্বিগ্ন হয়ে তার ক্ষত পরীক্ষা করে দেখলাম, না ঠিক আছে। শেষ একঢোক আফিমের যে আরকটা ছিল সেটা তাক খাইয়ে দিতেই সে একটা শিশুর মতো ঘুমাল।
পরদিন আরও শক্তিসঞ্চয় করে বেশ দ্রুত অনেকদুর হাঁটলো। আমি জানতাম তেতির সঙ্গ তাকে যথেষ্ট শক্তি যোগাচ্ছে, তাই আমি সামনে এগিয়ে দলের মাথায় গিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। ওদের কথা শুনতে না পেলেও বুঝতে পারছিলাম কি নিয়ে ওরা কথা বলছে।
ওরা জানতো না যে আমি খুব ভালোভাবে ঠোঁট নাড়া দেখে কথা বুঝতে পারি। কাজেই ওরা মনখুলে কথা বলছিল। মাঝে মাঝে তাদের রসিকতা এমন পর্যায়ে পৌচ্ছাছিল যা তার মতো একজন উচ্চবংশীয় মেয়ের জন্য মানানসই। ছিল না। তবে এ-মুহূর্তটা ওদেরকে উপভোগ করতে দিলাম, কেননা আর হয়তো এরকম সুযোগ নাও আসতে পারে।
জারাসের অবস্থার কারণে আমাদের ময়াগুহায় ফিরতে দেরি হচ্ছিল। পঞ্চম দিনেও আমরা সেখানে পৌঁছতে পারিনি। পানি আনার জন্য পাঁচটি উট আমি আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু সেগুলো এখনও ফিরে আসেনি অথচ এদিকে আমাদের পানিও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আমি সবার পানি আর খাবার কমিয়ে দিয়ে প্রতিদিন ছোট মগে তিন মগ পানি আর অর্ধেক রুটি বরাদ্দ করলাম। অবশ্য রাজকুমারীর জন্য নয়। সে যত ইচ্ছা খেতে পারবে। শুধুমাত্র তার জন্য আমি আধা টুকরা পনির আর সামান্য শুকনো লোনা গরুর মাংস বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু সে এই সুবিধা প্রত্যাখ্যান করে সবার মতো সমানভাবে খেতে লাগলো।
চতুর্থদিন সন্ধ্যায় আমি লক্ষ্য করলাম তেহুতি সবার নজর এড়িয়ে একটুকরা শক্ত পনির আর কিছু গরুর শুকনো মাংস তার আলখাল্লার হাতা থেকে বের করে জারাসকে খেতে সাধলো।
তুমি অসুস্থ জারাস। তোমার শক্তি সঞ্চয়ের জন্য এগুলো দরকার।
সে প্রতিবাদ করে বললো, আমি একজন সাধারণ সৈনিক, রাজকুমারী। আপনি আমার প্রতি অশেষ দয়া দেখিয়েছেন। আমি সত্যি কৃতজ্ঞ আপনার দয়ার জন্য, তবে আমার মোটেই ক্ষিদে পায়নি।
সে খুব মৃদুকণ্ঠে বললো, বীর জারাস, তুমি আমার প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে ফেলতে যাচ্ছিলে। তুমি যা চাও আমি খুশি মনে তা দিতে চাই।
আমার মন নরম হয়ে এল। ওদের অঙ্কুরিত ভালোবাসা দেখতে খুব চমৎকার মনে হচ্ছিল। জানি কিছুকাল পরই কঠিন দায়িত্বের কারণে তা ভেঙে চুরমার করে ফেলা হবে।
.
শেষ পর্যন্ত আমরা ময়াগুহায় এসে পৌঁছলাম। আমাদের দলের যারা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল সবাই ছুটে এলো আমাদের স্বাগত জানাতে। উল্লাসে চিৎকার করতে করতে চারপাশ থেকে আমাদেরকে ঘিরে ধরলো, তারপর রাজকুমারী তেহুতির পায়ের কাছে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে তাকে শ্রদ্ধা জানাল। তারপর ওরা তাকে কাঁধে উঠিয়ে তার বোন বেকাথা, সেনাপতি রেমরেম আর কর্নেল হুই যেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিল সেখানে নিয়ে চললো।
