উত্তর দিকে যে বড় দলটি মোড় নিয়েছিল আমি সেটার পথরেখা পরীক্ষা করলাম। তারপর আমার মন নেচে উঠলো যখন দেখলাম একটি ছোট সুন্দর পায়ের ছাপ তাদেরকে অনুসরণ করছে। এরাই তেহুতিকে তাদের সাথে নিয়েছে।
অবশ্য এবার ওরা তাকে মাটিতে নামিয়ে হাঁটাচ্ছে আর চিহ্নগুলো দেখে। আমি বুঝতে পারলাম দুজন আরব জোর করে তাকে টেনে নিয়ে চলেছে। দৌড়ে সামনে এগিয়ে কাছ থেকে তার পায়ের ছাপগুলো পরীক্ষা করলাম। রেগে ফেটে পড়লাম যখন দেখলাম একটা খালি পা থেকে রক্ত ঝরছিল। বালুতে ছোট ছোট পাথরের ধারাল টুকরায় তার পা কেটে গেছে।
পায়ের ছাপগুলো পরিষ্কার। আর কোনো সন্দেহ নেই যে উত্তরমুখি দলটির সাথেই তেহুতি গিয়েছে। তারপরও আমি ভাবলাম রাগের বশে হয়তো আমি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারি। আমাকে ভালোভাবে নিশ্চিত হতে হবে।
জারাসকে ডেকে বললাম, আমি ডাকা পর্যন্ত এখানে অপেক্ষা করো। তাকে সেখানে রেখে পায়ের ছাপগুলো অনুসরণ করে সামনে এগিয়ে চললাম। একশোবিশ পা যাওয়ার পর তেহুতির পায়ের ছাপ আর দেখা গেল না। তবে এনিয়ে আমি বেশি কাতর হলাম না।
বুঝতে পারলাম সম্ভবত আল-হাওয়াসাঈ কিংবা অন্য কোনো আরব তাকে ঘোড়ার পিঠে তুলে নিয়েছে। শুধু পায়ের ছাপগুলোই যে পরিষ্কার তা নয়, আমার ডান হাতে ধরা হাথরের সোনার মাথা থেকে যে অলৌকিক আভা বের হচ্ছে সেটিও এতে সমর্থন দিচ্ছে।
পেছন ফিরে জারাসকে কাছে আসতে ইশারা করলাম। সে আমার উট নিয়ে এলো। উটের পিঠে চড়ে আমি তেহুতিকে নিয়ে উত্তরমুখি চলা আরবদের ফেলে যাওয়া পায়ের ছাপ অনুসরণ করে এগিয়ে চললাম।
মরুভূমির সামান্য উঁচুনিচু জমির উপর দিয়ে কিছুদূর যাওয়ার পর পরবর্তী বালিয়াড়ির উপর উঠার পর অনুভব করলাম, তেহুতির সোনার অলঙ্কারটির আভার বিচ্ছুরণ কমে এসেছে। সাথে সাথে লাগাম টেনে ধরে উটটি থামালাম। ধীরে ধীরে চারপাশের বিশাল বালিয়াড়িগুলোর দিকে তাকালাম।
জারাস কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, কী হয়েছে প্রভু?
