বয়সের ভারে ন্যুজ হয়ে যখন সে মৃত্যুর কাছাকাছি হয়েছিল তখন সে। আমার হাতে একটা চামড়ার থলে গুঁজে দিয়েছিল। এতে রোদে শুকানো একধরনের কালো ব্যাঙের ছাতা ছিল যা, আমি এর আগে কখনও দেখিনি। এটি গাঢ় মোটা সবুজ ছত্রাক জাতীয় বস্তু দিয়ে মোড়ান ছিল। সে আমাকে সতর্ক করে বলেছিল উপরের আবরণটি যেন না সরানো হয়, কেননা এটি এই ওষুধের রোগ নিরাময় ক্ষমতার একটি অতি প্রয়োজনীয় উপাদান। তারপর সে আমাকে শেখালো এই ছত্রাক দিয়ে কীভাবে এক ফোঁটা তরল তৈরি করা যায়। আরও সাবধান করে জানাল যতটা না রোগ নিরাময় করা যায় তার চেয়ে বেশি এই তরলটি বরং মানুষের প্রাণহানি করতে পারে। এটি তখনই ব্যবহার করা যাবে যখন রোগী আর শূন্যতার মাঝে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
মিসরে ফেরার পর এত বছরে আমি কেবল সাতবার এই ঔষধটি ব্যবহার করেছিলাম। প্রতিটি ক্ষেত্রে আমার রোগী মরণোন্মুখ ছিল। আরেকটু হলেই শেষ হয়ে যেত। ঠোঁটের ফাঁক গলে এক ফোঁটা তরল যাওয়ার প্রায় সাথে সাথে পাঁচজন মারা যায়। ষষ্ঠজন দশ দিন মরণাপন্ন অবস্থায় থাকার পর ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি হতে থাকে, তারপর হঠাৎ একসময় সে মারা যায়।
ফুসফুঁসে তীর বেঁধা সপ্তম রোগীটি কেবল বেঁচে উঠে। সে আবার সুস্থ এবং শক্তিশালী হয়ে উঠে। এখন থিবসে রয়েছে। প্রতিবছর তার আরোগ্য হওয়ার এই অলৌকিক দিনটিতে সে তার সমস্ত নাতিনাতনিসহ আমার সাথে দেখা করতে আসে।
আমি জানি সাতজনের মধ্যে একজন রোগী ভালো হওয়ার পরিসংখ্যান গর্ব করার মতো বিষয় নয়। তবে আমি দেখতে পাচ্ছি জারাসের জীবনের আয়ু আর মাত্র এক ঘন্টা রয়েছে আর তেহুতি আমার দিকে ভর্ৎসনার দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে।
হরিণের চামড়ার থলেটিতে আর একমুঠো মাত্র ছত্রাক রয়েছে। একটা তামার পাত্রে পানি নিয়ে তাতে ছত্রাকটি ফুটাতে শুরু করলাম। নির্যাসটা একেবারে কালো আর থকথকে হওয়া পর্যন্ত ফুটালাম। তারপর ঠাণ্ডা হতে দিলাম। এর আগে জারাসের চোয়ালের ফাঁকে একটা কাঠের গেজ দিয়ে মুখটা খোলা রেখে তারপর চামচ দিয়ে নির্যাসটা তার মুখের ভেতরে ঢেলে দিলাম। এর আগে একবার এই মহৌষধের এক ফোঁটা আমি স্বাদ নিয়েছিলাম। এটি ছিল একটি পরীক্ষা তবে আর দ্বিতীয়বার এটা করার ইচ্ছা আমার নেই।
আরকটা মুখে দেওয়ার পর জারাসের প্রতিক্রিয়া আমার মতোই হল। সে এমন ছটফট করতে শুরু করলো যে, ছয়জন শক্তিশালী মানুষ আর তেহুতি মিলেও তাকে ধরে রাখতে পারছিল না। জোর করে যতটুকু গেলান হয়েছিল তার অর্ধেকের বেশি আরক সে বমি করে মুখ থেকে ফেলে দিল। ফেলে দেওয়া অংশটুকু কাচিয়ে নিয়ে আমি দ্বিতীয়বার তার মুখে ঢেলে দিলাম। তারপর চোয়ালের মধ্য থেকে কাঠের গোঁজটা বের করে তার মুখ বন্ধ করে ধরে রাখলাম যাতে দ্রবণটা গলা দিয়ে নিচে চলে যায়। তবে সে বেশ কয়েকবার ছটফট করে বমি করার চেষ্টা করলো।
