জারাস তার লোকজনদেরকে যথারীতি নির্দেশ দিতে শুরু করলো। আর আমি একটা কুমিরের চামড়ার বর্ম আর ব্রোঞ্জের শিরস্ত্রাণ পরে নিলাম যাতে আমার বিশেষ আলখাল্লা আর লম্বা চুল ঢাকা পড়ে। আমি আমার লোকজনের মাঝে নিজেকে আলাদা করে দেখাতে চাই না।
সবধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার পর আমরা উটের পিঠ থেকে নেমে উটগুলোকে টেনে নিয়ে পাহাড়ের পেছন দিকে গেলাম। তারপর নিচে বেলেপাথরের একশিলা স্তম্ভের উপত্যকায় নামতে শুরু করলাম। শেয়াল তার দস্যুদের নিয়ে সেখানেই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।
এবার আমার বামবাহুতে চামড়ার বাহুবন্ধনীটিা লাগিয়ে নিলাম, যাতে ধনুকের ছিলার আঘাতে গতবারের মতো কেটে না যায়।
দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিল জারাস। তার বিশ পা পেছনে অন্যান্যরা একজোট হয়ে চলেছে। এবার আমি জারাসের পাশাপাশি নেই।
কুমিরের বর্ম পরে আমি দ্বিতীয় সারির বামদিকে একেবারে শেষ প্রান্তে রয়ে গেলাম। ধনুকটা উটের গদির কাপড়ের মাঝে লুকালাম, যাতে একেবারে শেষ মুহূর্তে যখন এটা তুলবো, তার আগে শত্রুপক্ষের কারও চোখে না পড়ে।
আমাদের অবস্থান থেকে জারাস খানিকটা সামনে এগিয়ে গেল, যাতে তার উপর শেয়ালের নজর পড়ে। সে তলোয়ারটা উল্টো করে তলোয়ারের হাতল মাথার উপরে উঁচু করে রেখেছে। এটা ছিল সাময়িক যুদ্ধবিরতীর সর্বজনীন প্রতীক।
আমি জানতাম শেয়াল এটাকে শর্তসাপেক্ষে আলোচনার একটা আমন্ত্রণ হিসেবে ধরে নেবে, কেননা আমরা সবাই ইতোমধ্যেই অচলাবস্থায় আটকে পড়েছি। সে পালাতে পারছে না, কেননা তার ঘোড়াগুলো অচল হয়ে পড়েছে, আর তার লোকদেরও খেলা সাঙ্গ হয়েছে।
আবার আমরাও সরাসরি আক্রমণ করে ব্যাপারটা নিষ্পত্তি করতে পারছি না, কেননা সে তেহুতির গলায় একটা ছুরি ধরে রেখেছে।
আমি জারাসের উপর নির্ভর করছিলাম, যাতে সে শেয়ালকে আমার তীরের পাল্লার মধ্যে নিয়ে আসে। আরেকটু কাছাকাছি হতেই, আমি পরিস্থিতিটা আরও ভালোভাবে নিরীক্ষণ করলাম।
পায়ের ছাপ থেকে আমি জানতে পেরেছিলাম, দুই দলে ভাগ হয়ে আর মরুভূমির বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কারণে আল-হাওয়াসাঈর দস্যুদের সংখ্যা এখন পনেরোতে নেমে এসেছে। আর এদিকে জারাসসহ আমার রয়েছে ছাপান্নজন রক্ষী। ওরা সবাই এখন সতেজ আর লড়াই করার জন্য উন্মুখ হয়ে রয়েছে।
শেয়াল বেশ সর্তকতার সাথেই বেলেপাথরের বিশাল একশিলা স্তম্ভটির নিচে তার শেষ অবস্থানটি বেছে নিয়েছিল। শিলাটি দুই দিক দিয়ে তাকে আড়াল করে রেখেছে। তারপরও এটি তাকে অতিরিক্ত সুবিধা দিয়েছে। তার মাথার উপরে সামনের দিকে ছড়ানো একটি তাকের মতো বেলেপাথরের ছাদটি আমার তীর ছোঁড়ার পাল্লাকে সীমাবদ্ধ করেছে। এই দূরত্ব থেকে উঁচু করে তীর ছুঁড়লে সেটা শেয়ালের গায়ে বেঁধার আগে তার মাথার উপরে ছাদের পাথরে লেগে যেতে পারে। আমাকে আরেকটু এগিয়ে ক্ষেপণাস্ত্রের মতো বাঁকা পথে তীর ছুঁড়তে হবে যা ছাদ এড়িয়ে তার গায়ে বিঁধতে পারে।
