অনেক তর্কবিতর্কের পর আমরা সবাই একমত হলাম যে, এখন সবচেয়ে ভালো হবে মিনোয়ানদের সাথে সরাসরি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। আর ওদের সাথে একটি কার্যকর মৈত্রি চুক্তি করার দিকে এগিয়ে যাওয়া যাতে, এই
দুই জাতি মিলে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী একটি শক্তিতে পরিণত হয়, যে শক্তিকে হাইকসোরা কখনও চ্যালেঞ্জ করার আশা করবে না।
ঠিক তখনই উৎসাহের আতিশয্যে আমি একটা ভুল করে ফেললাম। এটনকে বললাম, আমার যদূর মনে পড়ে হাইকমোরা আকস্মিকভাবে মিসরে : হামলা করার আগে আমরা সবসময় ক্রিটের সাথে মোটামুটি একটি কূটনৈতিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছিলাম। যাইহোক হাইকসোরা উচ্চ মিসর দখল করে নেওয়ার পর আমাদের দেশের দক্ষিণাংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে ক্রিটের সাথে আর যোগাযোগ বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। হাইকসোরা আমাদের মাঝখানে ঢুকে দুটি দেশকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে।
আমার কথা শুনে এটন কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকাল। আমি থামার পরও সে কোনো কথা না বলে চুপ করে রইল। আমি বাধ্য হয়ে তাকে বললাম, তোমার কী মতামত এটন? আমার কথাটি কি তোমার মনঃপুত হয়নি?
সে আমার প্রশ্নের কোনো সরাসরি উত্তর না দিয়ে বরং আমার প্রথম কথাটায় ফিরে গিয়ে বললো, আমি কি ঠিক শুনেছি তায়তা? তুমি কি আসলেই একথা বলেছে যে, হাইকসোদের মিসর আক্রমণের আগের কথা তোমার মনে আছে?
আমার বয়স নিয়ে আমি সাধারণত খুবই সাবধানতা অবলম্বন করি। এমনকি এটনের মতো যারা আমার কাছের মানুষ তারাও আমার আসল বয়সের চেয়ে অনেক কম জানে। যদি আসল বয়সটা ওদের জানাতাম, তাহলে ওরা আমাকে একজন পাগল মানুষ কিংবা খুব বেশি হলে একজন মিথ্যাবাদী মনে করতো। হাইকমোরা প্রায় নব্বই বছর আগে মিসর আক্রমণ করেছিল আর ঘটনাটা আমার স্পষ্ট মনে আছে। কিন্তু এখন ভুলটা আমাকে শোধরাতে হবে।
প্রশ্নটা উড়িয়ে দিয়ে বললাম, কথাটা বলতে গিয়ে আমি একটু ঘোট পাকিয়ে ফেলেছিলাম। আসলে আমি বলতে চাচ্ছিলাম যতটুকু আমি পড়েছি আর শুনেছি, হাইকমোরা মিসর আক্রমণ করার আগে ক্রিটের সাথে আমাদের বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক ছিল। তারপর তাড়াতাড়ি বললাম, এখন যদি আবার তাদের সাথে বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক ফিরিয়ে আনতে চাই কিংবা কোনো ধরনের পারস্পরিক প্রতিরক্ষামূলক চুক্তি করার উদ্যোগ নিতে চাই, তাহলে তা সরাসরি করাটা খুবই শক্ত হবে। তুমি কি এতে একমত এটন?
সে সাথে সাথে কোনো উত্তর দিল না। কেবল অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আমার গলা থেকে নিয়ে লেখার টেবিলের উপর রাখা দুইহাত খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে লাগলো। এটন জানে বয়সের রেখা একজন মানুষের এই দুই জায়গার উপর বেশি পড়ে।
তবে এ-বিষয়ে আমি ব্যতিক্রম। থুতনিতে এখনও দাড়ি উঠেনি এমন একজন বালকের মতো আমার সারাদেহের চামড়া মসৃণ আর দাগহীন। সেখানে এটন আমার আসল বয়সের কোনো আলামত খুঁজে পেল না। সে চিন্তিত ভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে আবার আমাদের পূর্বের আলাপের বিষয়ে ফিরে এলো।
এবার গলার সুর নরম করে সে বললো, বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে তুমি যা বলছে তা একেবারে সঠিক তায়তা। এখন সরাসরি মিনোজের সাথে যোগাযোগ করা প্রায় অসম্ভব। সমস্যাটা তুমি ঠিকই ধরেছো, এখন বল সমাধান কীভাবে করা যাবে।
তুমি নিশ্চয়ই জানো আক্কাদ আর সুমের-এর রাজা নিমরদের রাজধানী ব্যবিলনে সর্বাধিরাজ মিনোজের একটা দুতাবাস আছে।
এটন সায় দিয়ে বললো, অবশ্যই জানি। কিন্তু ব্যবিলনে ক্রিট রাষ্ট্রদূতের সাথে যোগোযোগ করার জন্য আমাদের দূত পাঠাতে চাইলেও, সেই সফরও তোমার সেই তামিয়াত দুর্গ আক্রমণ করার চেয়েও অনেক দুর্গম হবে।
ঠিকই বলেছ এটন। এর দূরত্ব প্রায় দ্বিগুণ আর খুবই বিপজ্জনক আর অনিশ্চিত হবে। আমাদের দূতকে পূর্বদিকে লোহিতসাগর উপকূলের দিকে যেতে হবে। তারপর সাগর পার হয়ে বিশাল আর দুর্গম আরব মরুভূমি পাড়ি দিতে হবে। এটি এমন একটি জায়গা যা সমস্ত দয়ালু দেবতারা ত্যাগ করেছেন, এখানে বৈরী বেদুঈন গোষ্ঠিরা ঘুরে বেড়ায় আর বিচারের হাত এড়িয়ে চলা গলাকাটা দস্যু আর সমাজতাড়িত লোকজনদের বিচরণ রয়েছে। থিবস থেকে ব্যবিলনের দূরত্ব দেড় হাজার লিগেরও বেশি। আর সমস্যার এখানেই শেষ নয়।
কেন নয় তায়তা? আমরাতো জানি ব্যবিলনে মিনোজের একটি দুতাবাস আছে?
হ্যাঁ, তা আছে। তবে ক্রিট আর থিবসের মধ্যে একটা মৈত্রী চুক্তি করার মতো আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা সেই রাজদূতের থাকার কথা নয়। সে বড়জোর একটা বার্তাসহ আমাদের দূতকে ক্রিটে সর্বাধিরাজ মিনোজের রাজদরবারে পাঠিয়ে দিতে পারবে। সেক্ষেত্রে আমাদের দূতকে মধ্য সাগরের একেবারে পুবপ্রান্তে গিয়ে টায়ার কিংবা সিডন বন্দরে গিয়ে একটা জাহাজ খুঁজতে হবে। তারপর সেই জাহাজের ক্যাপ্টেন নিতে রাজি হলেও তাকে শীতকালীন ঝড়, জলদস্যু আর হাইকসো যুদ্ধ জাহাজ এড়িয়ে মধ্য সাগরের অর্ধেক পর্যন্ত যেতে হবে। তারপরই সে ক্রিট দ্বীপের কুনুসসে সর্বাধিরাজ মিনোজের দুর্গে পৌঁছতে পারবে।
এতে কত সময় লাগতে পারে বলে তোমার ধারণা তায়তা?
ভাগ্য ভালো হলে আর দেবতা সহায় হলে প্রায় একবছর লাগবে আর নয়তো এর দ্বিগুণ সময় লাগবে।
