থামো! আর কাছে এগোবে না! তার কণ্ঠস্বর মাথার উপরের ছাদে প্রতিধ্বনিত্ব হয়ে গমগম করে উঠলো।
কালো দাড়িওয়ালা শয়তান লোকটাকে দেখেই আমি চিনতে পারলাম। তিনদিন আগে তেহুতিকে ঘোড়ার পিঠে ফেলে পালিয়ে যাওয়ার সময় সে আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসছিল। সে চিৎকার করে বলে উঠলো,
আমি আল-হাওয়াসাঈ, বেদুঈন সর্দার। সবাই আমাকে ভয় পায়!
তারপর সে নিচু হয়ে ঘোড়ার মৃতদেহগুলোর পেছনে যেখানে তেহুতিকে লুকিয়ে রেখেছিল, সেখান থেকে তাকে টেনে দাঁড় করাল।
সে এমনভাবে তেহুতিকে ধরে রাখলো যেন আমরা তার মুখ দেখে তাকে চিনতে পারি। একহাত দিয়ে সে তেহুতির গলা শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে রেখেছে, যাতে সে নড়াচড়া বা চিৎকার করতে না পারে। তার ডান হাতে একটা নাঙ্গা তলোয়ার ধরা রয়েছে। তেহুতির দেহ দিয়ে সে নিজের দেহ আড়াল করে রেখেছে।
আল-হাওয়াসাঈ তেহুতির পরনের সমস্ত পোশাক খুলে ফেলেছে। আমি জানি সে এটা করেছে তাকে অপমান করার জন্য আর দেখাতে যে সে সম্পূর্ণভাবে তার উপর কর্তৃত্ব খাঁটিয়েছে। তার গলা পেঁচিয়ে ধরা দস্যুর বিশাল লোমশ হাতের তুলনায় তেহুতির অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো কীরকম কমনীয় আর শিশুর মতো দেখাচ্ছে। ভয়ে তার চোখদুটো বড় বড় হয়ে রয়েছে।
জারাস এক লাফে উটের পিঠ থেকে নামলো। তখনও উল্টো করে ধরা তলোয়ারটা হাতে নিয়ে সে আল-হাওয়াসাঈয়ের দিকে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করলো। আল-হাওয়াসাঈসের মতো সেও তার শিরস্ত্রাণের মুখের ঢাকনা খুলে নিজের চেহারা প্রকাশ করে রেখেছে।
জারাসকে চেনার সাথে সাথে তেহুতির মুখ থেকে আতঙ্ক সরে গিয়ে আশার আলো জেগেছে আর তার সাহস ফিরে এসেছে। জারাসের নাম নিতে চেষ্টা করে তার ঠোঁট নড়ে উঠলো, তবে দস্যু শেয়াল শক্তহাতে তার গলা পেঁচিয়ে ধরায় কোনো শব্দ বের হল না।
তার জন্য আমি গর্ব বোধ করলাম, যেরকম তার মায়ের জন্যও করতাম। তবে এখন এসব ভাবনা থেকে আমার মন সরিয়ে নিলাম। দুই চোখ দিয়ে দূরত্বটা মেপে আমার উড়ন্ত তীরের উচ্চতা আর তারপর নিচু হয়ে লক্ষ্যের দিকে যাওয়ার গতিপথটি মনে মনে পরিমাপ করলাম।
অনুভব করলাম বাম কাঁধের পাশ দিয়ে মৃদু হাওয়া বয়ে যাচ্ছে, তবে দেখলাম যেখানে আল-হাওয়াসাঈ দাঁড়িয়ে রয়েছে সে স্থানটি বড় একটি পাথরের টুকরা দিয়ে আড়াল করা রয়েছে। শুধু মাত্র একজন ওস্তাদ তীরন্দাজই এখানে তার লক্ষ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবে। প্রথমে হাওয়ায় ডান দিকে মোড় নেবে, তারপর বাতাসহীন জায়গাটিতে গিয়ে তীরটি নিচের দিকে শেষ কয়েক কিউবিট নিচে নেমে লক্ষ্যে আঘাত হানবে।
