তবে যাই হোক তীরের ধাক্কায় সে পেছনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। সাথে সাথে দুই হাত উপরের দিকে তুলে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করলো। তারপর তার পা দুটো ভেঙে পড়তেই সে মাটিতে পড়ে গেল।
তেহুতি তার হাত থেকে ফসকে ঘুরে পড়ে গিয়েছিল। আমি দেখলাম সে হাওয়ার মাঝে এক পাক ঘুরে একটি বিড়ালের মতো ক্ষিপ্রগতিতে মাটিতে দুপা রেখে দাঁড়াল। তাৎক্ষণিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মুহূর্তের জন্য একটু হকচকিয়ে গেলেও নিজেকে সামলিয়ে নগ্ন দেহে সুন্দর মেয়েটি একটি মোহনীয় ভঙ্গিতে দাঁড়াল।
আমাদের আগেকার পরিকল্পনা মোতাবেক জারাস বাজপাখির ডাকটির জন্য অপেক্ষা করছিল। আমি পাখির ডাক শুরু করার সাথে সাথে সে যেখানে তেহুতি দাঁড়িয়েছিল সেদিকে ঝাঁপ দিল।
শিকারী চিতার মতো ক্ষিপ্র গতিতে সে লাফ দিয়েছিল। তেহুতির কাছে পৌঁছাবার জন্য তাকে মাটিতে পড়ে থাকা শেয়ালের দেহ পার হতে হচ্ছিল। সে দেখতে পেল আমার তীরটি শেয়ালের বুকের উপরের অংশে বিধে রয়েছে, তাই সে মনে করলো দস্যুটি মরে গেছে। তাই সে তার দিকে আর মনোযোগ দিল না। কী ঘটছে, অন্য বেদুঈনরা তা বুঝে উঠার আগেই সে তেহুতির কাছে পৌঁছে গেল। তেহুতিকে জাপটে ধরে পেছনে ঠেলে নিয়ে তার সামনে নিজের দেহ দিয়ে তাকে আড়াল করে দাঁড়াল। সাথে সাথে উল্টো করা তলোয়ারটা শূন্যে ছুঁড়ে আবার মাটিতে পড়ার আগেই তলোয়ারের বাট ডান হাতে ধরে তেহুতির সামনে প্রহরীর মতো দাঁড়াল। সামনের দিকে থেকে আরবরা আক্রমণ করলে তাদের মোকাবেলার করার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।
ওদেরকে রক্ষা করার জন্য আমি রক্ষীদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে উঠলাম, এগিয়ে যাও! আক্রমণ কর! উট নিয়ে সামনের দিকে এগোতে এগাতে আমি ধনুকে আরেকটা তীর জুড়লাম। লক্ষ্য করলাম একজন আরব তীরন্দাজ জারাসের দিকে তীর ছুঁড়ার জন্য তার ধনুক উঁচু করেছে।
আরব লোকটির আগেই আমি তীর ছুঁড়লাম। ঠিক সময়ে আমার তীরটা তার গলায় বিঁধলো। তার তীরটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পড়ে যেতেই সে হাঁটু ভেঙে মাটিতে পড়ে দুই হাত দিয়ে গলায় বেঁধা আমার তীরটা আঁকড়ে ধরলো। মুখ থেকে গল গল করে লাল টকটকে রক্ত বের হতে লাগলো।
আরেকজন আরব জারাসের দিকে ছুটে গিয়ে মাথার উপর তলোয়ার তুলে জারাসকে আঘাত করতে উদ্যত হল। জারাস এক ধাক্কায় লোকটির তলোয়ারটা একপাশে সরিয়ে দিয়ে তার নিজের তলোয়ার দিয়ে লোকটির তলোয়ার ধরা হাতটা এক কোপে বিচ্ছিন্ন করে দিল। আরব লোকটি আর্তচিৎকার করে কাটা হাতের মুড়োটি অন্য হাতে ধরে পেছনের দিকে পড়ে গেল। সে গলায় তীর বেঁধা অন্য আরবটির গায়ের উপর উল্টে পড়লো।
আমি তৃতীয় তীরটি ছুঁড়ে আরেকজন বেদুঈন দস্যুকে ঘায়েল করলাম। জারাস আমার দিকে ফিরে দাঁত বের করে তাকিয়ে হাসতে লাগলো। মনে হল বোকা ছেলেটি এই লড়াই বেশ উপভোগ করছে।
আমি চিৎকার করে তাকে বললাম, তেহুতিকে নিয়ে এখানে চলে এসো!