তেহুতি এপথে আসেনি। শেয়াল আমাদের সাথে চালাকি করেছে।
সে বললো, এটা কী করে সম্ভব তায়তা? আমিও তার পায়ের ছাপ দেখেছি। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
উটের মুখ ফিরিয়ে আমি বললাম, অনেক সময় মিথ্যা পরিষ্কার দেখা যায় আর সত্য লুকিয়ে থাকে।
বুঝতে পারলাম না, প্রভু।
আমি বললাম, আমি ভালোভাবেই বুঝেছি জারাস। অনেক বিষয় আছে। যা তুমি কখনও বুঝতে পারবে না। কাজেই এ-বিষয়ে তোমার কাছে ব্যাখ্যা দিয়ে সময় নষ্ট করবো না।
আমার লোকেরা বিরক্ত হলেও কোনো কথা না বলে পেছনে ঘুরলো।
যে জায়গায় তেহুতির খালি পায়ের ছাপটি হারিয়ে গিয়েছিল সেই জায়গায় আবার ফিরে এলাম। উটের পিঠ থেকে নেমে লাগাম একজনের হাতে তুলে দিলাম।
আমি জানি কিছু একটা আমার নজর এড়িয়ে গেছে। কিন্তু সেটা কি তা ধরতে পারছি না।
আরও পিছিয়ে যেখানে বেদুঈনরা দুইদলে ভাগ হয়েছিল সেখানে পৌঁছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করলাম। উল্টো দিকে যাওয়া কোনো পথরেখা কি দেখা যাচ্ছে? একটু থেমে ভাবলাম। উত্তর হল, না নেই। এই জায়গাটি থেকে ওরা দুই দলে ভাগ হয়ে দুই দিকে সোজাসুজি চলে গেছে; কেউ আর পেছন ফিরে আসেনি।
যাইহোক এই অস্বাভাবিকতার উত্তর খুঁজার চেষ্টা করেও ঠিক ধরতে পারছিলাম না।
মনে মনে বললাম, সে নিশ্চয়ই ফিরে গেছে। দ্বিতীয় দলটির সাথে সামনের দিকে আর যায় নি, তার মানে সে নিশ্চয়ই পেছন দিকে গিয়েছে।
আবার একটু থামলাম, আচ্ছা আমি, পেছন দিকে গিয়েছে এই কথাটা কেন ব্যবহার করলাম? এই পরিস্থিতিতে এই কথাটা ঠিক নয় আর আমি তো সাধারণত ভুল বাক্য ব্যবহার করি না।
সমাধানটির খুব কাছাকাছি পৌঁছার পর এবার জোরে জোরে বলে উঠলাম, একজন মানুষ পেছন দিকে যায় না। হয় পেছন দিকে ঘুরে কিংবা পেছন পেছন হাঁটে… আবার থামলাম। হুঁ, আচ্ছা! এবার বুঝেছি!
যেখানে তেতির খালি পায়ের ছাপটি শেষ হয়েছিল সেইজায়গায় আবার ছুটে গেলাম।
এবার আমি ঠিক বুঝতে পেরেছি কী খুঁজতে হবে। সাথে সাথে তা পেয়েও গেলাম। এখানে আরেক জোড়া পুরুষ মানুষের পায়ের ছাপ ছিল যা আপাত দৃষ্টিতে দলটির অন্যান্যদের মতো উত্তরদিকেই যাচ্ছিল। তবে এখানে কিছু পার্থক্য ধরা পড়লো।
তেহুতির পায়ের ছাপ যেখানে শেষ হয়েছিল, ঠিক সেই জায়গা থেকেই এই একটি পুরুষ মানুষের পায়ের ছাপ শুরু হয়েছে। পায়ের এই ছাপজোড়া অন্য সব পায়ের ছাপ মাড়িয়ে চলেছে। যে লোকের এই পায়ের ছাপ, সে ভারি কোনো ওজন বহন করছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল প্রতি পদক্ষেপে এই লোকটির স্যান্ডেলের পেছনে গোড়ালির দিকে ধুলা উড়িয়ে চলছিল…অথচ সামনের দিকে হাঁটলে স্যান্ডেলের বুড়ো আঙুলের সামনের দিকে ধূলা উড়ার কথা।
মনে মনে ভাবলাম, সম্ভবত শেয়ালই এই পায়ের ছাপ ফেলেছিল। প্রথমে যেখানে দলটি দুই ভাগ হয় সেখানে সে তেহুতিকে মাটিতে নামিয়ে দেয়। তারপর উত্তরমুখি দলটির ঘোড়াগুলোর সামনে তাকে জোর করে কয়েক পা হাঁটায়। দুইশো পা যাওয়ার পর সে ঘোড়া থেকে নেমে পড়ে। তার ঘোড়াটি উত্তর দিকে যাওয়া দলটির সাথে পাঠিয়ে দেয়। তারপর মাটি থেকে তেহুতিকে তুলে নিয়ে যেখানে প্রথম দলটি তার জন্য পেছনে অপেক্ষা করছিল সেখানে ফিরে যায়। তবে এক্ষেত্রে সে তেহুতিকে কাঁধে তুলে পেছন দিকে হেঁটে চলে। প্রথম দলটি তার আর তেহুতির জন্য আরেকটি ঘোড়া নিয়ে অপেক্ষা করছিল। এইখানে এসে সে তেহুতিকে নিয়ে দক্ষিণমুখি দলটির সাথে চলে যায়। আর আমাদেরকে উত্তরমুখি দলটির অনুসরণ করতে বাধ্য করে। অত্যন্ত শয়তানি বুদ্ধির জটিল একটি ধূর্তামি। আমি মৃদু হাসলাম।
