আমি তার সাবধান বাণী উপেক্ষা করে তলোয়ার বের করলাম। লোকটার কাছাকাছি আসতেই সে নড়ে উঠলো আর মাথা তুলে অসহায় দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। ঠিক তখনই আমি তাকে চিনতে পারলাম।
তার দিকে তাকিয়ে আমি এতো হতবাক হলাম যে, আমার মুখ থেকে কোনো কথা বের হচ্ছিল না।
জারাস চিৎকার করে উঠলো, কী হয়েছে তায়তা? আপনি এতো চিন্তিত কেন? লোকটাকে চেনেন নাকি? সাথে সাথে তার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলাম না।
জারাসের দিকে না তাকিয়ে বললাম, আল-নামজুকে আমার কাছে পাঠাও। পায়ের কাছে পড়ে থাকা লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছিল। তারপর সে ছেঁড়া কেফায়ার একটি অংশ দিয়ে মুখের নিচের অংশ ঢেকে মুখটা অন্য দিকে ফেরাল।
জারাস আল-নামজুকে ডাকতেই সে উট নিয়ে আমার পেছনে এসে দাঁড়াল।
আমি কঠিন কণ্ঠে বললাম, আমার কাছে এসো। সে আমার কাছে এসে দাঁড়াতেই পেছনে বালুতে তার পায়ের মচমচ শব্দ শোনা গেল। আমি ফিরে তাকালাম না।
মৃদুকণ্ঠে সে বললো, আমি এখানে প্রভু।
স্যান্ডেলের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা লোকটাকে স্পর্শ করে বললাম, এই লোকটাকে চেন?
না প্রভু, লোকটির মুখ দেখতে পাচ্ছি না… সে বিড়বিড় করে বললো, তবে তার গলা কেঁপে গেল, বুঝলাম সে মিথ্যা বলছে। আমি নিচু হয়ে কেফায়ার এক প্রান্ত ধরে টান দিয়ে লোকটার মুখ থেকে তুলে নিলাম। আল নামজু আঁতকে উঠলো।
এবার আমি বললাম, এবার মুখটা দেখতে পাচ্ছো? কে সে?
কিছুক্ষণ নীরবতা, তারপর লোকটি হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো। আমাদের দিকে আর তাকাতে পারছিল না।
বল আল-নামজু, এই শুওরের মলটি কে? আমার রাগ আর তিক্ততার পরিমাণ বুঝাতে আমি ইচ্ছা করেই এই শব্দটা ব্যবহার করলাম।
বুড়ো লোকটি ফিসফিস করে বললো, সে আমার ছেলে হারুন।
সে কেন কাঁদছে, আল-নামজু?
আমি যে বিশ্বাস তার উপর রেখেছিলাম তা সে ভঙ্গ করেছে তাই কাঁদছে।
কীভাবে সে বিশ্বাসঘাতকতা করলো? সে শেয়াল আল-হাওয়াসাঈকে জানিয়ে দেয় কোথায় আমাদেরকে পাওয়া যাবে। তারপর ওদেরকে পথ দেখিয়ে পানির গুহার কাছে নিয়ে আসে।
এই বিশ্বাসঘাতকতার উপযুক্ত শাস্তি কী হওয়া উচিত আল-নামজু?
তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। আপনি হারুনকে মেরে ফেলুন প্রভু।
আমি তলোয়ারটা বের করে বললাম, না বুড়ো। আমি তাকে মারবো না। সে তোমার সন্তান। তুমিই তাকে হত্যা করবে।
সে ভয়ে পিছিয়ে গিয়ে বললো, আমি আমার নিজের ছেলেকে মারতে পারবো না প্রভু। এটা হবে অচিন্তনীয় খারাপ এবং ঘৃণ্য একটি কাজ। আমি আর আমার ছেলে অনন্তকাল শেঠের অন্ধকার নিম্ন জগতে দণ্ডিত হয়ে পড়ে থাকবো।
তুমি তাকে মেরে ফেল, তারপর আমি তোমার আত্মার জন্য প্রার্থনা করবো। তুমি তো জান আমার ক্ষমতা আছে। তুমি জানো দেবতাদের সাথে মধ্যস্থতা করার ক্ষমতা আমার আছে। হয়তো ওরা আমার প্রার্থনা শুনবেন। এই সুযোগটা তোমাকে নিতে হবে।
এবার সে নিঃশব্দে কাঁদতে কাঁদতে বললো, হে প্রভু, অনুগ্রহ করে এই ভয়ঙ্কর দায়িত্ব থেকে আমাকে রেহাই দিন। তার দাড়ি বেয়ে চোখের পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে আমার পায়ে চুমু খেল।
কিন্তু তার অনুনয় বিনয়ে আমার মন গললো না। আমি বললাম, পিতার হাতে মৃত্যুই তার উপযুক্ত শাস্তি। ওঠো আল-নামজু। তাকে মেরে ফেল, আর নয়তো আমি প্রথমে তোমার ঘোট দুই ছেলে তালাল আর মুসাকে মারবো। তারপর হারুন আর সবশেষে তোমাকেও হত্যা করবো। তোমার বাড়িতে আর কোনো পুরুষ থাকবে না। তোমাদের জন্য প্রার্থনা করার মতো কেউ বেঁচে থাকবে না।
সে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল, আমি তার হাতে আমার তরবারিটা ধরিয়ে দিলাম। সে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলো আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এরপর আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে চোখ নিচের দিকে নামাল।
আমি আবার জোর দিয়ে বললাম, চালাও এটা! সে দুই হাত দিয়ে মুখ থেকে চোখের পানি মুছলো। মন শক্ত করে চিবুক উঁচু করলো। তারপর আমার হাত থেকে তলোয়ার নিয়ে শক্ত হাতে বাঁটটা ধরলো। আমাকে পাশ কাটিয়ে হারুনের উপর এসে দাঁড়াল।
আবার আমি বললাম, চালাও! সে তলোয়ারটা উঁচু করলো তারপর আঘাত করলো একবার, দুবার এবং তিনবার। তারপর তলোয়ারটা মাটিতে ফেলে দিয়ে তার বড়ছেলের মৃতদেহের উপর লুটিয়ে পড়লো। ছিন্ন মুণ্ডটা বুকে চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো।
তলোয়ারটা তুলে আমি রক্তের দাগ লাশের দেহে মুছলাম। তারপর আমার উটের কাছে ফিরে গিয়ে উটের পিঠে চড়ে বসলাম। আল-নামজুকে তার পুত্র শোক করার সুযোগ দিয়ে আবার দস্যু শেয়ালের পেছনে ছুটার জন্য তৈরি হলাম।
আমার সমবেদনার অনুভূতি সমগ্র মানজাতিকে ঘিরে নেই। আর যারা আমার বিরুদ্ধে অপরাধ করে তাদের সব অপরাধের প্রতি আমি মহানুভবতা দেখাতে পারি না।
.
ভোরের প্রথম আলো দেখা দিতেই আমরা সেই জায়গায় পৌঁছলাম যেখানে দস্যু আল-হাওয়াসাঈ দ্বিতীয়বার তার দলকে বিভক্ত করেছিল। এবার সে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে সে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে প্রথমবার দুদলে বিভক্ত হওয়ার পরও আমি তার পিছু ছাড়িনি।
মাটিতে নেমে বেদুঈনদের সংখ্যাটা আন্দাজ করার চেষ্টা করলাম।
এবার এক দলে ছয়টি ঘোড়া আর অন্য দলে চারটি ঘোড়া রয়েছে। প্রতিটি ঘোড়ার পিঠে দুজন করে সওয়ারি ছিল। তার মানে মোট বিশজন লোক। এছাড়া পাঁচজন লোক হেঁটে চলছিল।
