জারাস আমাকে দেখেই আমার দিকে তাকাল। তারপর হাতুড়িটা পাথরের মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে হাত উঁচিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসলো।
দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব থাকা সত্ত্বেও আমাকে তার স্বাগত জানাবার আন্তরিক ভঙ্গি দেখে আমি অবাক হলাম। সে সামনে এগিয়ে এসে বললো, আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে ভূলে গিয়েছ আর এখানে পঁচতে ফেলে রেখে গেছ। তবে আমার জানা উচিত ছিল যে, তোমার মতো একজন মানুষ কখনও তার বন্ধুকে ভুলে যেতে পারে না। আমি আমার বর্ম পলিশ করে রেখেছি আর তরবারিও ধার দিয়ে রেখেছি। এখন তুমি হুকুম করলেই আমি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।
আমি হতবুদ্ধি হয়ে পড়লাম আর অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে তাকে সাথে না নেওয়ার কথাটা সরাসরি বলতে পারলাম না।
একটু হাসার চেষ্টা করে বরলাম, আমিও তোমাকে কম আশা করিনি। কিন্তু তুমি কী করে জানলে… আর কোনো কথা বলতে পারলাম না, কেননা আমার নিজেরই কোনো ধারণা নেই সে কি বলতে চাচ্ছে।
আজ সকালেই যুদ্ধ পরিষদ থেকে আর্দালি নির্দেশটা নিয়ে এসেছিল। তবে আমি জানতাম তুমি নিশ্চয়ই আমাকে নেবার কথা বলেছে। তারপর একটু হেসে আবার বললো, উপরের মহলে তুমি ছাড়া আমারতো আর কোনো বন্ধু নেই।
নির্দেশে কার সীলমোহর ছিল জারাস?
নামটা জোরে উচ্চারণ করতে সাহস পাচ্ছি না, তবে… তারপর চারপাশে তাকিয়ে বেশ গোপনীয়তা নিয়ে সে তার কোমরের পেছনে ঝুলানো থলিটা থেকে সাবধানে একটা ছোট প্যাপিরাস কাগজ বের করলো। তারপর খুব যত্ন আর সম্মানের সাথে কাগজটা আমার হাতে দিল।
কাগজটার উপর সীমাহরটা দেখেই চিনতে পেরে আমি চমকে উঠলাম। ফারাও? আমি অবাক হলাম যে এতে সামান্য বিষয়ে ফারাও নিজেকে জড়িত করেছেন।
আর কে? এই কথা বলে জারাস আমার দিকে তাকাল, আমি কাগজটির ভাঁজ খুলে পড়লাম। পরিষ্কার আর বেশ ছোট একটি নির্দেশ।
এখনি প্রভু তায়তার সরাসরি অধীনে নিজেকে উপস্থিত কর। এরপর থেকে তিনি তোমাকে যেসব নির্দেশ দেবেন, শেষ নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত তা নিসংকোচে পালন করবে।
এবার জারাস গলা নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বললো, এবার আমরা কোথায় যাচ্ছি তায়তা? আর সেখানে গিয়ে কী করবো আমরা। নিশ্চয়ই জোর লড়াই হবে তাই না?
