তেহুতি সোৎসাহে বললো, কী বিশাল। জারাস তাকে ভালোভাবে চেনে, সে বুঝতে পারেনি যে তেহুতি না জানার ভান করছে। এটি নিশ্চয়ই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাগর?
জারাস তার ভুল সংশোধন করে অত্যন্ত সম্মানের সাথে বললো, না রাজকুমারী। এটা সমস্ত সাগরের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। মধ্যসাগর সবচেয়ে বড় আর জ্ঞানী ব্যক্তিরা অনুমান করে বলেছেন, বিশাল অন্ধকার মহাসাগর, যার উপর পৃথিবী ভাসছে তা আরও বড়।
তেহুতি চোখ বড় বড় করে প্রশংসার দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে, ক্যাপ্টেন জারাস, আপনি তো অনেক কিছু জানেন, প্রায় প্রভু তায়তার মতো। আপনাকে প্রতিদিন কয়েক ঘন্টা বেকাথা আর আমার সাথে ঘোড়ায় চড়ে এসব বিষয় জানাতে হবে।
তেহুতিকে এতো সহজে তার মত থেকে ফেরানো সম্ভব নয়।
.
আরব মরুভূমি পাড়ি দেওয়া গত বছরের তামিয়াত দুর্গের অভিযানের চেয়ে অনেক কষ্টকর আর দুর্গম প্রমাণিত হল। সেবারের অভিযানে দুশো জনের চেয়ে কম লোক নিয়ে দ্রুত কম লটবহর নিয়ে গিয়েছিলাম। মিসর আর সিনাই উপদ্বীপের মাঝে কেবল সুয়েজ উপসাগর পার হতে হয়েছিল। সেটা পঞ্চাশ লিগের চেয়ে কম চওড়া ছিল।
এবার আমাদেরকে সিনাই উপদ্বীপে না ঢুকে যতদূর সম্ভব দক্ষিণ দিক দিয়ে যেতে হচ্ছে। সিনাই উপদ্বীপে ঢুকলে গোরাব তার রথি বাহিনী পাঠিয়ে আমাদেরকে বাধা দিতে পারতো।
বাধ্য হয়েই আমাদেরকে লোহিত সাগরের মূল অংশের সবচেয়ে চওড়া জায়গা দিয়ে পার হতে হচ্ছে। পঞ্চাশটি ভোলা ধাউয়ে এক হাজারের বেশি মানুষ আর পশু নিয়ে প্রায় দুশো লিগের চেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ছোট নৌকাগুলোতে এক সাথে কেবল দশটা উটের জায়গা হয়। এতে বেশ কয়েকবার পারাপার করতে হবে।
সমস্তু কিছু বিবেচনা করে আমি ধারণা করেছিলাম পুরো কাফেলা আরবে নিতে আমাদের কমপক্ষে দুইমাস লাগবে।
রাজপরিবারকে মিসরীয় তীরে রেখে কাফেলার মূল অংশ সাগর পার হতে শুরু করলো। অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানতাম রাজকুমারীদেরকে যাতে একঘেয়েমিতে পেয়ে না বসে সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে, কিংবা ওদের হাতে বেশি অবসর সময়ও দেওয়া যাবে না।
রাজপরিবারকে কাফেলার বাদবাকি অংশ থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছিল। আমাদের কাফেলাটি আকারে একটি ছোট গ্রামের মত হলেও এখানে একটি বড় শহরের সবধরনের সুবিধা আর আরাম আয়েশ ছিল।
কয়েকদিন পর পর রাজকুমারীদের নিয়ে আমি শিকারে যেতাম। আমরা মরুভূমির চ্যাপ্টা পায়ের ছোট হরিণ শিকার করতাম কিংবা পাহাড়ে উঠতাম, যেখানে দীর্ঘ বাঁকানো শিংয়ের পাহাড়ি বুনো ছাগলের বিচরণ ছিল। এগুলোতে বিরক্তি ধরে গেলে মেয়েরা সাগরতীরে ঝাঁক বেঁধে থাকা অসংখ্য বুনো হাস আর রাজহংসির উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিকারি বাজ উড়িয়ে দিত।
