গুহায় না ঢুকে পাহাড়ের একপাশ দিয়ে ঘুরে বিপরীত দিকে চললাম। গুহা মুখের কাছ থেকে সরে আমি পেছন দিকে এমন একটা জায়গায় এলাম যেখানে খাড়া পাহাড়ের গায়ে আরেকটি ফাটল দেখা গেল। এই ফাটলটা আগে দেখিনি। এক মুহূর্ত এটা পরীক্ষা করে ভাবলাম পাহাড়ের চূড়ায় উঠে দেখা যাক অন্য পাশে কী আছে। হাত বাড়িয়ে সামনে পাহাড়ের গায়ে হাত রাখলাম।
সূর্যের তাপে পাহাড়ের পাথর এতো গরম হয়ে রয়েছে যে, মনে হল জ্বলন্ত কয়লার উপর হাত রেখেছি। তাড়াতাড়ি ছ্যাকা লাগা হাতটা সরিয়ে নিতেই হাত থেকে পাখির মাথার খুলিটা নিচে পড়ে গেল। ছ্যাকা লাগা আঙুলটা চুষতে চুষতে পাখির মাথার খুলিটা নেবার জন্য হাত বাড়িয়েই থেমে গেলাম।
একটা পায়ের ছাপ, তবে আমার মেয়েদের কারও পায়ের ছাপ নয়। মসৃণ চামড়ার তলিওয়ালা স্যান্ডেল পরা একজন বড় পুরুষ মানুষের পায়ের ছাপ। এখনও পেছন থেকে মেয়েলি গলার আওয়াজ আর হাসিঠাট্টা আর জারাস আর তার লোকজনের কথা বলার অস্পষ্ট শব্দ শোনা যাচ্ছে। ঘুরে দাঁড়িয়ে এমন একটি জায়গায় দাঁড়ালাম, যেখান থেকে গুহামুখের সামনে দাঁড়ান আমাদের লোকদের দেখা যায়। এক ঝলক তাকিয়েই যা জানতে চেয়েছিলাম, তা নিশ্চিত হলাম। আমাদের সব লোকেরা সামরিক বিধিসম্মত পিতলের গজালখচিত তলিওয়ালা স্যান্ডেল পরে রয়েছে।
তার মানে আমাদের মাঝে একজন আগন্তুক রয়েছে।
আমার পরবর্তী চিন্তা হল মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে। ঘাড় ফিরিয়ে গুহার ভেতর থেকে মেয়েদের কথা বলার আওয়াজ শুনতে চেষ্টা করলাম। দুটো কণ্ঠ সাথে সাথে চেনা গেল, তবে তৃতীয়টি চিনতে পারলাম না। লোকদেরকে কিছু বুঝতে না দিয়ে ওদের পাশ কাটিয়ে গুহায় ঢুকলাম। পিছল পাথরের মেঝে বেয়ে দ্রুত জলাধারের কাছে পৌঁছলাম। অন্ধকার সয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটু অপেক্ষা করে তাকিয়ে দুটো মেয়ের ফ্যাকাশে রমণীয় শরীর আবছা দেখতে পেলাম। ওরা পানি নিয়ে খেলছে। তবে শুধু দুজনকে দেখা গেল।
আমি চিৎকার করে উঠলাম, বেকাথা! তেহুতি কোথায়?
পানি থেকে মাথা তুলে সে বললো, সে শেঠ দেবতার কাছে অর্ঘ্য দিতে গিয়েছে, তাতা! লাল-সোনালি চুলগুলো তার মুখে লেপ্টে রয়েছে।
দৈহিক নিত্যকার ক্রিয়াকর্ম অর্থাৎ মলমুত্র ত্যাগ করার কথা বলতে গিয়ে ওরা এ-ধরনের মেয়েলি ভাষা ব্যবহার করতো।
কোন দিকে গিয়েছে?
