সন্ধ্যায় আমরা বিভিন্ন রকম ধাঁধা, কবিতা, গান গেয়ে আর বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সময় কাটাতাম।
এভাবেই আমার তত্ত্বাবধানে থাকা এই তিন বালিকাকে আমি বিপজ্জনক কোনো কিছু করা থেকে বিরত রেখেছিলাম। শেষ পর্যন্ত মূল কাফেলা সাগর পার হওয়ার পর আমাদের যাওয়ার সময় এলো।
আথির মাসের পনেরোতম দিনে সূর্য উঠার আগে আমরা সাগর সৈকতে সমবেত হলাম। তেহুতি আর বেকাথার সাহায্যে তিন নারী-পুরোহিত হাথোর দেবীর উদ্দেশ্যে একটি সাদা ভেড়া বলি দিল।
দেবীর কাছে আমরা প্রার্থনা করলাম–যদি তিনি আমাদের প্রতি সদয় হোন এবং নিরাপদে সাগর পার করে দেন তাহলে আমরা তার উদ্দেশ্যে একটি উট বলি দেবো। এই মানতের পর আমরা ধাউয়ে চড়ে রওয়ানা হলাম।
দেবী নিশ্চয়ই আমাদের প্রার্থনা শুনেছেন মিসরের দিক থেকে একটি দমকা হাওয়া পালে লেগে আমাদের নৌবহরকে দ্রুত ভাসিয়ে নিয়ে চললো। সূর্য অস্ত যাওয়ার আগেই আফ্রিকা আমাদের পেছনে ঢেউয়ের নিচে মিলিয়ে গেল।
অন্ধকার হতেই প্রতিটি জাহাজের মাস্তুলের ডগায় একটা করে তেলের প্রদীপ জ্বালিয়ে দেওয়া হল, যাতে একে অপরকে দেখতে পারি। আকাশের তারা দেখে পথ ঠিক রেখে আমরা পুবমুখি চলতে লাগলাম। ভোর হতেই দূরে পরিষ্কার নীল আকাশের বিপরীতে আরবের তটরেখা নজরে পড়লো। সারাদিন দাঁড় বেয়ে চলার পর যখন সূর্য পশ্চিম দিগন্তের এক হাত উপরে এসে দাঁড়িয়েছে, তখন কুমিররক্ষীবাহিনীর পঞ্চাশজন সদস্য হাঁটু পানিতে নেমে ধাউগুলো টেনে সৈকতের শুকনো বালুভূমিতে নিয়ে তুললো। মেয়েরা তাদের সুন্দর ছোট ছোট পা না ভিজিয়ে এশিয়ার মাটিতে পা রাখতে পারলো। আমাদের অভ্যর্থনা জানাবার জন্য আমার পূর্বনির্দেশ মতো রাজকীয় শিবির উঁচুভূমিতে স্থাপন করা হয়েছিল।
তবে এখানে বেশি দেরি করলাম না, কেননা প্রতিদিন প্রচুর মূল্যবান সুপেয় পানি খরচ হচ্ছিল।
মূল কাফেলাটি আর মালপত্র বেশ কয়েকদিন আগেই চলে গেছে। ইতোমধ্যে ওরা নিশ্চয়ই একশো লিগেরও বেশি দূরত্ব পার হয়েছে। আরবভূমিতে নামার পরদিন আমরা ঘোড়া আর উটে চড়ে রওয়ানা দিলাম।
.