অনেকসময় ছোট দ্বীপে বনভোজনের আয়োজন করতাম। মেয়েরা সেখানে সাঁতার কাটতে কিংবা পানির নিচে প্রবাল জঙ্গলে তলোয়ার মাছ আর বড় সামুদ্রিক মাছের উপর বর্শা ছুঁড়ে শিকার করতো।
তবে সকালে আমি ওদেরকে পড়াশুনা করতে বাধ্য করতাম। কাফেলার সাথে দুজন পণ্ডিত নিয়ে এসেছিলাম, যারা ওদেরকে লেখা, গণিত আর জ্যামিতি শেখাত। শ্রেণীকক্ষের কঠিন অধ্যয়নের ফাঁকে ফাঁকে আমোদ ফুর্তি আর মেয়েলি হাসি ঠাট্টাও চলতো। সারাদিনে এটাই ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় সময়। ওরা লক্সিয়াসের সাথে মিনোয়ান ভাষায় আড্ডা দিত। আমাকে বাদ দিত যেন আমি এই ভাষার একটি শব্দও বুঝি না। তিন জনের মধ্যে বয়সে লক্সিয়াস সবচেয়ে বড় হওয়ায় সে ওদের মেয়েলি নিষিদ্ধ আলাপগুলোতে সবজান্তা ভূমিকা পালন করতো। তবে পরিষ্কার বোঝা যেত তার সমস্ত বিদ্যা ছিল পুঁথিগত, তাই বিশদ বিবরণগুলো সে বানিয়ে বানিয়ে বলতো।
এইসব আলোচনার মধ্য দিয়ে আমি ওদের মনে কী ভাবনা চলছে তা জানতে পারতাম।
ওরা ওদের ভালোবাসার গল্প বলতো। লক্সিয়াস রেমরেমকে পছন্দ করতো। তবে তার সামনে হাজির হলে সে একেবারে পাথরের মূর্তির মতো হয়ে যেত। চোখ নামিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় লাল হয়ে যেত, মুখে কোনো কথা যোগাত না। আমার মনে হয় রেমরেম রাজকীয় পরিষদের একজন সম্মানিত-সদস্য আর সে নিজে একজন সাধারণ মানুষ এবং বিদেশি, এই সত্যটুকু তার মনে সম্ভ্রম মিশ্রিত ভয় জাগিয়ে তুলতো। তবে রেমরেম যে বয়সে তার চেয়ে দ্বিগুণ বড়, তিনটে বউ আছে আর তার অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসিন এতে সে কিছু মনে করতো না।
এদিকে বেকাথা বিখ্যাত ঘোড়সওয়ার আর রথি হুইয়ের প্রতি আকৃষ্ট ছিল। সে মোটেই জানতো না যে, যখন তাকে আমি বন্দী করেছিলাম, তখন সে কুখ্যাত অপরাধি বস্তির রক্তের সম্পর্কের ভাই ছিল। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করে তাকে সভ্য করে তুলেছিলাম। কিন্তু তারপরও অনেক সময় সে বর্বরোচিত আচরণ করতো, বিশেষত কৌতুক করার সময়। বেকাথা তার সাথে রথে চড়তে ভালোবাসতো। যখন সে এবড়োথেবড়ো জমির উপর দিয়ে রথ চালিয়ে নিয়ে যেত, তখন সে দুহাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করতো। ওরা অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের অর্থহীন রসিকতা করে হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়তো। আর অনেক সময় ভোজ টেবিলে বসে খাওয়ার সময় বেকাথা তার দিকে রুটির টুকরা কিংবা ফল ছুঁড়ে মারতো।
তেহুতি এসমস্ত থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতো আর কেউ এ বিষয়ে তাকে চাপাচাপি করতো না।
