লক্ষ বস্তুটি দ্রুত সরে যাচ্ছিল। আমি জানি আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তেহুতি আর দস্যুটি ধনুকের তীরের আওতার বাইরে চলে যাবে। বাম কাঁধ সামনে এগিয়ে লক্ষ্য স্থির করে, তীর ছোঁড়ার জন্য সঠিক ভঙ্গি নিয়ে প্রস্তুত হলাম। দিগন্তের উপরের দিকে চোখ তুলে আন্দাজ করতে চেষ্টা করলাম, তীরটি কতটুকু উঁচু করে ছুঁড়লে শেয়াল দস্যুর কাছে পৌঁছবে।
বুঝতে পারলাম তেহুতি আর আমার মাঝে শেয়ালের দেহটি তেহুতিকে আড়াল করে রেখেছে। অর্থাৎ তার অজান্তে তীরের আঘাত থেকে বাঁচার জন্য সে তার দেহটিকে তেহুতির জন্য ঢাল করে রেখেছে। এবার আমি নির্ভয়ে তেহুতিকে আঘাত না করে তীর ছুঁড়তে পারবো। গুণ টেনে ঠোঁটে ছোঁয়ালাম। আমার বাহু আর দেহের উপরের প্রতিটি পেশি গুণটানা ধনুকের প্রচণ্ড ওজনের ভারে টান টান হয়ে রয়েছে। খুব কম লোকই আমার ধনুকটি পুরোপুরি টানতে পারে। এটা শুধু পাশবিক শক্তির বিষয় নয়। এর জন্য দরকার সুনির্দিষ্ট ভঙ্গি, সঠিক ভারসাম্য আর ধনুকের সাথে একাত্ম হওয়ার মতো অনুভূতি অর্জন করা।
যখন আমি ধনুকের গুণ ধরে থাকা তিনটি আঙুল ছেড়ে দিলাম, এটা ঝটকা মেরে পেছন দিকে আমার বাহুর ভেতরের দিকে কেটে বসলো। সাথে সাথে ক্ষত স্থানটি থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করলো। আমি আঘাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য চামড়ার হাতবন্ধনী লাগাবার সুযোগ পাইনি।
কোনো ব্যথা অনুভব করলাম না। বরং উড়ে যাওয়া তীরের পিছু পিছু আমার হৃদয়ও ছুটে চললো। বুঝলাম নিখুঁতভাবে তীরটি ছুঁড়েছি। আমি জানি যে কুকুরটি তেহুতিকে অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে সে এখুনি মরবে।
তারপর হঠাৎ হতাশ হয়ে প্রচণ্ড আক্রোশে চিৎকার করে উঠলাম। লক্ষ্য করলাম লক্ষ্যবস্তুর ঠিক পেছন পেছন ছুটে চলা ঘোড়সওয়ারটি হঠাৎ লাইন থেকে সরে গেল। দেবতা হোরাস জানেন কেন সে এটা করলো, সম্ভবত পথে কোনো গর্ত এড়াবার জন্য সে এটা করেছে। কারণ যাই হোক সে আমার লক্ষ্যবস্তুকে আড়াল করে দিয়েছে। তাকিয়ে দেখলাম আমার তীরটা একটা ছো মারা বাজপাখির মতো তার পিঠের উপরের অংশে আঘাত করলো। সে পেছন দিকে মাথা ঘুরিয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠলো। হাত বাড়িয়ে তীরের ফলাটা ধরবার চেষ্টা করতে লাগলো। তবে এখনও সে আমার লক্ষ্যবস্তুকে আড়াল করে রেখেছে।
আরেকটি তীর ছুঁড়লাম এই আশায় যে, হয়তো আহত লোকটি ঘোড়া থেকে পড়ে যাবে আর আলহাওয়াসাঈর দেহ উড়ন্ত তীরের আওতায় এসে যাবে। তবে আহত আরব লোকটি লাগাম আঁকড়ে ধরে ঘোড়ার পিঠেই বসে রইল। তারপর দ্বিতীয় তীরটি তার ঘাড়ের পেছনে আঘাত করার পর তার নিশ্চল দেহ ঘোড়ার পিঠ থেকে মাটিতে পড়ে ধূলায় গড়াগড়ি খেতে লাগলো।
