তারপর খুশি হয়ে বেশ জোরে বলে উঠলাম। তবে অতো চালাক নয়।
জারাস আর তার লোকজন হতবুদ্ধি হয়ে আমাকে লক্ষ্য করছিল, ওরা আরও অবাক হয়ে গেল যখন আমি তেতির খালি পায়ের ছাপগুলো পেছনে ফেলে উল্টো দিকে বেদুঈনরা দুই দলে ভাগ হয়ে যে জায়গা থেকে দুই দিকে যেতে শুরু করেছিল সেদিকে ফিরে চললাম।
দিক বদল করে দক্ষিণ দিকে যাওয়া শুরু করার পর জারাস কিংবা তার লোকজন কোনো ধরনের প্রতিবাদ করতে সাহস পেল না। এদিকে প্রতি লিগ দূরত্ব পার হওয়ার সাথে সাথে আমার হাতে ধরা দেবীর মাথার সোনার অলঙ্কারটি থেকে বিচ্ছুরিত উষ্ণ আভা আরও শক্তিশালী হতে লাগলো।
.
আমি জানি তেহুতি এখন কীরকম দুর্দশায় আছে। দস্যুরা যখন তাকে অপহরণ করেছিল তখন তার পরনে কেবল একটি সুতির জামা ছিল। উটের পিঠের কাঠের জীনের উপর বসা কিংবা উপরে প্রখর রোদের তাপে এই পোশাক কোনো কাজে আসবে না। যখন সে খালি পায়ে হাঁটছিল তখন তার পা কেটে যে রক্ত ঝরছিল তা আমি দেখেছি। একজন মিসরীয় রাজকুমারীর পা একটি কৃষক কন্যার পায়ের চেয়ে অনেক নাজুক।
আমার মনে শুধু এইটুকু সান্ত্বনা ছিল যে, শেয়াল তার দস্যুদলের কাউকেই তেহুতির গায়ে হাত তুলতে অনুমতি দেবে না। একটি কুমারী মেয়ে হিসেবে তার মূল্য অনেক বেশি। এতোটুকু বুদ্ধি তার নিশ্চয়ই আছে যে, তেহুতির দামে সে দশ হাজার সুন্দরী ক্রীতদাসী কিনতে পারবে। ইচ্ছা হচ্ছিল উটগুলোকে আরও জোরে চালিয়ে নিয়ে মেয়েটিকে উদ্ধার করে একদুই ঘন্টা কষ্ট পাওয়া থেকে রেহাই দেই।
তবে ভাবলাম শেয়াল নিশ্চয়ই আরও কিছু চালাকি করার চেষ্টা করবে আর সেক্ষেত্রে আমাকে তা সামলাবার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। কাজেই স্বাভাবিক গতিতেই উট চালিয়ে নিয়ে চললাম। তবে পানি খাওয়ার জন্য কোথাও না থেমে সারা সকাল চললাম।
একঘন্টা পর দুপুরের সূর্য যখন মাথার উপর, তখন আমি একটা বেলেপাথরের পাহাড়ের চূড়ায় উঠলাম। নিচের দিকে তাকিয়ে বেশ চওড়া কয়েক লিগ দীর্ঘ একটি খাড়ি দেখতে পেলাম। পুরো উপত্যকাটি জুড়ে বহুকাল থেকে বাতাসের আঘাতে দৈত্যাকৃতির প্রাকৃতিক স্থাপত্য গড়ে উঠেছে। লাল বেলে পাথরের সুউচ্চ চূড়াগুলো যেন নীল আকাশের পেট ছুঁয়ে রয়েছে। তবে গোড়ারদিকে বাতাসে ক্ষয়ে যাওয়ায় সরু স্তম্ভগুলোর উপর বিশাল মাথাগুলো ভারসাম্য বজায় রেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
দলের মধ্যে আমি সবচেয়ে বয়স্ক হলেও আমার দৃষ্টিশক্তি সবচেয়ে তীক্ষ্ণ ছিল। সবার আগে আমিই পলাতকদের দেখতে পেলাম। বেলেপাথরের দৈত্যাকৃতির একশিলা স্তম্ভগুলোর গোড়ার ছায়ায় মানুষগুলোকে আমিই প্রথম জারাস আর তার লোকজনদের দেখালেও প্রথমে ওরা ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। রোদে পোড়া পাথরগুলো থেকে গরম বাষ্প উঠে মরীচিকা হয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছিল আর এতে ওদের দৃষ্টিবিভ্রম হচ্ছিল।