আমি দেখিনি। সে শুধু জানাল সে এটা করতে বাইরে যাচ্ছে।
তেহুতি একটু খুঁতখুঁতে স্বভাবের মেয়ে। আমি জানি এ-ধরনের শারীরিক ক্রিয়াকর্ম করার জন্য সে গোপন জায়গায় যাবে। এজন্য নিশ্চয়ই তার গুহার ভেতরে থাকার কথা নয়। নিশ্চয়ই বাইরে মরুভূমিতে গিয়েছে। আমি গুহামুখের কাছে ছুটে গেলাম। জারাস তার লোকজনসহ গুহামুখের বামদিকে জটলাবেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাইরে পৌঁছেই আমি চিৎকার করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, রাজকুমারী তেহুতিকে গুহা থেকে বের হতে দেখেছ?
না, প্রভু।
আর কেউ দেখেছে? তোমরা কেউ তাকে দেখেছ? সবাই মাথা নাড়লো।
তেহুতি হয়তো ওদেরকে এড়িয়ে গেছে, মনে মনে ভাবলাম। ঘুরে পেছন দিকে যেখানে নতুন পায়ের ছাপটা দেখেছিলাম সেদিকে ছুটলাম।
মিনতিভরে দেবতার কাছে প্রার্থনা করলাম, হে হোরাস, দয়া কর আমাকে! তারপর মনপ্রাণ দিয়ে দেবতার কাছে প্রার্থনা করতে শুরু করলাম, আমার চোখ খুলে দাও, হে হোরাস। আমাকে দেখিয়ে দাও। হে আমার প্রিয় দেবতা, আমাকে দেখতে দাও!
কয়েকটি মুহূর্ত শক্ত করে চোখ বন্ধ করে রইলাম। তারপর যখন চোখ খুললাম, আমার দৃষ্টিশক্তি উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। মহান দেবতা হোরাস আমার প্রার্থনা শুনেছেন। আমি আমার অন্তর্চক্ষু দিয়ে দেখতে লাগলাম। চারপাশের রঙ আরও পরিষ্কার হল, আকৃতিগুলো আরও ধারালো হয়ে উঠলো।
পাহাড়ের দেয়ালের নিচের দিকে তাকিয়েই আমি তাকে দেখতে পেলাম। এটা তেহুতি নয়, তবে একটু আগে যেখানে সে ছিল এটা তার স্মৃতি। অনেকটা তার নিজের প্রতিধ্বনি কিংবা ছায়া। উজ্জ্বলতার পাশে একটু ময়লা দাগ, ধরা-ছোঁয়া যায় না এমন একটি ছোট মেঘ। এমনকি একজন মানুষের আকৃতিও নয়, কিন্তু আমি জানি এটা সে। নেচে নেচে দূরে চলে যাচ্ছে।
হঠাৎ আমার মনে হল তাকে কেউ তাড়া করছে, আর সে বিপদ থেকে বাঁচার জন্য চেষ্টা করছে। আমার বুকের মাঝে তার আতঙ্ক আমি অনুভব করতে পারলাম।
গর্জে উঠলাম, জারাস, অস্ত্র হাতে নাও! পাঁচজনকে বেকাথা আর লক্সিয়াসের পাহারায় রেখে বাকিদের নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে আমার পিছু পিছু এস!
জানি জারাস আমার কথা শুনেছে, তাই আর পেছন দিকে না তাকিয়ে সোজা তেহুতির যে ছায়া অনুভব করেছিলাম, সেদিকে ছুটলাম।
হঠাৎ আমার দুই পায়ে যেন পাখনা গজাল। আমি দ্রুত থেকে দ্রুততর বেগে ছুটতে লাগলাম। কিন্তু ছোট্ট মেঘটিও আমার দৌড়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আমাকে এর পথে গ্রাস করে নিয়ে চলেছে। হঠাৎ সামনে যেখানে রেখাঙ্কিত দেয়ালটা ঘুরেছে সেখানে এটা অদৃশ্য হয়ে গেল।
উজ্জ্বল দীপ্তিটা আমার চোখ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমার পা ভারী হয়ে চলার গতি কমে এলো। যে জায়গাটি থেকে সে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল খুব চেষ্টা করে সেখানে পৌঁছলাম। সেখানে পৌঁছেই দম নিতে লাগলাম।
পাগলের মতো চারপাশে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পেলাম না।
