তারপর নিচে মাটির দিকে তাকাতেই বালুর উপর তার খালি পায়ের ছাপ চোখে পড়লো। দেয়ালঘেরা জায়গায় বাতাস পায়ের ছাপটি উড়িয়ে নিতে পারেনি। ছাপটা অনুসরণ করে সামনে তাকাতেই দেখলাম আরেকটু সামনে এগিয়েই ছাপটা আবার মুছে গেছে, তবে এবার বাতাসে মুছে যায় নি। বালুর উপর পুরুষ মানুষের স্যান্ডেলের মসৃণ তলির একাধিক ছাপ তার উপর পড়ে ছাপটা মুছেছে। বুঝা গেল না কতজন লোক, তবে মনে হল ১০/১২ জনেরও বেশি। এটা পরিষ্কার যে, এই লোকগুলো তেহুতিকে তাড়া করছে। যখন ওরা তাকে ধরবার চেষ্টা করেছিল, তখন সে নিশ্চয়ই লড়াই করেছিল। রেগে গেলে তেহুতি বন্য বেড়ালির মতো হয়ে যায়, তবে শেষ পর্যন্ত ওরা নিশ্চয়ই তাকে কাবু করে ফেলেছিল।
তাকে টেনে পাহাড়ের এই প্রান্ত পর্যন্ত নিয়ে আসে। এখানে পাহাড়ের চূড়ার গায়ে আরেকটা ফাটল দেখা গেল, তবে এটা আগেরটার মতো বেশি চওড়া কিংবা এতো খাড়াও নয়।
এটা অনেকটা একটা সিঁড়ির মতো, চিমনির মতো নয়। আমি সহজেই এটা বেয়ে উঠতে পারবো, তবে চূড়ায় উঠতে হলে উটের অন্য পথ খুঁজতে হবে। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম জারাস প্রথম উটে চড়ে আমার কাছাকাছি এসে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে চিৎকার করলো, কী হয়েছে তায়তা? আমাদের কী করতে হবে?
তেহুতিকে ধরে নিয়ে গেছে। ওরা হয়তো এখানে ওৎ পেতে ছিল। তেহুতি বাইরে ঘোরাফেরা করতেই ওরা তাকে তুলে নিয়ে যায়। তারপর উপরের দিকে চূড়ার ফাটলটার দিকে দেখিয়ে বলো, ঐখানে টেনে নিয়ে গেছে, আমাদের উটগুলো ওখানে উঠতে পারবে না।
এরা কারা? কোথা থেকে এসেছে?
জানি না জারাস। নিরর্থক প্রশ্ন করো না। পাহাড়ের নিচ দিয়ে গিয়ে উপরে উঠার একটা পথ খুঁজে বের করো। আমি এদিক দিয়ে সোজাসুজি ওদের পেছনে যাচ্ছি।
আমি আমার অর্ধেক লোক আপনার পিছু পিছু পাঠাব। আর অন্যদেরকে নিয়ে বিকল্প পথ দিয়ে উপরে উঠে আপনার সাথে দেখা করবো।
তার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে আমি উপরে উঠতে শুরু করলাম। শুনতে পেলাম পেছনে জারাসের লোকেরা আসছে। ওরা আমার চেয়ে বয়সে তরুণ হলেও আমি ওদের আগে আগে চলতে লাগলাম।
দেয়ালটি অর্ধেক চড়ার পর উপর থেকে মানুষের গলার আওয়াজ শোনা গেল। কয়েক সেকেন্ড থেমে শুনতে চেষ্টা করলাম। আরবি ভালো বলতে না পারলেও, কী বলছে তার সারাংশ বুঝতে পারি।
উপরের লোকগুলো বেদুঈন, ওরা দ্রুত চলার জন্য একজন আরেকজনকে তাড়া দিচ্ছে। তারপর তেহুতির অস্ফুট অর্তনাদ শুনতে পেলাম। যে কোনো পরিস্থিতিতে এই কণ্ঠস্বর আমি চিনতে পারি। : আমি চিৎকার করে উঠলাম, তেহুতি, ভয় পেওনা! আমি আসছি, জারাসও তার লোকজনসহ আসছে।
