মেয়েদেরকে সাথে নিয়ে আমি থিবসের বাজারের বিভিন্ন দোকান ঘুরে। প্রচুর চোখধাঁধানো গহনা কিনে নিয়ে এলাম। এগুলো দেখলে মিনোজ আর তার সভাসদরা আমাদের রাজ্যের সম্পদ আর গুরুত্ব বুঝতে পারবে। থিবস থেকে যাত্রা শুরু করার এক সপ্তাহ আগে তেহুতি আর বেকাথা একে একে সমস্ত পোশাক আর গহনা পরে ফারাও আর আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আমি ওদের দেখে সন্তুষ্ট হয়ে ভাবলাম, যে কোনো মানুষ, সে রাজা হোক আর সাধারণ মানুষ হোক এদের দুজনের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারবে না।
সফরের প্রস্তুতির এ-পর্যায়ে এসে মেয়েদুটোর উৎসাহ উদ্দীপনা বেড়ে গেল। তাছাড়া লক্সিয়াস যখন ওদেরকে ক্রিট দ্বীপের বর্ণনা দিল তখন ওরা আরও উত্তেজিত হয়ে পড়লো। ওরা জীবনে কখনও সমুদ্র দেখেনি আর সমুদ্র পাড়িও দেয়নি। উঁচু পর্বত কিংবা উঁচু গাছের ঘন জঙ্গলও দেখেনি। ওরা কখনও সেই পর্বত দেখেনি যার মুখ দিয়ে ধূঁয়া আর আগুন বের হয়। ওরা আমাকে আর লক্সিয়াসকে এসব বিষয়ে রাতজেগে একের পর এক প্রশ্ন করে যেতে লাগলো।
পশ্চিমতীরে অবস্থিত রাজকীয় টাকশাল রাত দিন কাজ করে একশো বড় ক্রেটান রূপার বাট ভেঙে কয়েকগাড়ি রূপার মেম মুদ্রা তৈরি করা হলো। এগুলো দিয়ে আমাদের সফর আর ক্রিট আর বিদেশের অন্যান্য জায়গায় অবস্থানের খরচ জোগানো হবে।
ব্যবিলন পর্যন্ত আমাদের কাফেলা পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নীল কুমির রক্ষীদলের দুটো অশ্বারোহী পল্টন গঠন করা হল। এটি ছিল মিসরীয় সেনাবাহিনীর সবচেয়ে চৌকশ পল্টন। ফারাও প্রত্যেক সৈন্যকে বর্মসহ নতুন সমরসাজ, উঁচু চূড়াওয়ালা শিরস্ত্রাণ আর ঘোড়াসহ হাঁটুতে পরারও বর্ম দিলেন। এছাড়া অস্ত্র হিসেবে ওরা নিল বাঁকা ধনুক, তৃণ, তরবারি এবং ঢাল। এসব অস্ত্র আর বর্ম তৈরির খরচ পড়লো দুই হাজার রূপার ডেবেনেরও বেশি। যাইহোক এই জাঁকালো অস্ত্রশস্ত্র ইত্যাদি দেখার পর যে কেউ চমকে যাবে।
আমি খরচের কথাটা বলার পর ফারাও বললেন, আমাদের মিসরের অস্তিত্বের খাতিরে এটি সামান্য খরচ। এ-বিষয়ে আমার সাথে এখন অভিযোগ তুলে লাভ নেই। এগুলো সব তোমার পরিকল্পনা তায়তা। এরপর আমি আর কোনো কথা বলতে পারলাম না।
সফরের প্রস্তুতি এতো সুন্দরভাবে চলছিল যে, আমি বিন্দুমাত্র টের পাইনি যে রাজকুমারী তেহুতি এতে গভীরভাবে নিজেকে জড়িয়েছিল আর সেকারণেই সবকিছু এতো সুন্দরভাবে হচ্ছিল।
.