তারপর তেহুতি আর আমি দুজনে তাকে কম্বল দিয়ে মুড়িয়ে দিয়ে অন্যদেরকে সরে যেতে বললাম। আমরা দুজনে তার দুই পাশে বসে তার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।
ভোরের দিকে তার অবস্থা প্রায় মৃতপ্রায় হল। কম্বল মুড়ি দেওয়া সত্ত্বেও তার তাপমাত্রা নেমে এল আর জালে আটকানো একটা কই মাছের মতো সে ছটফট করতে লাগলো। নিঃশ্বাসের শব্দ প্রায় শোনাই যাচ্ছে না। আমরা দুজনেই একজন একজন করে তার মুখের কাছে কান রেখে তার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে চেষ্টা করছিলাম।
মাঝরাতের একটু পর যখন চাঁদ ডুবে গেল, তখন তেহুতি আমাকে বললো, তার শরীর একটা মরা মানুষের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, তার শরীর গরম রাখতে হলে আমাকে তার সাথে শুতে হবে। সে তার পোশাকটা খুলে জারাসের পাশে কম্বলের ভেতরে ঢুকে পড়লো।
গত তিনদিন আমরা ঘুমাইনি, তবে এখনও ঘুমালাম না আর কোনো কথাও। বললাম না। বলার মতো আর কিছু নেই। সমস্ত আশা ছেড়ে দিয়েছি।
সমাধিক্ষেত্রের সময় এলো: রাতের সবচেয়ে অন্ধকার সময়। আমাদের মাথার উপর দুটো কম্বল জোড়া দিয়ে যে আচ্ছাদন তৈরি করা হয়েছিল তার মাঝে একটা ছিদ্র ছিল। উপরের দিকে তাকিয়ে আমি বিশাল লাল তারা দেখতে পেলাম–আমি জানি এটা শেঠের চোখ।
অশুভের দেবতা আমাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আমার মনে ভয় এলো। আমি জানি জারাস লড়াইয়ে হেরে গেছে আর শেঠ তাকে নিতে আসছে।
তারপর একটি আজব এবং চমৎকার ঘটনা ঘটলো। হঠাৎ তারার আলোটা নিভে গেল। আমার বুক ধক করে উঠলো। ঠিক বুঝতে পারলাম না এটা কি, তবে বুঝলাম যে এটা শুভ কিছু। নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ালাম। তেহুতিকে না জাগিয়ে কম্বলের আচ্ছাদনের নিচ থেকে বাইরে এসে উপরে রাতের আকাশের দিকে তাকালাম।
সমস্ত আকাশে অসংখ্য তারা জ্বল জ্বল করছে-কেবল ঠিক আমার মাথার উপরে যেখানে আমি দেবতা শেঠের লাল চোখটি দেখেছিলাম সেই স্থানটি ছাড়া। এখন সেই চোখটি অস্পষ্ট হয়ে এসেছে।
ছোট্ট কালো একটি মেঘ একে ঢেকে ফেলেছে। পুরো আকাশে এটিই একমাত্র মেঘ। আমার হাতের মুঠোর চেয়ে বড় হবে না, তবে এটিই এই ক্ষতিকর শেঠের চোখ অন্ধ করে দিয়েছে।
তারপর একটা গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম। উপরের তারাভরা আকাশ থেকে নয়, শব্দটা আসছে নিচে কম্বলের আচ্ছাদনের ভেতর থেকে।
জারাস ফিস ফিস করছে, আমি কোথায়? আমার পেটে কেন এতো ব্যথা করছে?