তারপর একটি বর্শা বা তলোয়ালের পাতে রোদ প্রতিফলিত হয়ে ঝিকমিক করে উঠতেই ওদের চোখে পড়লো। আমার পেছন থেকে দলের সবাই উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলো। তবে আমি জানি আরও খারাপ ঘটনা ঘটার বাকি আছে। এখন আমরা মরিয়া হয়ে ওঠা এক লোকের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি আর শেয়াল তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তেহুতি এখন আরও বিপদের মধ্যে রয়েছে।
সবাইকে চুপ করতে বলে নিঃশব্দে পাহাড়ের পেছন দিক দিয়ে নামতে শুরু করলাম। বেদুঈনদের গতিবিধির প্রতি নজর রাখার জন্য দুজন লোকসহ একজন বিশ্বাসী সার্জেন্টকে পাহাড় চূড়ায় রাখলাম। তারপর অন্যদেরকে নিয়ে নিচে নামার পর একটু বিশ্রাম নিয়ে অস্ত্রশস্ত্রসহ প্রস্তুত হতে বললাম।
উটের পিঠে বেধে রাখা আমার পোটলাটা থেকে চামড়ার ব্যাগে রাখা যুদ্ধের ধনুক আর তূণীর বের করে আনলাম। জারাসকে সাথে নিয়ে একটা পাথরের উপর বসে তাকেও পাশে বসতে বললাম।
তারপর তাকে নির্দেশ দিতে শুরু করলাম, ওদের ঘোড়াগুলো পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে, আর চলতে পারবে না। এবার শেয়াল শেষ লড়াই চালাবার জন্য অবস্থান নিয়েছে। তারপর তাকে বুঝিয়ে বললাম শেয়ালের কবল থেকে তেহুতিকে আহত না করে উদ্ধার করতে হলে আমাদেরকে কী করতে হবে। একবার বলার পর তাকে বললাম পুরো পরিকল্পনাটা আমাকে শুনাতে যাতে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ না থাকে।
কথা বলতে বলতে আমি আমার ধনুকের ছিলা টেনে পরীক্ষা করছিলাম। তূণীর থেকে সবচেয়ে ভালো তিনটি তীর বেছে নিলাম। হাতের তেলোতে গড়িয়ে নিয়ে দেখে নিলাম কোনো ধরনের অমৃসণতা আছে কিনা। খুব ভালোভাবে পরীক্ষা করার পর তীর তিনটি কোমরবন্ধে খুঁজে নিলাম। বাদবাকি তীরগুলো তূণীরে ঢুকিয়ে কাঁধে বেঁধে নিলাম। হয়তো একবারের বেশি তীর ছুঁড়ার সুযোগ পাবো না, তাও আবার এতো দূরের নিশানায়। আর যদি দ্বিতীয় সুযোগ আসে তখন তীর বাছাই করতে গিয়ে একটি মুহূর্তও নষ্ট করতে চাই না।
উঠে দাঁড়িয়ে জারাসের পিঠে একটা চাপর দিয়ে বললাম, আমি প্রস্তুত জারাস। তুমি তৈরিতো?
সে একলাফে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, হ্যাঁ তায়তা! রাজকুমারীর জন্য আমি প্রাণ দিতে প্রস্তুত। নাটুকেপনা হলেও তার কথাটির মধ্যে যথেষ্ট আন্তরিকতা ছিল। তরুণ হৃদয়ের ভালোবাসার নিজস্ব একধরনের চমৎকারিত্ব রয়েছে।
আমি শুষ্ক মন্তব্য করলাম, আমার মনে হয় রাজকুমারী তেহুতি আর আমি দুজনেই তোমার জীবিত থাকাটাই শ্রেয় মনে করবো।