এপিফি মাসের শেষ দিনে আমি থিবস থেকে যাত্রা শুরু করতে চেয়েছিলাম, কেননা এই মাসটি সবসময় আমার জন্য শুভ ছিল। যাইহোক মল ত্যাগ করার পর সদ্য ত্যাগ করা মলের সামান্য নমুনা যখন আমি একটি পাত্রে আমার পছন্দের ভবিষ্যদ্বক্তার কাছে দিলাম, তিনি এটি পরীক্ষা করে সাবধান বাণী উচ্চারণ করে বললেন যে, এই তারিখটি শুভ নয়। এটা এড়াতেই হবে।
তিনি আমাকে মেসোর মাসের প্রথম দিন পর্যন্ত যাত্রা বিলম্বিত করতে উপদেশ দিলেন। এ-যাবত তার ভবিষ্যদ্বাণী সবসময় বিশ্বাসযোগ্য ছিল। তাই আমি তার উপদেশ মতো আমার দুই রাজকুমারীসহ কাফেলার সকলকে সফর পিছিয়ে দেয়ার কথা জানিয়ে দিলাম।
কোনো খবর না দিয়েই এক ঘন্টার মধ্যেই দুই রাজকুমারী ঝড়ের বেগে প্রাসাদে আমার বাসস্থানে এসে হাজির হল। দলনেতা ছিল তেহুতি আর সবসময়ের মতো বেকাথা একনিষ্ঠভাবে তার বড়বোনের অনুগামি হিসেবে হাজির হল।
তুমি কথা দিয়েছিল তাতা! আর এখন কীরকম নিষ্ঠুরভাবে আমাদের আনন্দ মাটি করতে পারলে তাতা? কত যুগ ধরে আমরা এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করেছিলাম। তুমি কি আমাদেরকে আর ভালোবাসো না?
আমি দুর্বলচিত্ত নই, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমি ইস্পাত কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারি, তবে আমার দুই রাজকুমারীর ক্ষেত্রে অবশ্যই নয়। ওরা যখন একত্রে আক্রমণ করে, তখন কোনো মানুষের পক্ষে তা প্রতিহত করা সম্ভব নয়, এমনকি আমিও পারি না।
পরদিন ভোর হতেই আমি নীলনদ পার হয়ে ঘোড়ায় চড়ে রাজকীয় টাকশালের দিকে চললাম। রাজকুমারীদের দাবীমতো আমি সেখানে যাচ্ছিলাম সফরের পেছানো তারিখটা জারাসকে জানাতে আর তাকে বলতে যে সফর শুরুর আগেই যেন সে শেষ দশ বস্তা রূপার মেম মুদ্রা রাজপ্রাসাদের রাজকীয় ভাণ্ডারে জমা দেয়।
সফরের জন্য আমরা দশ লাখের বেশি রূপা নিয়ে যাচ্ছিলাম। এপরিমাণ রূপা দিয়ে একটি রণতরী-বহর আর ভাড়াটে সেনার পুরো একটি বাহিনী গড়ে তোলা যায়।
টাকশালে ঢোকার পর দেখলাম একটা কামারশালার মতো ভেতরে ভীষণ গরম আর প্রচণ্ড শব্দ হচ্ছে। কামারের হাপরের আগুনের শিখার গর্জন আর হাতুড়ির শব্দে কানে তালা লেগে যাচ্ছে।
জারাসকে মেঝেতে দেখতে পেলাম। খালি গায়ে সে মাথার উপর একটা ব্রোঞ্জের হাতুড়ি তুলে ঘুরাচ্ছে। পেশিবহুল বাহু ঘামে চকচক করছে আর মুখ গাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। এই ছেলেটি এমন চরিত্রের যে, কোনো কাজ থাকলে তা না করে অলস বসে থাকতে পারে না। একজন উচ্চ পদস্থ সামরিক পদধারী হওয়া সত্ত্বেও সে টাকশালের একজন সাধারণ শ্রমিকের মতো মনেপ্রাণে পরিশ্রম করছে।
তাকে দেখে আমি খুশি হলাম। বেশ কয়েক সপ্তাহ তার সাথে দেখা হয়নি আর আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম যে, তামিয়াতে অভিযানে একসাথে থাকার সময় আমি তার কতটা ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ আমার মনে দুঃখ হল যে ব্যবিলন আর কুনুসসের দীর্ঘ অভিযানে তাকে আমার ডান হাত হিসেবে নিতে সাহস পাচ্ছি না।
