এমন একটি সঙ্কটময় মুহূর্তে এই কথাটা কেন এখন আমার মনে পড়লো, বুঝে উঠতে পারলাম না। মন থেকে চিন্তাটা ঠেলে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করলাম। তারপরও স্মৃতিটা জেগে রইল। হঠাৎ একটি উত্তেজিত ভাবনা মনে জেগে উঠলো, এই রত্নটিই এখন তেহুতিকে পাইয়ে দেবে। তারপর বাতাসে ভেসে আসা একটি কণ্ঠস্বর আমি যা মনে মনে ভেবেছিলাম তা নিশ্চিত করলো।
হাথোরকে খুঁজো, তাহলে আমাকে পাবে।
এক লাফ দিয়েই দেখলাম, দস্যুরা যেখান থেকে দুদলে আলাদা হয়েছিল সেখানে তখনও আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি। এবার লক্ষ্য করে দেখলাম একটি দল উত্তরদিকে ঘুরে গেছে। আমি প্রথমে এইদিকেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ঘোড়ার খুরের ছাপের একপাশ দিয়ে ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলাম।
তেহুতি কিংবা হাথোরের কাছ থেকে পথ নির্দেশ পাওয়ার জন্য আমি আমার মনের ভেতরের অনুভূতি মেলে ধরলাম। তবে কিছুই অনুভব করলাম না। প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে সাথে হতাশা আর একাকীত্ব আমাকে গ্রাস করতে শুরু করলো।
ঘুরে আবার যেখান থেকে হাঁটা শুরু করেছিলাম সেদিকে চললাম। সাথে সাথে অপ্রীতিকর ভাবনাটা মন থেকে সরে যেতে লাগলো, যখন আগের জায়গায় পৌঁছলাম তখন খারাপ ভাবনাটা উবে গেল।
দস্যুদের দ্বিতীয় দলটি দক্ষিণদিকে গিয়েছিল, এবার সেই পথ ধরলাম।
প্রায় সাথে সাথে মনে একটি ইতিবাচক ভাবনা জেগে উঠলো। প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে সাথে মন হালকা হতে লাগলো আর অনুভব করলাম যেন একটি ছোট্ট উষ্ণ হাত আমার হাতের মুঠো চেপে ধরেছে। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলাম কিছুই নেই, কিন্তু আমার মনে স্থির বিশ্বাস ছিল, কেউ আমার পাশে থেকে আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে।
দৌড়ে সামনের দিকে একশো পা যাওয়ার পর দেখলাম সামনে মাটিতে কিছু একটা চক চক করছে। অর্ধেকটা হলুদ বালুতে চাপা পড়ে আছে, দেখেই সাথে সাথে জিনিসটা চিনতে পারলাম। হাঁটু গেড়ে বসে হাত দিয়ে আলগা বালু এক পাশে সরালাম। তারপর ছোট হলুদ সোনার টুকরাটি তুলে ঠোঁটে ছোঁয়ালাম।
ঘুরে জারাসের দিকে তাকালাম। সে তার উটের পাশে দাঁড়িয়ে আমাকে লক্ষ্য করছিল। এক হাত উঠিয়ে তাকে ডাকলাম। সাথে সাথে সে উটে চড়ে এক হাতে রশি ধরে আমার উটটা নিয়ে আসতে শুরু করলো।
উটের রশি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে সে বললো, আপনি কী করে নিশ্চিত হলেন যে, তেহুতি এই পথ দিয়েই গেছে?