ইতোমধ্যে আল-হাওয়াসাঈ তীরের আওতার বাইরে চলে গেছে। আমি তার দিকে আরেকটি তীর ছুঁড়লাম, যদিও জানি এটা তাকে স্পর্শ করার সুযোগ পাবে না। নিজেকে আর সমস্ত অন্ধকারের দেবতাদের অভিসম্পাত করতে শুরু করলাম, যারা আল-হাওয়াসাঈকে আমার তীরের লক্ষ্য থেকে বাঁচিয়েছে। তীরটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তার ঘোড়ার বিশ কদম পেছনে মাটিতে পড়ে গেল।
আমার দুটো তীর বেঁধা মাটিতে পড়ে থাকা লোকটির দিকে আমি দৌড়ে গেলাম। সে মরার আগে তাকে দুএক ঘা দিয়ে তার কাছ থেকে তথ্য বের করতে হবে। কপাল ভালো থাকলে হয়তো যে লোকটি তেহুতিকে অপহরণ করেছে তার আসল পরিচয় আর কোথায় তাকে খুঁজে পাবো তা জানা যাবে।
তবে তা হল না। আমি পৌঁছার আগেই নামহীন লোকটি মারা গেল। একটা চোখ উল্টে শুধু সাদা অংশটা দেখা যাচ্ছে, আর অন্য চোখটি প্রচণ্ড আক্রোশে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তারপরও আমি দুইতিনবার লাথি কষালাম। তারপর লোকটির পাশে বসে হাথোর, ওসিরিস আর হোরাস দেবতার কাছে আকুল প্রার্থনা করতে লাগলাম যেন, আমি পৌঁছা পর্যন্ত তেহুতি নিরাপদ থাকে।
দেবতাদের বিষয়ে যে জিনিসটা আমি অপছন্দ করি তা হল যখন তাদের খুব প্রয়াজন হয় তখন তাদেরকে হাতের কাছে পাওয়া যায় না।
সেখানে বসে জারাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে মৃত দস্যুটির দেহ থেকে আমার তীরটি কেটে বের করলাম। পুরো মিসরে আমার তীরের ফলার মতো আর কোনটি নেই।
.
প্রায় এক ঘন্টা পর জারাস পৌঁছল। বেদুঈন দস্যুদলটি ইতোমধ্যে দিগন্তের ওপারে অদৃশ্য হয়ে গেছে। সাধারণত যে কোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আমি আমার আবেগ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি। এটা বলতে আমি বুঝাচ্ছি কোনো শহরকে ধ্বংস করা, শত্রু সেনাদলকে নিশ্চিহ্ন করা এ-ধরনের পরিস্থিতি ইত্যাদি। তবে তেহুতিকে হারিয়ে আমি ভীষণভাবে রেগে রয়েছি, আমার সারা শরীর কাঁপছিল। যত দেরি হচ্ছে ততই আমার আবেগ উথলে উঠে টগবগ করে ফেটে পড়ছে।
আমার সম্পূর্ণ রাগ জারাসের লোকদের উপর ঝাড়তে লাগলাম। ওরা ভিতু, কাপুরুষ, প্রয়োজনের সময়ে কোনো সাহায্য করতে পারলো না, এসব বলে চিৎকার করলাম।
তারপর দূরে জারাসের উটগুলো আসতে দেখে আর দেরি না করে ছুটে তার দিকে গিয়ে চিৎকার করে তাকে দ্রুত আসতে তাগাদা দিলাম।
সে কাছে আসতেই তিক্তকণ্ঠে তাকে তাড়াতাড়ি করতে বললাম, আবার সেও সমানভাবে চিৎকার করে তেহুতি কোথায় আছে, বেঁচে আছে কি না জানতে চাইল।
ঠিক তখনই আমি বুঝতে পারলাম এই দুই তরুণ হৃদয়ের মাঝে যা চলছে, তা সাময়িক কোনো ধরনের মোহ নয় এটা অন্য কিছু। এটি সেই একই ধরনের আবেগ আর ভালোবাসা যা আমি তেতির মা রানি লস্ট্রিসের ক্ষেত্রে অনুভব করতাম। আমি দেখলাম তেহুতিকে হারিয়ে জারাস যে-রকম শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছে, সে রকম আমিও এককালে তার মায়ের জন্য শোকাগ্রস্ত হয়েছিলাম।
