যা অনিবার্য তা মেনে নিয়ে বললাম, আপনি সত্যি মহান, হে মিসরাধিপতি, আমি সত্যি কৃতজ্ঞ।
.
সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে যাবার পর কাফেলা থিবসে থেকে যাত্রা শুরু করার জন্য প্রস্তুত হতেই আমি এটনকে একটা বার্তাবহ কবুতর ছাড়তে বললাম। এটি এর জন্মস্থান ব্যবিলনে মিসরীয় দূতাবাসের উদ্দেশ্যে উড়ে যাবে। এতে আমি আমাদের রাষ্ট্রদূতকে অনুরোধ জানিয়ে বার্তা পাঠালাম, যেন তিনি আক্কাদ আর সুমেরের রাজা নিমরদকে খবর দেন যে, রাজকুমারীরা একটি কূটনৈতিক সফরে তার রাজধানীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছেন। আর ফারাও ত্যামোস অত্যন্ত খুশি হবেন যদি মহামান্য রাজা নিমরদ রাজকুমারীদেরকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।
চারদিন পর আরেকটি কবুতর ব্যবিলন থেকে রাজা নিমরদের বার্তা নিয়ে থিবসে ফিরে এলো।
দুই দেশের মাঝে সুসম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দিয়ে রাজা জানিয়েছেন তিনি অবশ্যই রাজকুমারীদের সাদর অভ্যর্থনা জানাবেন এবং আশা করছেন যে, রাজকুমারীরা নিশ্চয়ই এখানে তাদের অবস্থান উপভোগ করবেন।
এই বার্তা পাওয়ার সাথে সাথে আমি জারাসকে একটি শক্তিশালী অগ্রগামী দল নিয়ে থিবস থেকে লোহিত সাগরের সবচেয়ে কাছের উপকূল পর্যন্ত পথটি নিষ্কন্টক করার জন্য পাঠালাম। অজুহাত দেখালাম যেন আমাদের পথে কোনো দস্যুদল হামলা করার জন্য ওঁত পেতে নেই তা নিশ্চিত করতে যাচ্ছে। তবে আসল উদ্দেশ্যে ছিল তাকে আমার প্রিয় তেহুতির কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা।
আমি বুঝতে পারলাম না তেহুতি কী করে আমার সব পরিকল্পনা জেনে ফেলে। সবজায়গায় তার গুপ্তচর আছে আর হারেম হচ্ছে ষড়যন্ত্র আর গুজবের একটি উর্বর ক্ষেত্র।
অগ্রগামী দল নিয়ে যাবার জন্য জারাসকে সকালেই নির্দেশ দিয়ে আমি বাগানে বসে এককাপ চা খেতে খেতে গতকালের বিভিন্ন কাজের খতিয়ান নিয়ে ভাবছিলাম। ঠিক তখনই একটা ছায়ার মতো নীরবে সে আমার পেছন দিয়ে এসে দুই ঠাণ্ডা হাত দিয়ে আমার চোখ ঢেকে কানের কাছে ফিসফিস করে বললো, কে বলতো?
আমি বলতে পারবো না কে এটা মহামান্য।
ওহহ! তুমি নিশ্চয়ই উঁকি দিয়ে দেখেছ! সে প্রতিবাদ করে উঠলো তারপর আমার কোলে বসে দুই হাত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরে বললো, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি তায়তা। তুমি যা বল তাই আমি করতে পারি। এবার আমার একটা কথা রাখবে?
অবশ্যই রাখবো, রাজকুমারী। যে কাজে তোমার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় আর মিসরের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয়, সে কাজ ছাড়া আর যেকোনো কাজ আমি করতে রাজি।
আমার এ-ধরনের কথা শুনে সে আতঙ্কিত হয়ে বললো, না না, এরকম কোনো ধরনের অনুরোধ আমি কখনও করবো না। যাইহোক এই ভয়ঙ্কর মরুভূমি উপর দিয়ে সুমের আর আক্কাদ যেতে অনেক সময় লাগবে। কোনো ধরনের আনন্দ না পেয়ে আমার বোন আর আমার খুবই একঘেয়ে লাগবে। তবে খুব মজা হতো যদি একজন কবি সাথে থেকে আমাদের গান আর কবিতা শোনাতো।
এজন্যই কি তুমি ক্যাপ্টেন জারাসকে এই অভিযানে নেবার জন্য তোমার ভাই ফারাও ত্যামোসকে বলেছিলে?