তুমি এই ছোট্ট অলঙ্কারটা চেনো? তারপর হাতের মুঠো খুলে হাতের তালুতে দেবীর মাথাটা দেখালাম। সে নিঃশব্দে মাথা নাড়লো।
সে চিহ্ন হিসেবে এটা আমার জন্য রেখে গেছে।
সে শ্রদ্ধামিশ্রিত কণ্ঠে বললো, তিনি কী অপূর্ব মানুষ। এই পৃথিবীতে তার সাথে তুলনা দেবার মতো আর কোনো নারী নেই।
এরপর আমরা দুই ঘন্টা চলার পর বেদুঈনদের আরেকটা অচল ঘোড়া পথে পেলাম। মাথা নিচের দিকে ঝুলিয়ে ঘোড়াটা দাঁড়িয়ে রয়েছে, এক পাও চলতে পারছে না। পরিত্যক্ত করে ফেলে যাবার আগে এর আরোহী নির্দয়ভাবে এর পিঠে চাবুক মেরেছে। ঘোড়াটার পাছায় চাবুকের দাগ দেখা যাচ্ছে, আর ক্ষতস্থানগুলোতে রক্ত জমাট বেঁধে কালো হয়ে চকচক করছে।
আমি বললাম, এটাকে পানি দাও। জারাস নিজে নেমে একটা চামড়ার বালতিতে পানি ভরে সামনে এলো। একই সাথে আমিও নেমে পশুটির কাঁধের পেছনে অবস্থান নিয়ে দাঁড়ালাম। তারপর তলোয়ার বের করলাম। জারাস পানির পাত্রটি পশুটির মুখের কাছে ধরতেই এটি মুখ নামিয়ে দিল। কয়েক চুমুক পানি খেতে দিলাম, তারপর আমি দুইহাতে তলোয়ারটা ধরে মাথার উপর তুললাম। পশুটি তখনও পানি পানরত অবস্থায় সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রচণ্ড জোরে তলোয়ার তুলে একটা কোপ মারলাম।
কাটা মাথাটা দেহ থেকে আলাদা হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। তারপর হাঁটু ভেঙে দেহটাও মাটিতে লুটিয়ে পড়লো।
তলোয়ারের ধারালো পাতটার রক্ত ঘোড়ার কাঁধে মুছে নিয়ে জারাসকে বললাম, বাকি পানিটা নষ্ট করো না।
লক্ষ্য করলাম জারাস বাকি পানিটা মশকে ঢেলে রাখলো। নিজেকে ঠিক করে নিতে আমার কয়েকটি মুহূর্ত দরকার। আমার নির্দয় আঘাতের আগে ঘোড়াটি যে যন্ত্রণা ভোগ করছিল ঠিক একই রকম মানসিক যন্ত্রণা আমিও ভোগ করছিলাম। বিনা কারণে নিষ্ঠুরতা আর কাউকে যন্ত্রণা দেওয়াটা আমি অপছন্দ করি। যাইহোক বর্তমান পরিস্থিতিতে মনের এই ভাব চেপে রাখলাম।
সূর্য দিগন্ত ছুঁতেই আমরা পথে আরও তিনটা অচল ঘোড়া পার হলাম। আর বালুতে খুরের গভীর ছাপ দেখে বুঝতে পারলাম, কিছু আরব দস্যু এক ঘোড়ার পিঠে দুজন করে সওয়ার হয়েছে। অন্যরা হেঁটে চলেছে।
প্রতি ঘন্টায় আমরা আরও দ্রুত ওঁদের কাছাকাছি হচ্ছিলাম। সূর্যাস্তের পরও আমি অনুসরণ চালিয়ে গেলাম। পরিশেষে পূর্ণচন্দ্র এসে আমাদের পথ আলোকিত করলো। উজ্জ্বল রূপালি আলোয় আরবদের ফেলে যাওয়া খুরের ছাপ পরিষ্কার দেখা গেল। এবার আরও দ্রুত চলতে শুরু করলাম।
এরপর পথের ধারে আরও দুটো বিধ্বস্ত ঘোড়া পেলাম। তবে এবার আর ওগুলোর পেছনে সময় নষ্ট করলাম না। তারপর পথের মাঝখানে একটা মানুষের দেহ পড়ে রয়েছে দেখতে পেলাম। লোকটাকে দেখে পরিচিত মনে হচ্ছিল। আমি উট থামিয়ে নিচু হয়ে লক্ষ্য করলাম।
জারাস উদ্বিগ্ন কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো, সাবধান তায়তা, এটা একটা ফাঁদ হতে পারে। হয়তো সে মারা যাবার অভিনয় করছে। সম্ভবত হাতে একটা ছুরি ধরে রয়েছে।