সে দুহাত দিয়ে তেহুতিকে ছোট্ট একটি শিশুর মতো মাটি থেকে তুলে তার বাম কাঁধে ফেলে নিয়ে চললো।
তেহুতি পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে চিৎকার করতে লাগলো, আমাকে নামিয়ে দাও! জারাস তার প্রতিবাদে কোনো কান না দিয়ে তাকে কাঁধে নিয়ে আমার কাছে আসতে শুরু করলো। আমরাও তার দিকে এগোতে লাগলাম।
আল-হাওয়াসাঈ তখনও তীর বেঁধা অবস্থায় একই জায়গায় মাটিতে পড়েছিল। তার দিকে কোনো খেয়াল না করে আমরা আক্রমণরত অন্যান্য বেদুঈনদের সামলাতে ব্যস্ত ছিলাম। অন্যান্যদের মতো আমিও সমান দোষী। আমি জানতাম আমার তীরটি শেয়ালের হৃদপিণ্ডে আঘাত করেনি, হয়তো সে এখনও জীবিত আছে। তবে আমি ভেবেছিলাম তাকে আমি পঙ্গু করে ফেলায় তার তরফ থেকে কোনো বিপদের আশঙ্কা নেই। হাতপা দুই দিকে ছড়িয়ে সে মাটিতে পড়েছিল আর তার তলোয়ারটিও তার দেহের নিচে আটকা পড়েছিল।
তাকে পার হয়েই জারাসকে তেহুতির কাছে পৌঁছতে হয়েছিল। এখন সে আবার পিছিয়ে তার দিকেই আসছিল। জারাসের সমস্ত মনোযোগ ছিল তার চারপাশ ঘিরে থাকা অন্যান্য আরবদের দিকে।
হঠাৎ আল-হাওয়াসাঈ মাটিতে এক গড়ান দিয়ে ঘুরে বসলো। ডান হাতে তলোয়ারটি ধরা রয়েছে, তবে তার উঠে দাঁড়াবার শক্তি নেই।
আমি চিৎকার করে উঠলাম, সাবধান জারাস! পেছনে দেখো জারাস! শেয়াল তোমার পেছনে!
লড়াইয়ের কোলাহলে হয়তো সে আমার চিৎকার শুনতে পায় নি কিংবা আমার সাবধান বাণীর অর্থও ঠিকমতো বুঝতে পারেনি। তাই সে আরেক কদম পিছোতেই আল-হাওয়াসাঈয়ের তলোয়ারের আওতায় চলে এলো।
হতাশায় অসংলগ্ন এক চিৎকার করে শেয়াল তাকে আঘাত করলো। আঘাতটা এলো নিচে আর পেছন দিক থেকে। আঘাতটি সেরকম জোরদার না। হলেও তলোয়ারের ধারাল ডগাটি জারাসের চামড়ার পোশাক ভেদ করে তার দুই পায়ের মাঝখানে ঢুকে গেল।
আল-হাওয়াসাঈ দুর্বল হাতে তলোয়ারটি জারাসের শরীর থেকে টেনে বের করতে চেষ্টা করলো, কিন্তু টেনে বের করার মতো শক্তি তার ছিল না। সে পেছন দিকে হেলে এক কনুইয়ের উপর ভর দিয়ে বসলো। তারপর নিঃশ্বাস নেবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতেই বুকে বেঁধা তীরটি ঠিক তখনই এক হ্যাঁচকা টানের চোটে তার নিঃশ্বাস বন্ধ করে দিল। মুখের এক পাশ দিয়ে রক্তের ধারা গড়িয়ে পড়তে লাগলো।
