এদিকে জারাসের পুরো দেহ বেঁকে উঠে তারপর শক্ত হয়ে দাঁড়াল। তার ডান হাত থেকে তলোয়ারটা মাটিতে খসে পড়লো। তেহুতি তার বাম হাতের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে মাটিতে পা রেখে দাঁড়াল।
যন্ত্রণার মাঝে সে কোনোরকমে তেহুতিকে বললো, তায়তার কাছে চলে যান। আমি মারা যাচ্ছি। তায়তা আপনাকে রক্ষা করবে। তারপর সে বাঁকা হয়ে তলপেটের যে জায়গায় তলোয়ারের ডগাটা বিঁধেছে তা অনুভব করলো।
তেহুতি তার উপদেশ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলো। সে জারাসের পাশে অবশ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলো জারাসের পোশাকের নিচ দিয়ে তলোয়ারের ডগাটা বের হয়ে রয়েছে আর দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে টপটপ করে রক্ত ঝরছে।
জারাস হাঁটু ভেঙে সামনের দিকে পড়ে গেল। মাথা নিচু করে কপাল মাটিতে ঠেকাল।
তার সামনে দাঁড়িয়ে তেতির মুখ রাগে কাঁপছিল, সে আল হাওয়াসাঈর উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলতে লাগলো, তুমি জারাসকে মেরে ফেলেছ! তুমি আমার মানুষকে মেরে ফেলেছ! সে মাটি থেকে জারাসের তলোয়ারটা তুলে নিল। তারপর এমন প্রচণ্ড শক্তিতে শেয়ালের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো, যা তার কমনীয় দেহের তুলনায় সম্পূর্ণ অসম্ভব বলা চলে। তলোয়ারের ডগাটি সোজা শেয়ালের কণ্ঠনালীর মধ্য দিয়ে ঢুকিয়ে দিল।
শেয়ালের গলা থেকে হিশশ করে নিঃশ্বাস বের হল, সে দুই হাতে তলোয়ারের ধারাল ফলাটা ধরে থামাতে ব্যর্থ চেষ্টা করে চললো। পাগলের মতো শক্তিতে তেহুতি তলোয়ারটি তার গলা থেকে টান দিয়ে বের করতেই, ধারাল ফলায় শেয়ালের হাড় শুদ্ধ দুটো আঙুল কেটে গেল।
তারপর শেয়ালের দেহের উপর দাঁড়িয়ে তেহুতি একের পর এক তলোয়ারের কোপ মেরে চললো বুকে, পাঁজরের মাঝে আর অন্যান্য জায়গায়।
আমার লোকেরা তেহুতিকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে বাদবাকি জীবিত বেদুঈনদেরকে তাদের বর্শা দিয়ে বিদ্ধ করতে লাগলো।
আমি তাদেরকে ছেড়ে দিয়ে তেহুতির পাশে এসে উটের পিঠ থেকে নামলাম। তাকে বুকে জড়িয়ে চেপে ধরে রাখলাম যতক্ষণ না সে শান্ত হয়, তারপর হাত থেকে তলোয়ারটা নিলাম।
তাকে বললাম, তুমি তাকে দশবার মেরে ফেলেছ। এখন জারাসের আমাদের সাহায্য দরকার। আমি জানি তার নামটি তার রাগ শান্ত করবে আর মনকে স্থির করতে সাহায্য করবে।
.
