আমি আমার সকল প্রিয় এবং অনুগত প্রজাদেরকে এই অনুষ্ঠানের সাক্ষী হতে আহ্বান জানাচ্ছি।
তেহুতি আর বেকাথাসহ সকলে বলে উঠলো, ফারাওয়ের জয় হোক! তার ইচ্ছাকে সম্মানিত আর মান্য করা হোক!
ফারাও দুই হাত দিয়ে শিকারী বাজপাখির ছোট্ট একটি সোনার মূর্তি মাথার উপর তুলে ধরলেন।
এটা আমার বাজপাখির সীলমোহর আর আমার প্রতীক। এর বহনকারী ঈশ্বর-প্রদত্ত আমার সকল অধিকার নিয়ে কথা বলবে। উপস্থিত সকলে এটি লক্ষ্য করুন আর আমার ক্ষমতা আর আমার ভয়ানক রোষ সম্পর্কে সতর্ক হোন।
তখনও হাঁটু গেড়ে বসা অবস্থায় থেকে আমি দুই হাত পেতে সামনে ধরতেই ফারাও ঝুঁকে বাজপাখির সীলমোহরটা আমার হাতে দিলেন।
বিচক্ষণতার সাথে এটা ব্যবহার করুন সম্মানিত তায়তা। আবার পরবর্তী সাক্ষাতের সময় এটা আমাকে ফেরত দিন।
আমি পরিষ্কার কণ্ঠে চেঁচিয়ে বললাম, হে মিসরাধিপতি, আপনার আদেশ শিরোধার্য।
তিনি আমাকে ধরে দাঁড় করিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, হোরাস এবং মিসরের অন্যান্য সকল দেবতার শুভ দৃষ্টি আপনার উপর বর্ষিত হোক।
তারপর তিনি ঘুরে তার বোনদেরকে বিদায় জানালেন। এরপর তিনি ঘোড়ায় চড়তেই দেহরক্ষীর দল তাকে ঘিরে দাঁড়াল। তারপর ঢাল বেয়ে নেমে দ্রুত দলবলসহ নীলনদের তীরে থিবসের দেয়ালের দিকে চললেন। কাফেলার শেষ অংশটুকু পার হয়ে দূরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
টিলার উপরে ক্রীতদাসেরা আমাদের বসার জন্য উটের লোমের তৈরি আসন বিছাল আর রোদ থেকে ছায়া দেবার জন্য মাথার উপর চাঁদোয়া টাঙাল। আমরা নিচে দূরে ফারাও আর তার সভাসদদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ইতোমধ্যে কাফেলার অগ্রভাগ আমাদের কাছে এসে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে চললো।
প্রথমে ছিল কুমির রক্ষীদলের একটি পল্টন। তাদের ঠিক পেছন পেছন চলেছে পঞ্চাশটি উট আর এগুলোর আরব চালক। প্রতিটা উটের পিঠের কুঁজের দুই পাশে দুটো করে চারটি পানিভরা বিশাল চামড়ার মশক ঝুলছে। এগুলোর উপর নির্ভর করেই আমাদেরকে আরবের বিশাল মরুভূমি পাড়ি দিতে হবে।
পানির মশকবহনকারী উটের সারির পেছনেই ঘোড়ায় চড়ে চলেছে কুমির রক্ষীবাহিনীর আরেকটি পল্টন। এরা পানির সরবরাহটি রক্ষা করবে আর যদি আমাদের উপর কোনো শত্রুর হামলা হয় তখন প্রয়োজন পড়লে পেছনে রাজকুমারীদের নিরাপত্তার কাজে সহায়তা করবে।
যদিও আমি সিনাই উপদ্বীপ থেকে অনেক দূরে দক্ষিণ আর পূর্ব দিকে দিয়ে আমাদের যাত্রাপথ পরিকল্পনা করেছিলাম, তারপরও আমি কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নই। হাইকসোরা এই জায়গাটি তাদের অধীনস্থ এলাকা মনে করে আর গোরাব কোনোভাবে আমাদের পরিকল্পনা জানতে পারলে তার রথিবাহিনী পাঠিয়ে আমাদের যাত্রায় বাধা দিতে পারে।
