এটন একটু চিন্তা করে বললো, দুই বছরে অনেককিছু ঘটে যেতে পারে।
আমি বললাম, এখানেই শেষ নয়। ফারাওয়ের কাছ থেকে বার্তা পাওয়ার পর সর্বাধিরাজ মিনোজ তার মন্ত্রণাপরিষদের সাথে বিষয়টা নিয়ে পরামর্শ করবেন, তারপর তার উত্তর নিয়ে একই পথে দূতকে থিবস ফিরতে হবে। পুরো সফরটা শেষ করতে প্রায় তিনচার বছর লেগে যাবে।
এটন বললো, না! এতোদিন আমরা অপেক্ষা করতে পারি না। এর মধ্যে তো রাজা গোরাব তার এক লক্ষ হত্যাকারী দস্যু সৈন্য নিয়ে থিবস আক্রমণ করে বসবে। অন্য কোনো সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।
তুমি ঠিক বলেছ প্রিয় বন্ধু এটন। এ-বিষয়ে তোমার মনে আর কোনো ভাবনা আছে? আমি সমস্যাটা আবার তার কাছে ফিরিয়ে দিলাম।
বোকার মতো মুখ করে সে মৃদু হেসে বললো, তোমার মতো এই সমস্যাটা নিয়ে আমি ভাবিনি। আমার মনে হয় তোমার মনে কোনো পরিকল্পনা আছে, তাই না?
আচ্ছা ধর, ফারাও একজন মিসরীয় রাষ্ট্রদূতকে নিয়োগ দিয়ে তার সাথে এমন একটি বিশাল বাহিনী দিলেন যা তাকে দ্রুত লোহিত সাগর আর এরপরের মরুভূমির দস্যুদল আর বেদুঈন গোষ্ঠীদের এড়িয়ে নিরাপদে সফর করতে সহায়তা করবে। আর যদি এই রাষ্ট্রদূতকে যথেষ্ট পরিমাণ রূপা দেওয়া হয়, যা দিয়ে সে টায়ার বন্দর থেকে বেশ বড় আর দ্রুতগামি একটা জাহাজ ভাড়া করতে পারবে। তারপর এই দ্রুতগামি জাহাজে সাগর পাড়ি দিয়ে জলদস্যু আর হাইকসো যুদ্ধ জাহাজকে এড়াতে পারে, তাহলে কেমন হয়?
এবার এটনের চোখ উজ্জ্বল হল, সে বললো, হ্যাঁ ঠিক!
আর এই চমৎকার জাহাজটি যদি সোজা ক্রিটের কুনুসসে পৌঁছাতে পারে? আর এই রাষ্ট্রদূতের কাছে যদি এমন উপঢৌকন থাকে যা সর্বাধিরাজ মিনোজ খুবই পছন্দ করেন? তারপর একদিকে মাথা হেলিয়ে চোখ সরু করে বললাম, তোমার কী কোনো ধারণা আছে কী ধরনের উপহার মিনোজের সবচেয়ে পছন্দ?
