আমার প্রতি জারাসের বিশ্বস্ততা আর কার হাতে পূর্ণ কর্তৃত্ব রয়েছে, তা তেহুতিকে মনে করিয়ে দেবার চেষ্টা করতে দেখে আমি খুশি হলাম। সে বেচারা এখন তেহুতির কাছ থেকে পালিয়ে আসার জন্য ছটফট করছে।
তার মাথার উপর আঘাত হানা এই রাজকীয় ঝড়ের তাণ্ডব থেকে তাকে উদ্ধার করার চেষ্টা থেকে আমি নিজেকে বিরত রাখলাম। তার কোনো নির্দেশ অমান্য হোক, তেহুতি তা মোটেই সহ্য করে না। তবে সে আবার আমাকে অবাক করলো। জারাসকে থামিয়ে না দিয়ে সে বরং মৃদৃ হেসে মাথা নেড়ে বললো, অবশ্যই তাই করুন ক্যাপ্টেন জারাস। একজন সৈনিক হিসেবে আপনার দায়িত্ব আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
জারাস আমার পাশে আসতেই আমি একটু পিছিয়ে রাজকুমারীদের কাছ থেকে একটু দূরে সরে এলাম, যাতে ওরা আমাদের কথা শুনতে না পারে। টিলার নিচেই সাগরের তীরে সাগাফার দালানকোঠাগুলো দেখা যাচ্ছে।
আমার ইঙ্গিত পেয়ে জারাস গলা নামিয়ে জানাল যে, আমাদের জন্য অপেক্ষা করার সময় সে সুযোগ পেয়ে একটি দ্রুতগামি ধাউ নিয়ে দূরের সাগর সৈকতে এলো–কুম জেলে পল্লীতে গিয়েছিল। সেখানে গিয়ে সে নিশ্চিত হতে চাচ্ছিল যে, আমাদের বেদুঈন পথপ্রদর্শক আমাদের নির্দেশ পেয়ে তার লোকজন নিয়ে আমাদেরকে আরব মরুভূমি পার করাবার জন্য অপেক্ষা করছে কি না।
সে একই লোক আল-নামজু, যে আমাদেরকে সিনাই উপদ্বীপ পার করে মধ্য সাগরের তীর আর তামিয়াত দুর্গে নিয়ে গিয়েছিল।
জারাস খুশি হয়ে বললো, আপনি জেনে খুশি হবেন যে, আমাদের আসার খবর পাওয়ার পর গত দুই মাস ধরে আল-নামজু এখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তার সাথে তার দুই ছেলেও রয়েছে। তবে সে তাদেরকে সামনে কাফেলা চলার পথে পানির উৎস আর মরুদ্যানগুলো দেখতে পাঠিয়েছে।
আমি তাকে বললাম, শুনে আস্বস্ত হলাম। তারপর এক পাশে তাকিয়ে আবার বললাম, বলে যাও জারাস। মনে হয় তোমার আরও কিছু বলার আছে। সে একটু চমকে তাকাল।
তারপর বললো, আপনি কী করে জানলেন… তার কথা থামিয়ে দিয়ে আমি বললাম, আমি কীভাবে জানলাম? আমি এজন্য জেনেছি যে, আমি জানি তুমি কোনো কথা লুকিয়ে রাখতে পারো না। এটাকে একটা দোষের চেয়ে বরং আমি গুণ বলবো।
সে মাথা নেড়ে বললো, আমরা অনেকদিন ধরে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছি প্রভু। আমি ভুলে গিয়েছিলাম কীভাবে আপনি মানুষের মনের ভাবনা পড়তে পারেন। তবে আপনার কথাই ঠিক। আমি আরেকটি বিষয় আপনাকে বলতে যাচ্ছিলাম, তবে ভয়ও পাচ্ছিলাম, হয়তো আপনি মনে করতে পারেন যে, আমি শুধু শুধু আতঙ্কে ভূগছি।
আমি তাকে নিশ্চিত করে বললাম, তোমার কোনো কথাই আমাকে এ ধরনের ধারণা করতে দেবে না।
তাহলে বলছি শুনুন, যখন আমরা আল-নামজুর শিবিরে ছিলাম, তখন তিনজন শরণার্থীকে মরুভূমি থেকে সেখানে নিয়ে আসা হয়েছিল। ভীষণ আহত আর পিপাসায় কাতর লোকগুলো খুবই দুর্দশাগ্রস্ত ছিল। সত্যি বলতে কী আল-নামজুর তাঁবুতে আনার কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন মারা গেল, আর আরেকজন কথা বলতে পারছিল না।
আমি বললাম, কেন? কী হয়েছিল ওদের?
