আমার জন্য তেমন সমস্যা হল না। তবে তেহুতি প্রথমে একটা পশমের পট্টি চোলাই করা মদে ভিজিয়ে সেটা দিয়ে তার গোপনাঙ্গ ধুয়ে নিল। তারপর আমি অন্যপাশে সরে দাঁড়ালে সে জারাসের উপর বসে তার ভোলা পেটের ভেতরে প্রস্রাব করলো। তারপর তৃতীয়বারের মতো আবার জারাসের অচেতন দেহটি এক পাশে কাত করে শেষবারের মতো তার পেট থেকে তরলটি বের করে দিলাম।
এবার পেট সেলাই করে বন্ধ করলাম, প্রতিটা সেলাই করার সময় তার জখম শুকাবার জন্য প্রার্থনা করলাম।
হে অশুভ বিষয়ের দেবতা শেঠ, আমি তোমার নিষ্ঠুর রক্ত লাল মুখ বন্ধ করে দিলাম! এ স্থান থেকে চলে যাও। আমি আদেশ দিচ্ছি যাও!
কবরের দেবতা শেয়ালমাথাওয়ালা আনুবিস, আমার কাছ থেকে সরে যাও। একে বাঁচতে দাও।
হে দয়ালু হৃদয় হাথোর, এর জন্য কাঁদো। এর প্রতি দয়া দেখাও আর তার যন্ত্রণার উপশম কর। একে বাঁচতে দাও!
সবশেষে আমার লিনেনের আলখাল্লা ছিঁড়ে সেই টুকরা দিয়ে তার পেট বাঁধার পর তাকে বহন করার জন্য একটা পালকির মতো বানিয়ে তার উপর তাকে শোয়াতে শোয়াতে অন্ধকার হয়ে এলো। তেহুতি আর আমি তার দুই পাশে বসে থাকলাম, তাকে আরাম দিতে কিংবা যদি কোনো প্রয়োজন হয়।
জ্বরের প্রকোপে জারাস যখন প্রলাপ বকতে লাগলো আর তার শয্যার চতুর্দিকে কল্পিত আর আসল দানবের সাথে লড়াই করতে শুরু করলো, তখন তেহুতি তার পাশে শুয়ে তাকে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে থাকলো। সে তাকে শক্ত করে ধরে ঘুম পাড়ানি গান শুনাতে লাগলো।
আমি গানটি চিনতে পারলাম। এটি সেই ঘুম পাড়ানি গান যা গেয়ে রানি লসট্রিস ছোটবেলায় তেহুতিকে ঘুম পাড়াতেন। ধীরে ধীরে জারাস শান্ত হল।
আমাদের আশ্রয় শিবির ঘিরে জারাসের লোকেরা আগুন জ্বেলে তার চতুর্দিকে গোল হয়ে বসলো। আমার মনে হল ওরাও আমাদের মত তার জন্য প্রার্থনা করছে। সারাত রাত আমি ওদের গুণগুণ করা শুনলাম।
ভোরের দিকে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
.
ছোট্ট গরম একটি হাত আমার কাঁধ ধরে টানাটানি করতেই ঘুম ভেঙে গেল। আমাদের অস্থায়ী আশ্রয়ের ছাদের ফাঁক দিয়ে দেখলাম ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই। মাত্র কিছুক্ষণ ঘুমিয়েছি, তারপরও অপরাধবোধে মন ছেয়ে গেল; মনে হল যেন আমি একটা খুন করেছি।
বহুকষ্টে কান্না থামিয়ে তেহুতি আমাকে বললো, তায়তা ওঠো। আমাকে সাহায্য কর।
কী হয়েছে রাজকুমারী?