সাগর থেকে যতই দূরে এগিয়ে চললাম, ততই সূর্য মাথার উপর প্রচণ্ড তাপ ছড়াতে শুরু করলো। দূপুরের রোদে চলা খুবই কষ্টকর হয়ে দাঁড়াল। এরপর থেকে আমরা শেষ বিকেলের দিকে যখন সূর্যের তাপ কমে আসে তখন চলতে লাগলাম। সারারাত চলার পর ঘোড়া আর উটগুলোকে পানি দেওয়ার জন্য মধ্যরাতে কেবল এক ঘন্টা থামলাম। মূল কাফেলা থেকে পথের পাশে এগুলো আমাদের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছিল। তারপর আবার ভোরে সূর্য ওঠার পর চলতে লাগলাম। এরপর যখন দুপুরের দিকে সূর্যের তাপ অসহনীয় হয়ে উঠলো, তখন আবার সেখানেই তাঁবু গেড়ে ছায়ার নিচে শুয়ে ঘামতে লাগলাম। সূর্য অস্তাচলে নামতেই আবার যাত্রা শুরু করতাম। এভাবেই চক্রাকারে চলতে লাগলো।
পনেরো দিন আর রাত এভাবে চলার পর, শেষ পর্যন্ত মূল কাফেলার কাছে এসে পৌঁছলাম। ইতোমধ্যে চামড়ার পানির মশকগুলো অর্ধেকেরও বেশি খালি হয়ে এসেছে। শুধু তলানিতে কয়েক গ্যালন সবুজ রঙের কটু স্বাদের পানি পড়ে রয়েছে। আমি জনপ্রতি প্রতিদিন বাধ্যতামূলক চার মগ পানি বরাদ্দ করলাম।
এবার আমরা আসল মরুভূমিতে ঢুকেছি। সামনে একের পর এক অসংখ্য বালিয়াড়ি যতদূর দেখা যায় চলে গেছে। আমাদের ঘোড়াগুলোর মধ্যে নিদারুণ যন্ত্রণার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। পিঠে খুব হালকা ভার নিলেও নরম বালিতে পা ডেবে গিয়ে ঘোড়াগুলোর চলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি ঘোড়াগুলো আরোহী মুক্ত করে অন্যান্য মুক্ত ঘোড়ার দলের সাথে কাফেলার সামনের দিকে পাঠিয়ে দিলাম। আর কয়েকটি শক্তিশালী উট বেছে নিয়ে মেয়েদেরকে আর দলের অন্যান্যদেরকে তাতে চড়তে বললাম।
আল-নামজু আমাকে নিশ্চিত করলো সামনের পানির উৎসটি আর মাত্র কয়েকদিনের পথ। কাজেই আমি মেয়েদেরকে নিয়ে জারাস আর তার দলের লোকদের সাথে নিয়ে পানির কাছে পৌঁছাবার জন্য মূল কাফেলা ছেড়ে আগে আগে চলতে শুরু করলাম।
আমাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবার জন্য আল-নামজু তার বড় ছেলে হারুনকে সাথে দিয়েছিল। মূল কাফেলা থেকে দ্রুত এগিয়ে আমরা সারারাত চললাম, তারপর ভোরের প্রথম আলো দেখা দিতেই হারুন বিশাল একটি লাল ইট রঙা বালিয়াড়ির উপরে এসে থেমে দাঁড়াল। তারপর সামনের দিকে হাত তুলে দেখাল।
সামনেই একটা পাহাড়ের চূড়া দেখা গেল। লম্বা লম্বা দাগযুক্ত পাহাড়টির অনুভূমিক স্তরগুলো ছিল বিভিন্ন রংয়ের, সোনালি থেকে শুরু করে চকের মতো সাদা তারপর লাল, নীল আর কালো। কয়েকটি স্তর বাতাসে ক্ষয়ে গিয়ে অন্যান্য স্তর থেকে আরও গাঢ় রং ধরেছে। এগুলো কতগুলো ঝুল বারান্দা আর গভীর দীর্ঘ গুহা তৈরি করেছে, যা দেখে মনে হচ্ছে যেন একজন উন্মাদ স্থপতি এগুলো তৈরি করেছে।
হারুন জানাল, এর নাম ময়াগুহা। আরবি এই নামটি অনুবাদ করে আমি বুঝলাম এর নাম, পানির গুহা।
হারুন আমাদেরকে এই খাড়া পাথুরে দেয়ালের নিচে নিয়ে গেল। একেবারে গোড়ায় এক পাশে একটা নিচু ছাদওয়ালা ফাটল চলে গেছে। একজন লম্বা মানুষ বাঁকা না হয়েও ঢুকতে পারবে, তবে একশো কদমের বেশি চওড়া আর গভীর। আর এমন অন্ধকার যে, আমি উপর থেকে দেখে বুঝতে পারলাম না এটা কতদূর পর্যন্ত চলে গেছে।
