ঠিক সেই মুহূর্তে আমি বুঝলাম আমাদের তিনজনের জন্য এই পৃথিবী বদলে গেছে।
৪. শক্তিশালী উটগুলো
জারাস আর তার লোকজন শক্তিশালী উটগুলো নিয়ে আমার কাছে এলো। অল্পদূরত্বে বেদুঈনের ঘোড়াগুলো আমাদের উটগুলো থেকে এগিয়ে থাকলেও দুই তিন ঘন্টার বেশি তা পারবে না। তাছাড়া আমাদের উটগুলো সারাদিন বালুর উপর চলতে পারে। উটগুলো মাত্র পানি খেয়েছে। কাজেই আরও দশ কিংবা তার চেয়েও বেশি দিন পানি ছাড়া চলতে পারবে। এই পরিস্থিতিতে পানির পিপাসা, গরম আর পিঠে আরোহি নিয়ে বালুর উপর দিয়ে চলতে গিয়ে ঘোড়াগুলো কাল ভোরের আগেই নেতিয়ে পড়বে। অথচ উটগুলো আরও এক সপ্তাহ ছুটতে পারবে।
জারাস আসতেই তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিলাম। অস্ত্রসহ উট থেকে নেমে তার অর্ধেক লোককে হেঁটে গুহায় ফিরে যেতে বললাম। ওরা সেখানে বাকি দুই মেয়েদেরকে পাহারা দেবে।
জারাস বুদ্ধি করে প্রত্যেক উটের পিঠে পানি ভর্তি মশক নিয়ে এসেছিল। এর জন্যই তার আসতে দেরি হয়েছিল। এখন আমাদের অর্ধেক উট সওয়ারিহীন হল। এতে সুবিধামতো উটগুলোকে বিশ্রাম দেওয়া যাবে। জারাস আমাদের প্রধান পথ প্রদর্শক আল-নামজুকে সাথে নিয়ে আসায় আমি খুশি হলাম। তার চেয়ে ভালো কেউ এই পথ চিনতে পারবে না।
সবাই যার যার উটে চড়ে পেছন পেছন একটি করে খালি উট দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে রওয়ানা দিলাম। অতিরিক্ত পানির মশকগুলো থাকায় আমি একটু নিশ্চিন্ত হলাম।
সূর্যের অবস্থান দেখে সময় আন্দাজ করলাম। আর তিন ঘন্টা পর দেখলাম খুব একটা বেশি এগোতে পারিনি। একটু থেমে উট বদল করলাম আর প্রত্যেককে দুই মগ পানি খেতে দিলাম। তারপর আবার স্বাভাবিক গতিতে চলতে শুরু করলাম।
আরও দুই ঘন্টা চলার পর প্রমাণ পাওয়া গেল যে, আমরা পলাতকদের তুলনায় দ্রুতই চলছি। পথের পাশে দেখলাম দস্যু-শেয়ালের পরিত্যক্ত একটি ঘোড়া খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। আমাদের অগ্রগতি দেখে খুশি হলাম আর জারাসকে বললাম আশা করি রাতের আগেই ওদেরকে ধরে ফেলতে পারবো।
তবে আমার আন্দাজ সঠিক হল না। এটা বলার এক ঘন্টা পর আমরা দস্যুরা যেখানে দুটি অংশে ভাগ হয়েছে সেখানে পৌঁছলাম। জারাসকে বললাম, লোকদেরকে বল এবার একটু থেমে জিরিয়ে নিতে। প্রত্যেককে দুই মগ করে পানি দাও। তবে সাবধানে পিছিয়ে বসতে বল যেন পায়ের ছাপগুলো নষ্ট না হয়। আমি ওগুলো পরীক্ষা করবো।
অনুসরণ করার সময় সমান দুই ভাগে ভাগ হয়ে চলা বেদুঈনদের একটি পুরোনো কৌশল। এরপর দুটি দল আলাদা হয়ে দুই দিকে যাবে। এতে আমাদের বুঝা অসম্ভব হবে কোন দলটির সাথে তেহুতি রয়েছে। তাদের দুই দলের পিছু নিতে গিয়ে আমাদেরকেও বিভক্ত হতে হবে।