এই দুই রক্ষীবাহিনীর পেছনে আরও পঞ্চাশটি উট তাঁবু, আসবাবপত্র আর অন্যান্য সরঞ্জাম বয়ে নিয়ে চলেছে। যাত্রাপথে প্রতিটি বিশ্রাম নেবার জায়গায় তাবু গাড়তে এগুলো প্রয়োজন হবে।
এর পেছনে পায়ে হেঁটে চলেছে তবু অনুসরণকারী, ভৃত্য আর ক্রীতদাসের দল। কাফেলার পরের অংশে রয়েছে আরও বিশটি এক কুঁজওয়ালা উট। এগুলো রূপার মুদ্রার ভারী বস্তাগুলো বহন করছে।
সবার শেষে ছিল কাফেলাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়া কুমির রক্ষীবাহিনীর তৃতীয় পল্টন, অতিরিক্ত ঘোড়া, উট আর মালবাহী গাড়ি। আমরা যেখানে বসেছিলাম তার সমান সমান এগুলো আসতেই আমি আমাদের তবু গুটিয়ে নিতে নির্দেশ দিলাম।
ঘোড়ায় চড়ে সামনে এগিয়ে আমরা মরুভূমির উপর দিয়ে চলা এক লিগ দীর্ঘ এই মিছিলের ঠিক মধ্যখানে আমাদের নির্দিষ্ট জায়গায় এসে পৌঁছলাম। বেয়াড়া রকম আকৃতির আর ধীর গতিতে চলা মানুষ আর পশুর এই দীর্ঘ মিছিলটি দশ দিন পর লোহিত সাগরের পশ্চিম তীরে পৌঁছল।
.
সাগাফা বন্দর থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে জারাস আমাদের সাথে দেখা করলো। সে আর তার প্রহরী ঘোড়ায় চড়ে কাফেলার পেছন দিকে একটু পিছিয়ে রাজকীয় দলের কাছে পৌঁছতেই দুই রাজকুমারীকে দেখতে পেয়ে ঘোড়া থেকে নামলো।
তেহুতির সামনে এক হাঁটুগেড়ে বসে সে এক হাত মুষ্টিবদ্ধ করে তাকে অভিবাদন জানাল। প্রত্যুত্তরে তেহুতিও তার দিকে তাকিয়ে একটি প্রাণোচ্ছল হাসি দিল।
ক্যাপ্টেন জারাস, আমি খুবই খুশি যে, ব্যবিলন পর্যন্ত সফরে আপনাকে আমরা পাবো। তামিয়াত দুর্গ থেকে আপনি আর প্রভু তায়তা ফেরার পর, আবৃত্তির ঢঙে সেখানে অভিযানের যে চমৎকার ধারা বর্ণনা আপনি দিয়েছিলেন, তা আমার ভালো মনে আছে। আমি খুব খুশি হবো যদি আপনি আমাদের সাথে আজ নৈশভোজে অংশ নেন আর কবিতা আবৃত্তি করে শোনান। আর ব্যবিলন পর্যন্ত সফরের বাকি অংশের বিষয়ে আমার ইচ্ছা এবং নির্দেশ যে, আপনি কাফেলা পাহারা দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব অন্য কর্মকর্তার হাতে দিয়ে সরাসরি আমার বোন আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবেন।
আমি তাকে শোনাবার জন্য বেশ জোরে একটা নিঃশ্বাস নিলাম কিন্তু সে আমার চাপা প্রতিবাদ পুরোপুরি উপেক্ষা করে সমস্ত মনোযোগ জারাসের দিকে দিল। জারাসকে বেশ অপ্রস্তুত দেখাচ্ছিল আর উত্তর দিতে গিয়ে সে একটু তোতলাতে লাগলো। এই প্রথম তাকে এরকম করতে দেখলাম।
মহামান্য রাজকুমারী, আপনার নির্দেশ শোনা মানেই তা পালন করা। তবে অনুগ্রহ করে আমাকে ক্ষমা করবেন। আমাকে এখুনি প্রভু তায়তার কাছে হাজির হতে হবে, যার হাতে ফারাও এই কাফেলার নেতৃত্ব দিয়েছেন আর যাকে রাজকীয় বাজপাখির সীল মোহর দিয়ে বিশ্বাস করেছেন।