আল-হাওয়াসাঈ প্রচণ্ড আক্রোশে জারাসের উদ্দেশ্যে গালি দিতে দিতে তাকে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে বলছিল আর সামনে না এগোতে সাবধান করছিল। ডান হাতে ধরা ছোট তরোয়ালের ব্রোঞ্জের ধারাল পাতটি সে তেহুতির চিবুকের নিচে নরম গলার সাথে চেপে ধরে রেখেছিল।
সে চিৎকার করে জারাসকে বললো, ওখানেই থাম আর নয়তো আমি এই কুত্তির গলা কেটে পুরো দেহ টুকরো টুকরো করে ফেলবো।
জারাস শান্ত কণ্ঠে বললো, কারও মারা যাবার প্রয়োজন নেই। আমরা কথা বলতে পারি। সে আরও এগোতে লাগলো। জারাস আমাকে মূল্যবান সুবিধা দিচ্ছিল। প্রতিটি পদক্ষেপে আমার তীরের পাল্লা আরও সুবিধাজনক জায়গায় পৌঁছাচ্ছে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার মুখোমুখি হতে গিয়ে আল-হাওয়াসাঈ একটু সরে গিয়ে আমার তীরের লক্ষ্য আরও উন্মুক্ত করে দিচ্ছিল।
এখন শুধু দরকার শেয়ালের মনোযোগ কয়েক মুহূর্তের জন্য অন্য দিকে সরানো যাতে সেই ফাঁকে আমি ধনুকে তীর লাগিয়ে গুণ টেনে তীরটি ছুঁড়তে পারি।
মাথা না সরিয়ে আমি একটি শিকারী বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ কণ্ঠে ডেকে উঠলাম। আমার জীবনের প্রতীক হচ্ছে আহত বাজপাখি আর আমি এই ডাকটি নিপুণভাবে আয়ত্ব করেছিলাম। এমনকি সবচেয়ে অভিজ্ঞ বাজপাখির শিকারীও আমার ডাক আর আসল পাখির ডাকের মধ্যে পার্থক্য বের করতে পারবে না। চতুর্দিকে পাথরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিতৃ হয়ে শব্দটি আরও জোড়ালো হয়ে উঠলো।
সমস্ত বেদুঈন বাজপাখি খুব পছন্দ করে। আর আল-হাওয়াসাঈও এই স্মৃতি জাগানিয়া ডাকটি শুনে নিজেকে সামলাতে পারলো না। গালাগালি থামিয়ে সে উপরের দিকে তাকিয়ে খুঁজতে লাগলো কোথা থেকে এই ডাকটি এসেছে। মুহূর্তের জন্য সে মনোযোগ অন্য দিকে সরিয়েছিল, তবে সেটাই আমার জন্য যথেষ্ট ছিল।
আমি ধনুক আর ভালো তীরটি এক সাথে করে ছোঁড়ার জন্য প্রস্তুত হলাম। ধনুকের গুণ টেনে ছেড়ে দিতেই তীরটা উড়ে গেল। লক্ষ্য করলাম তীরটা উপরের দিকে উঠে এর সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছলো। শেয়ালের মাথার উপরের পাথরের ছাদটি না ছুঁয়ে এর উপর দিয়ে পার হল, তারপর নিচের দিকে পড়তে শুরু করলো।
আমার মনে হচ্ছিল যেন এটি একটি রাজকীয় ভঙ্গিতে চলছে, তবে আমি জানি কেবল আমার মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সম্পন্ন লোকই তা জানতে পারে।
তারপর আমি লক্ষ্য করলাম শেয়ালের দুই চোখ তার কোটরে ঝির ঝির করে কেঁপে উঠলো। অসম্ভব ব্যাপার, হয় সে এটা সে দেখেছে কিংবা একটি বন্য পশুর মতো অনুভব করেছে যে, আমার ছোঁড়া তীরটা তাকে আঘাত করতে যাচ্ছে। সে মাথাটা সামান্য ঝাঁকি দিল আর তার শরীরটি ঘুরতে শুরু করলো। তারপর আমার তীরটি তার বুকের উপরের অংশের এক পাশে বিধলো। আমার লক্ষ্যভ্রষ্ট করার জন্য সে একটু নড়েছে, আমি বুঝতে পারলাম তীরটি তার হৃৎপিণ্ডে লাগেনি।