উট থেকে নেমে লাগামটি জারাসের হাতে দিয়ে হেঁটে সামনে এগোলাম। কিছুদুর যাওয়ার পর খুঁজে পেলাম, কোন জায়গায় ওরা দুই দলে আলাদা হয়েছে। দেখলাম ওরা ঘোড়া থেকে নামেনি। কাজেই তেহুতির পায়ের ছাপ খুঁজে পেলাম না। আমি আবার মাটিতে বসে দেবতার শরণাপন্ন হলাম।
হে মহান হোরাস, আমাকে দেখিয়ে দাও। এই দুর্বল অন্ধ চোখদুটো খুলে দিয়ে আমাকে পথ দেখাও। মিনতি করছি আমার দুচোখ খুলে দাও হে দেবী হাথোর। তোমার নামে আমি একটি বলি দেব।
চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ নিজের হৃৎস্পন্দন শোনার পর চোখ খুললাম। চারপাশে সাবধানে তাকালাম। কোনো স্বচ্ছ আলো এসে বালুকে আলোকিত করলো না, কোনো ছায়া নেচে নেচে এসে আমাকে পথ দেখাল না।
তারপর একটা গলার আওয়াজ শুনে কান খাড়া করলাম। তবে এটা ছিল বালিয়াড়ির মধ্য দিয়ে যাওয়া বাতাসের শন শন শব্দ। ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে বাতাসটাকে কানের পাশ দিয়ে যেতে দিলাম। তারপর মৃদু পরিষ্কার কণ্ঠস্বরটি শুনতে পেলাম।
তেহুতির কণ্ঠস্বর, হাথোর তোমাকে পথ দেখাবে। দ্রুত চতুর্দিকে তাকালাম, তবে তাকে দেখতে পেলাম না। চোখ বুজে অলৌকিক কিছু ঘটার জন্য অপেক্ষা করে রইলাম। নিঃশব্দে মাথা নত করে হাথোর দেবীর কাছে প্রার্থনা করতে লাগলাম।
হে দেবী হাথোর, তোমাকে এখন চাই। আমার আর তেহুতির দুজনেরই এখন তোমাকে প্রয়োজন।
অনেক বছর আগের একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। একদিন তেহুতি আর আমি নলখাগড়ার নৌকায় চড়ে পবিত্র নীল নদীর বুকে ভেসে বেড়াচ্ছিলাম। তার প্রথম রজঃদর্শনের দিনটিতে আমি তাকে যে উপহারটি দিয়েছিলাম, সেটা পেয়ে হাতে ধরে খুশিতে সে মৃদু হাসছিল। এটি ছিল একটি চমকার রত্ন যাতে আমি আমার সমস্ত ভালোবাসা আর কারিগরি ঢেলে দিয়েছিলাম। একটা চিকন হারের মাথা থেকে ভালোবাসা ও কুমারীত্বের দেবী হাথোরের ছোট্ট একটি শিংওয়ালা সোনালি মাথা ঝুলছে।
মৃদু মৃদু হেসে তেহুতি হারটা গলায় পরলো। তার বুকের মাঝখানে সোনালি মাথাটা ঝুলছিল আর দেবীর মাথাটাও আমার দিকে তাকিয়ে হেঁয়ালীপূর্ণ হাসি দিচ্ছিল।
তেহুতির কথাগুলো আমার মনে পড়লো, আমি এটা সবসময় পরে থাকবো তায়তা। যখনই এটা আমার চামড়ার সাথে লেগে থাকবে তখনই তোমার আর তোমার ভালোবাসার কথা আমার মনে পড়বে। আর তোমার প্রতিও আমার ভালোবাসা দিন দিন বেড়ে যাবে। সে কথা রেখেছিল। কয়েকদিন দেখা না হওয়ার পর যখন দেখা হত তখনই হারের মাথায় ঝুলন্ত লকেটটা দেখাত, তারপর ঠোঁটে ছোঁয়াত।