প্রথমজনের সারা শরীরে গরম তলোয়ারের হ্যাঁকার দাগ ছিল। তার সারা শরীর পুড়ে গিয়েছিল। মরতে পেরে বরং সে দারুণ কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়েছে। অন্য লোকটির জীব কেটে ফেলা হয়েছিল, সে একটা পশুর মতো গোঙাছিল।
আমি জারাসকে বললাম, দয়াশীল হোরাসের দিব্যি, কী হয়েছিল ওদের?
তৃতীয় লোকটির তেমন যখম হয়নি। সে জানাল, সে ছিল একটি কাফেলার প্রধান ব্যক্তি। পঞ্চাশটি উট আর সমসংখ্যক নারীপুরুষসহ সে তুরক নগর থেকে লবণ আর তামা নিয়ে আসছিল। পথে দস্যু জাবের আল-হাওয়াসাঈ তাদের উপর হামলা করে। এই লোকটি শেয়াল নামেই পরিচিত।
আমি বললাম, আমি তার কথা শুনেছি। আরবের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর লোক সে।
তাকে ভয় করার অনেক কারণ আছে। শুধু খেলাচ্ছলে সে কাফেলার অন্যান্য নারীপুরুষদের খাসী করে আর নাড়িভুড়ি বের করে ফেলে। অবশ্য এই শেয়াল আর তার লোকেরা বন্দীদেরকে হত্যা করার আগে নারীপুরুষ সবার। উপর যৌন নির্যাতন চালায়।
এই শেয়াল এখন কোথায়? এই লোক কী জানে সে কোথায় গেছে?
না। সে আবার মরুভূমির বুকে হারিয়ে গেছে। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত যে, সে কাফেলার পথে ওঁৎ পেতে থাকবে।
ঠিক সেই মুহূর্তে তেহুতি ঘোড়ায় চড়ে সেখানে উপস্থিত হয়ে জিনে বসে ঘুরে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললো, এতো মনোযোগ দিয়ে তোমরা দুজন কী আলাপ করছো? এখানে এসে আমার আর বেকাথার পাশাপাশি চল। আর যদি তুমি জারাসকে গল্প শুনিয়ে থাক তবে আমরাও তা শুনবো।
তার কথা আমিও দুবার না মেনে পারি না।
আমরা দুজনেই ঘোড়া নিয়ে দুই রাজকুমারীর পাশাপাশি চলতে শুরু করলাম। বেশ কৌশল করে তেহুতি আমার আর জারাসের মাঝে তার ঘোড়াটা নিয়ে এলো, যাতে আমরা তাকে না শুনিয়ে কোনো আলোচনা করতে না পারি। সেই মুহূর্তে এবড়োথেবড়ো পাথুরে পথটি একটি পাহাড়ের চূড়ায় এসে শেষ হতেই তেহুতি ঘোড়ার রাশ টেনে ধরে খুশিতে চেঁচিয়ে উঠলো।
দেখো! ঐ যে তাকিয়ে দেখো! এতো চওড়া আর এতো নীল কোনো নদী কখনও দেখেছ? শিংওয়ালা দেবতা হোরাসের দিব্যি, এটা আমাদের নীলনদের চেয়ে একশো গুণ বেশি চওড়া হবে। আমি তো এর অন্য পারও দেখতে পাচ্ছি না।
জারাস তাকে জানাল, এটা নদী নয় মহামান্য। এটি লোহিত সাগর।