ওর সারা শরীর আগুনের মতো গরম। মনে হচ্ছে ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে। এমন গরম যে গায়ে হাত দেওয়া যাচ্ছে না।
চুঙির মতো একদিকে সরু হয়ে যাওয়া একটা সেডার কাঠের টুকরা আমার কাছে ছিল। এর ডগাটা নিভু নিভু আগুনের কাঠকয়লার উপর ঠেসে ধরে ফুঁ দিলাম। আগুন ধরতেই বিছানার মাথার কাছে একটা তেলের প্রদীপ জ্বেলে জারাসের উপর কুঁকলাম।
সারা মুখ ঘামে চকচক হয়ে আছে। চোখ খোলা তবে জ্বরের ঘোরে আচ্ছন্ন। হয়ে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। আমরা তাকে ধরে স্থির করার চেষ্টা করতেই সে এক ঝটকা মেরে আমাদেরকে সরিয়ে দিল। মাথা এপাশ ওপাশ করতে করতে চিৎকার করে আমাদেরকে অভিশাপ দিতে লাগলো।
আমি এটা আশা করেছিলাম। আমি ভালোভাবেই জানতাম খারাপ রসে আক্রান্ত হওয়ার কারণে জ্বর খুব বেড়ে যেতে পারে। এরকম আরও কয়েকটি ঘটনা আমি আগে দেখেছিলাম। সব ক্ষেত্রেই রোগী শেষ পর্যন্ত মারা গিয়েছিল। তবে এর জন্য প্রাথমিক প্রস্তুতি আমি আগে থেকেই নিয়ে রেখেছিলাম।
আবার ছয়জন বলিষ্ঠ রক্ষীকে ডেকে সবাই মিলে জারাসকে ঘোড়ার কম্বলগুলো দিয়ে পেচিয়ে জোরে চেপে ধরলাম যেন সে মাথা ছাড়া আর কিছু নড়াচড়া করতে না পারে। তারপর বালতি দিয়ে পানি ঢেলে কম্বলগুলো ভেজালাম আর হাওয়া দিতে থাকলাম যাতে পানি শুকিয়ে যায়। এতে জারাসের গায়ের তাপ কমতে কমতে এক পর্যায়ে সে ঠাণ্ডায় কাঁপতে শুরু করলো।
এভাবে সারা সকাল করে চললাম, তবে দুপুরের দিকে তার শক্তি কমে এল। এর আগে আমার এ-ধরনের রোগীদের যা হয়েছিল সেসব লক্ষণ তার মাঝে ফুটে উঠলো। আমি যে চিকিৎসা পদ্ধতি তার উপর জোর করে চাপিয়ে দিচ্ছিলাম তা সহ্য করার ক্ষমতা সে হারিয়ে ফেলেছে।
মুখ দিয়ে কোনো শব্দ না বললেও সে দাঁতে দাঁত লেগে কিড়মিড় করছিল। গায়ের চামড়া বিবর্ণ নীল হয়ে যাচ্ছিল।
গা থেকে কম্বল সরিয়ে দেবার পর তেহুতি আবার তাকে জড়িয়ে ধরলো। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললো, তুমি বলেছিলে তাকে বাঁচিয়ে তুলবে তায়তা। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তা হয়তো পারবে না।
তার হতাশার গভীরতা আমাকে ছুরির মতো বিদ্ধ করলো।
হাইকসোদের মিসর আক্রমণের মুখে দেশ ছেড়ে পালাবার সময় আমরা আফ্রিকার দূরতম প্রদেশের মধ্য দিয়ে পাড়ি দিয়েছিলাম। অনেক বছর ধরে আমরা গহীন জঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়েছি। তারপর আবার শক্তি সঞ্চয় করে নিজভূমিতে অধিকার রক্ষায় ফিরে এসেছিলাম। সে সময়ে আমি কালো উপজাতিদের সাথে মিশে ওদেরকে জানতে আর শিখতে পেরেছিলাম। তাদের শক্তি আর বিশেষ দক্ষতা দেখে আমার ঈর্ষা হত। বিশেষত আমি শিলুক উপজাতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাদের অনেকের সাথে বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলাম।
এদের মধ্যে উমতাগ্নাস নামে প্রাচীন এক ওঝা ছিল। আমাদের দলের লোকেরা তাকে একজন আদিম ডাকিনীবিদ্যা চর্চাকারী ওঝা মনে করতো যে প্রেত সাধনা করতো। তাকে ওরা বন্য পশুর চেয়ে এক ধাপ উঁচু মনে করতো। এ-ধরনের লোক দূর দক্ষিণাঞ্চলে অনেক রয়েছে। তবে আমি বুঝতে পেরেছিলাম সে ছিল একজন জ্ঞানীলোক যার অনেক বিষয়ের জ্ঞান রয়েছে, যা উত্তর থেকে আসা আমাদের নজর এড়িয়ে গেছে। সে আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছিল।