সে চোখ বড় বড় করে অবাক হয়ে বললো, ক্যাপ্টেন জারাস! তিনিও কি আমাদের সাথে যাচ্ছেন? কি চমৎকার তাই না? তিনি তো একজন জন্মগত কবি আর কী চমৎকার তার গানের গলা। আমি জানি তুমি তাকে পছন্দ কর। তিনি তো আমার আর বেকাথার সাথে দিনের বেলা ঘোড়ায় চড়ে যেতে যেতে আমাদের গান আর কবিতা শোনাতে পারেন, তাই না?
প্রথম কথা হল ক্যাপ্টেন জারাস একজন প্রথম সারির সেনাকর্মকর্তা এবং যোদ্ধা, কোনো ভ্রাম্যমাণ চারণ কবি নন। আমাদের কাফেলায় একদল পেশাদার গায়ক-বাদক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, ভাড়, যাদুকর, আর একটি ভল্লুকসহ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অন্যান্য পশুও আছে। জারাস আমাদের কাফেলার আগে আগে অগ্রগামী দলের দায়িত্বে থাকবে। সে আমাদের সবার নিরাপত্তার স্বার্থে সামনের পথে কোনো বাধা বিপত্তি থাকলে তা দূর করবে। বিশেষত তোমার আর তোমার ছোট বোনের নিরাপত্তার স্বার্থেই তা করবে।
এবার তেহুতির ঠোঁট থেকে মন গলানো হাসিটা মুছে গেল। সে একটু পেছনে হেলে শীতল দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, কেন এমন করছো আমার সাথে তায়তা? আমি তো সামান্য একটা আবদার করেছি।
আমি তার ডান হাতটি উপুড় করে ধরে হিরার আংটিটার দিকে দেখিয়ে বললাম, এটাই আমার কারণ, রাজকুমারী।
সে এক ঝটকা মেরে হাতটা সরিয়ে নিয়ে পেছনে লুকাল। আমরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
বুঝা গেল সে যুদ্ধের সীমানা মেলে ধরেছে আর তার রূপক ছুরিও বের করেছে। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে একবারও পেছন না ফিরে চলে গেল।
.
মেসোর মাসের প্রথম দিনে জারাস অগ্রগামী দলটি নিয়ে লোহিত সাগরের তীরে সাগাফা বন্দরে পৌঁছলো। সেখানে পৌঁছেই সে একটা কবুতর উড়িয়ে দিয়ে খবর পাঠাল যে, সাগরের তীরে ধাউ আর বজরার একটি বহর সে খুঁজে পেয়েছে। এগুলো আমাদের পুরো কাফেলাটি সাগর পার করে দেবার জন্য প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। এই খবর পাওয়ার সাথে সাথে আমি সামনে এগোবার নির্দেশ দিলাম।
কাফেলার একেবারে সামনে থেকে ফারাও ঘোড়ায় চড়ে আমাদের সাথে চললেন। নীল নদীর কাছে পাহাড়টির কাছে পৌঁছেই সবাই ঘোড়া থেকে নেমে পড়লো।
ফারাওয়ের দুই পাশে কুশন লাগানো টুলে দুই রাজকন্যা বসলেন। সভাসদ আর উচ্চপদস্থ রাজকর্মকর্তারা এই তিনজনকে ঘিরে একটি বৃত্ত তৈরি করলো। তারপর ফারাও আমাকে ডাকতেই আমি তার কাছে এসে হাঁটুগেড়ে বসলাম। তিনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন।