আমি জারাসকে নড়াচড়া করতে চাচ্ছিলাম না, কেননা তার যখমের যে অবস্থা, এতে অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে। লোকজনের সাহায্যে সে যেখানে শুয়েছিল তার উপরে একটা আচ্ছাদন তৈরি করলাম।
তারপর রক্ষীবাহিনীর সার্জেন্টকে বললাম মৃত আরবদের শরীর থেকে পরিষ্কার আর খুব কম রক্তমাখা আলখাল্লাগুলো খুলে নিয়ে আসতে। এগুলো দিয়ে তেহুতির জন্য সূর্যের প্রচণ্ড তাপ আর আমার লোকদের নজর থেকে রক্ষা পাবার জন্য একটা মোটামুটি আলখাল্লার মতো তৈরি করে দিলাম।
তারপর মৃত ঘোড়া আর শেয়ালসহ আরবদের দেহগুলো টেনে নিয়ে একলিগ দূরে মরুভূমিতে ফেলে আসতে বললাম। প্রচণ্ড তাপে এক ঘন্টার মধ্যেই এগুলোতে পচন ধরবে।
আমি আমার জিনিসপত্রের সাথে চিকিৎসার সাজসরঞ্জাম, সামান্য পরিমাণ ভেষজ আর ওষুধ নিয়ে এসেছিলাম। এগুলো সবসময় আমি যেখানে যাই সেখানে আমার সাথেই থাকে, যেন এগুলো আমার দেহের একটি অংশ। তবে জারাসের ক্ষতটি পরীক্ষা শুরু করার আগেই আমি বুঝতে পারলাম, যে কঠিন কাজ আমার হাতে রয়েছে তার জন্য ওষুধের এই পরিমাণ যথেষ্ট নয়।
এখানে কেবল তেহুতির উপর আমার আস্থা আছে। আহত ঘোড়া আর অন্যান্য গৃহপালিত পশুর চিকিৎসার সময় সে আমাকে সাহায্য করেছিল। তারপরও তাকে আমি নিতান্ত শিশুই মনে করি। জারাসের মৃত্যু হবে আর আমি চাই না যে সে তা তাকিয়ে দেখুক। তবে আমার হাতে কোনো উপায় ছিল না।
লাল শেপ্পেন (আফিম) ফুলের এক ঢোক রস বানাতে বানাতে আমি তাকে বললাম, রাজকুমারী, আমাকে তোমার সাহায্য করতে হবে। শক্তিশালী এই রসটি একটি ষাঁড়কেও অচেতন করে ফেলতে পারে।
অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে সে উত্তর দিল, পিরবো। শুধু বল কী করতে হবে।
একটা তামার পেয়ালায় মাদক তরলটি তার হাতে তুলে দিয়ে বললাম, প্রথমে এই রস পুরোটা তাকে খাওয়াতে হবে। সে জারাসের মাথা তার কোলে তুলে নিল। পাত্রটি তার ঠোঁটের কাছে ধরে তার নাক চেপে ধরলো যাতে সে পুরো তরলটা গিলে ফেলে। এদিকে আমি অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি সাজালাম।
জারাসের দুই চোখ বুজে এলো আর শক্তিশালী মাদকের প্রভাবে সে প্রায় অসাড় হয়ে পড়তেই আমরা তার গায়ের বর্ম আর কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত পরনের আঁটোসাট চোগাটা খুলে ফেললাম। মাটিতে ঘোড়ার জিনের কম্বলের একটা বিছানা পেতে তাকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে উপুড় করে শুইয়ে দিলাম। আমি আগেও জারাসকে নগ্নদেহে দেখেছি, তবে সবসময়ের মতো এবারও তার চমৎকার দেহসৌষ্ঠব দেখে মুগ্ধ হলাম। তবে মনে দুঃখ পেলাম ভেবে যে, এতো শিগগরই প্রকৃতির এই অপূর্ব সুন্দর কীর্তিটিকে আবার মাটিতেই শুইয়ে দিতে হবে।
আমি তার দুই পা ফাঁক করলাম, যাতে শেয়ালের তলোয়ারের ডগাটি যেখান দিয়ে ঢুকেছে সে পর্যন্ত পৌঁছতে পারি। তলোয়ারের ডগাটি তখনও ক্ষতস্থানের মুখে রয়েছে। আমি জানি শল্যচিকিৎসক দাবীদার অনেকেই কোনো কিছু না ভেবে এই অবস্থায় তলোয়ারের ডগাটি টেনে খুলে ফেলবে। এটা করার সাথে সাথে ওরা রোগীর ভাগ্য নির্ধারণ করে ফেলবে।