এবার এটন হেসে বললো, মনে হয়, আছে বন্ধু। আমি যতদুর শুনেছি মিনোজের এমন এক জোড়া অণ্ডকোষ আছে যা আমাদের দুজনের মিলিয়ে নেই। অর্থাৎ যা থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি তার চেয়ে ওগুলো কয়েকগুণ বেশি ওজনে ভারি। আর যে জিনিস নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না তার প্রতি তার তৃপ্তিহীন ক্ষুধা রয়েছে।
তার কথা শুনে আমিও হাসলাম, যেন হাসা দরকার তাই। তবে আমার এই দৈহিক অসম্পূর্ণতার বিষয়টি আমার কাছে খুব একটা রসিকতা করার মতো বিষয় মনে হয় না।
কিন্তু তায়তা এতে আমাদের কী লাভ বল? রাজা গোরাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এটা আমাদের কি কাজে আসবে? মিসরের সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব থিবসে ফারাওয়ের হাতেই থাকবে। তার প্রতিটা নির্দেশ এতো দূরে জানাতে হবে, যে কথা আমরা দুজনে এতোক্ষণ আলোচনা করলাম।
আমি তার কথার উত্তরে মন্তব্য করলাম, আবারো তুমি সমস্যাটির ঠিক আসল জায়গায় হাত দিয়েছ। যাইহোক এ-বিষয়েও আমার কিছু চিন্তা আছে। যদি ফারাওয়ের এই রাষ্ট্রদূত রাজকীয় সীলমোহর বহন করে, তাহলে সে সময় নষ্ট না করে ক্রিটে মিনোজ আর তার সভাসদদের সাথে মিলে যুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রায়ই যুদ্ধে জয় এনে দেয়।
এটন খুব জোরে জোরে মাথা নাড়তে নাড়তে বললো, কখনও না! যাকে তিনি সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস করেন, তাকে ছাড়া আর কারও হাতে ফারাও সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব আর যুদ্ধ পরিচালনা করার ক্ষমতা তুলে দেবেন না।
আচ্ছা বলতো এটন! তোমার কি মনে হয় মিসরে কি এমন কেউ নেই যাকে ফারাও ত্যামোস নিঃসন্দেহে বিশ্বাস করেন?
না, আমার বিশ্বাস তেমন কেউ নেই। তারপর হঠাৎ কথা থামিয়ে সে আমার দিকে অবজ্ঞাভরে তাকিয়ে বললো, এই তায়তা! তুমি নিশ্চয়ই একথা বলছো না যে রাজকীয় সীলমোহরসহ ফারাও তোমার হাতেই মিসরীয় সেনাবাহিনীর উত্তরাঞ্চলের পুরো কর্তৃত্ব তুলে দেবেন? তুমি তো একজন সৈনিক নও তায়তা! যুদ্ধের কী জান তুমি?
তুমি যদি আমার লেখা যুদ্ধের কলাকৌশল গ্রন্থটি না পড়ে থাক তাহলে এ-বিষয়ে আমার যোগ্যতা নিয়ে তোমার কিছু বলার অধিকার নিয়ে আমি প্রশ্ন তুলতে পারি। সেনা মহাবিদ্যালয়ের প্রতিটি ছাত্রকে এ-বিষয়ে সর্বশেষ জ্ঞান হিসেবে এই গ্রন্থটি পড়ানো হয়।
আমি স্বীকার করছি এটা আমি কখনও পড়িনি। তোমার এই বিখ্যাত গ্রন্থটি খুব বেশি বড় আর এই বিষয়ে আমার তেমন আগ্রহও নেই; কেননা আমার মনে হয় না আমাকে কখনও কোনো সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিতে হবে। তবে আমি যা বলছি, তাহল পার্চমেন্ট কাগজে কিছু হিজিবিজি লেখা আর প্রকৃত যুদ্ধক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা একরকম ব্যাপার নয়। তোমার কি কোনো সেনাবাহিনীকে সরাসরি নির্দেশ দেবার অভিজ্ঞতা আছে?
এবার আমি গলার স্বর নরম করে বললাম, বেচারি এটন, তুমি আমার সম্পর্কে কত কম জান। এ-বিষয়ে কথা শেষ করার আগে আমি তোমাকে শুধু জানাচ্ছি আমাদের সেনাবাহিনীর প্রথম রথটি আমিই বানিয়েছিলাম। আর থিবসের যুদ্ধে ফারাও ত্যামোসের রথের চালকও ছিলাম আমি। আর যুদ্ধ চলাকালে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেবার সময় ফারাও আমার পরামর্শের উপর নির্ভর করতেন। যুদ্ধে আমার বিশেষ অবদানের জন্য ফারাও আমাকে সাহসিকতা আর প্রশংসার সোনার পদক দিয়েছিলেন। সেদিন তার জীবন রক্ষার দায়িত্ব তিনি আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। আবারও তা করতে পারেন।