আমি দৃঢ়ভাবে মাথা নেড়ে বললাম, সময় হলেই এই প্রশ্নের উত্তর দেব। এমুহূর্তে এর বেশি কিছু বলতে পারবো না। তবে প্রস্তুত থেক।
সে হাতমুঠো করে আমাকে অভিবাদন করলো। তবে দাঁত বের করা হাসিটা থামালেও চোখদুটো চকচক করছিল।
মুদ্রা সরবরাহের বিষয়ের আলাপটা শেষ করার পর দ্রুত প্রাসাদে ফিরে গেলাম। আমাকে এখুনি ফারাওয়ের সাথে দেখা করে জারাসকে দেওয়া তার নির্দেশটা বাতিল করাতে হবে। তবে আগাম খবর না দিয়ে আমিও সরাসরি রাজার সামনে যেতে পারি না। যেকোনো লোকের ফারাওয়ের সাথে সাক্ষাত করার একটি কঠোর নিয়ম পালন করা হয়।
রাজপ্রাসাদে ফারাওয়ের প্রাসাদকক্ষের পাশের একটি কামরায় বেশ কয়েকজন লেখক মাটিতে বসে তুলি দিয়ে ঈজেলের উপর বিভিন্ন রাজকীয় বার্তা আর নির্দেশ লিখছিল। প্রধান লেখক আমাকে দেখেই চিনতে পেরে
এগিয়ে এলো, তবে সে কোনো সাহায্য করতে পারলো না।
ফারাও ভোরেই প্রাসাদ থেকে বের হয়ে গেছেন। কখন ফিরবেন কেউ জানেনা। আমি জানি এখানে থাকলে তিনি অবশ্যই আপনার সাথে কথা বলতেন প্রভু তায়তা। আমার মনে হয় আপনি একটু অপেক্ষা করে দেখতে পারেন।
একথার উত্তরে কিছু বলার আগেই করিডোরের শেষ প্রান্ত থেকে ফারাওয়ের কণ্ঠস্বর শোনা গেল। পেছনে একদল রাজকর্মকর্তা আর অমাত্য নিয়ে ফারাও দৃঢ়পদক্ষেপে লেখার কামরায় ঢুকলেন। আমাকে দেখেই কাছে এসে আমার কাঁধে এক হাত রেখে বললেন, তোমাকে এখানে পেয়ে ভালোই হল। আবার তুমি আমার মনের কথা টের পেয়েই এসেছ তাতা। আমি নিজেই অবশ্য তোমাকে আসার জন্য খবর পাঠাতাম। এসো আমার সাথে। কাঁধে হাত রেখেই তিনি আমাকে ভেতরের কামরায় নিয়ে গিয়ে কতগুলো জটিল বিষয় নিয়ে আলাপ শুরু করলেন। তারপর হঠাৎ আমার সাথে কথা শেষ করার পর তার সামনে নিচু একটি টেবিলের উপর রাখা কতগুলো কাগজের দিকে মনোযোগ ফেরালেন।
আমি আপনার সাথে একমুহূর্ত কথা বলতে চাই মেম। তিনি কাগজ থেকে মাথা তুলে আমার দিকে তাকালেন। ক্যাপ্টেন জারাস আর তার প্রতি নির্দেশের বিষয়টা…
ফারাও একটু হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে বললেন, কে? কিসের নির্দেশ?
ক্যাপ্টেন জারাস, যে আমার সাথে তামিয়াত গিয়েছিল।
এবার তিনি উত্তর দিলেন, ওহ, সেই লোক! হ্যাঁ, যাকে তুমি ক্রিটে তোমার সাথে নিয়ে যেতে চেয়েছ। আমি বুঝলাম না তাকে সাথে নেবার জন্য আমার অনুমতির কি প্রয়োজন আর তুমি নিজেই বা কেন এ-ব্যাপারে আমার সাথে সরাসরি কথা বললে না। আমার বোনদেরকে কোনো বিষয়ে মধ্যস্থতা করার জন্য বলাতে তোমার চরিত্র নয়। তারপর আবার কাগজের দিকে নজর ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, যাইহোক কাজটা হয়ে গেছে। আশা করি তাতা তুমি সন্তুষ্ট হয়েছ, তাই না?
আমি অবশ্যই সন্দেহ করেছিলাম এই নির্দেশের পেছনে কে আছে, তবে আমার রাজকুমারীদের বুদ্ধিমত্তা আর কূটকৌশল নিয়ে বেশি মাথা ঘামায় নি। এবারই সে প্রথম সামরিক নির্দেশের শৃঙ্খলায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে। এখন আমাকে তড়িৎ যে কোনো একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে, হয় কাপুরুষের মতো আত্মসমর্পণ করতে হবে আর নয়তো রাজকুমারী তেহুতির সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়তে হবে, যে কোনোদিন নিজ স্বার্থে তার উচ্চ রাজকীয় ক্ষমতা ব্যবহার করেনি। কাজেই আমি মাথা নোয়ালাম।