তার গলার আওয়াজ আমাকে তাড়না যোগাল। পূর্ণশক্তিতে আমি উপরের দিকে উঠতে শুরু করলাম। তারপর উপর থেকে ঘোড়ার জেষা ধ্বনি, মাটিতে খুরের শব্দ আর লাগামের টুংটাং শব্দ শুনতে পেলাম। লোকগুলো তাকে ঘোড়ার পিঠে চড়াচ্ছে।
তেহুতি আবার চিৎকার করে উঠলো, তবে আরবদের চেঁচামেচিতে তার কথা বুঝা গেল না। তারপর ঘোড়ার পিঠে চাবুক মারার শব্দ শোনা গেল। ঘোড়ার ফোঁস ফোঁস নিঃশ্বাস আর নরম বালুতে খুরের থপথপ শব্দ শোনা গেল।
বুঝতে পারলাম দস্যুরা এখানেই তাদের ঘোড়াগুলো বেঁধে রেখে গিয়েছিল। ওরা জানতে এখানে ওরা দ্রুত ফিরে আসতে পারবে, অথচ উটে চড়ে অন্য পথ দিয়ে আসতে আমাদের অনেক সময় লাগবে।
শেষ কয়েক গজ হুমড়ি খেয়ে চললাম, তারপর চূড়ার কিনারায় পৌঁছে। একটু থেমে পরিস্থিতিটা বুঝার চেষ্টা করলাম।
আমার সামনেই রোদে পোড়া ধূলিময় পোশাক আর মাথায় কেফায়া পরা ত্রিশ চল্লিশ জন আরব বেদুঈন দাঁড়িয়ে রয়েছে। বেশিরভাগই ইতোমধ্যে ঘোড়ায় চড়ে বসেছে আর অন্যান্যরা ছুটে চলেছে। বন্য চিৎকারে ওরা একে অন্যকে বিজয়ীর সুরে তাড়া দিচ্ছে।
একজন দস্যু তখনও তেহুতির সাথে ধস্তাধস্তি করছিল। সে তেহুতিকে ঘোড়ার জিনের সামনে উপুড় করে শুইয়ে নিজে তার পেছনে উঠেছে। শক্তিশালী দেহের অধিকারী লোকটির কালো কোঁকড়ানো দাড়ি। শেয়াল ওরফে ডাকাত আল-হাওয়াসাঈর চেহারার যে বর্ণনা আল-নামজুর কাছ থেকে শুনেছিলাম, তার সাথে এর চেহারা বেশ মিলে যায়। তবে আমি নিশ্চিত হতে পারলাম না, এই সেই লোক কি না।
তেহুতি দুই পা ছুঁড়ে চিৎকার করছিল, তবে লোকটি বেশ সহজেই এক হাত দিয়ে তার দুই হাত ঘোড়ার জিনের উপর চেপে রেখেছে। দেখলাম তার। পোশাক আর চুল তখনও জলাধারের পানিতে ভেজা।
পেছনে তাকিয়ে সে চূড়ার কিনারায় আমাকে দেখতে পেল আর সাথে সাথে আশায় তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। আমি তার ঠোঁট নাড়া দেখে বুঝতে পারলাম সে আমার নাম উচ্চারণ করছে।
তাতা! আমাকে বাঁচাও!
মুক্ত হাতে ঘোড়ার লাগাম ধরে দস্যুটি ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে পেটে গুঁতো দিয়ে ঘোড়াটিকে পাথুরে পথের উপর দিয়ে ছুটাতে শুরু করলো। একবার পেছন ফিরে আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে বিজয়ীর হাসি দিল। এখন আমি নিশ্চিত হলাম এই লোকই শেয়াল। আমার কেন জানি মনে হল সে আগে থেকে জানতো যে, আমরা ময়াগুহায় আসবো।
তার দলটি চতুর্দিক দিক থেকে ঘিরে তাকে অনুসরণ করলো। আমি গুণতে পারলাম না ওরা কজন। এভাবে ওদেরকে চলে যেতে দেখে রাগে আমার সারা শরীর জ্বলে উঠলো।
দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে কাঁধ থেকে লম্বা ধনুকটা নামিয়ে হাতে নিলাম। তিনটি দ্রুত প্রক্রিয়ায় ধনুকের গুণ টেনে সোজা করে তূণীর থেকে একটা তীর বের করে নেবার জন্য পেছনে হাত বাড়ালাম।