তবে পাহাড়টি শেয়ালের জন্য একটি কারাগারের দেয়ালও হয়েছে। তার পালাবার আর কোনো পথ নেই। তাকে আমাদের সাথে একটা বোঝাঁপড়ায় আসতেই হবে: তার নিজের আর লোকজনের জীবনের বদলে আমাদের রাজকুমারীর জীবন অদলবদল করতে হবে।
জারাসকে অনুসরণ করে আমরা ধীরে ধীরে যেখানে শেয়াল অপেক্ষা করছে সেদিকে এগোতে লাগলাম।
এবার আমি দেখলাম বেদুঈন সর্দারের ঘোড়াগুলো পিপাসায় কাতর হয়ে আর অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে মারা পড়েছে। আরবরা কয়েকটি ঘোড়ার মৃতদেহ সামনের দিকে টেনে এনে অর্ধচন্দ্রাকার দেয়ালের মতো সাজিয়ে রেখেছে। এর আড়ালে ওরা হামাগুড়ি দিয়ে অবস্থান নিয়েছে। লোকগুলোর শুধু মাথার উপরের অংশ, বর্শার ডগা আর বাকা তলোয়ারের কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে।
আরেকটু কাছে এগিয়ে আমি লক্ষ্য করলাম যে, অন্তত তিনজন আরব ধনুকে তীর জুড়ে আমাদের দিকে ছুঁড়বার জন্য প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। তবে বেদুঈনরা ভালো তীরন্দাজ নয়। এগুলোর পাল্লা অত্যন্ত দুর্বল, আমার হাঁটুর কাছে উটের গদীর কাপড়ের নিচে যে শক্তিশালী বাঁকা যুদ্ধের ধনুকটি রয়েছে তার তুলনায় এর পাল্লা অর্ধেক হবে।
এখন সবকিছু নির্ভর করছে আল-হাওয়াসাঈ আমাদেরকে থামতে বলার আগে জারাস কতোটুকু দুরত্ব কমাতে পারবে। উটের প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে আমি কমে আসা দূরত্বের পাল্লাটা পরিমাপ করছিলাম।
তারপর আমরা ঠিক মোক্ষম জায়গায় পৌঁছলাম, যেখান থেকে আমার ধারণায় উপরের দিকে বাঁকা করে তীর ছুঁড়লে তীরটি নিচু হয়ে ওদের মাথার উপরের ছাদে না লেগে যে কোনো একজন আরবের কাছে পৌঁছাবে। এবার একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। এরপর সামনের দিকের এগিয়ে যাওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ আমাকে আরও ভালো অবস্থানে নিয়ে চলেছে।
আমার সামনে যে রক্ষীরা ছিল, ওরা আমাকে আড়াল করে রেখেছিল। আমি নিচু হয়ে ধনুকটা ধরলাম। তারপর নিচের দিকে না তাকিয়ে অন্য হাত দিয়ে কোমরবন্ধ থেকে একটা তীর বেছে নিলাম। ধনুকটা যেখানে হাতে ধরেছিলাম তার উপর তীরের মাথা রেখে বাম হাতের তর্জনী দিয়ে তীরটা চেপে ধরে রাখলাম।
আমার উটটি আমাকে নিয়ে ধীরে ধীরে আরও পাঁচ পা সামনে এগোল। ঠিক তখনই বেদুঈনদের সারি থেকে একজন লোক উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের মুখোমুখি হল। সে মুখটাকা কাপড়টি সরিয়ে আরবীতে গর্জে উঠলো।
