আমাকে মার্জনা করুন মহামান্য মিসর অধিপতি। আপনি মিসরীয় জাতির পিতা। এই সম্পদ আপনার, যেভাবে ইচ্ছা আপনি এটা খরচ করতে পারেন। তবে তার আগে এর চেহারা এমনভাবে বদলে নিতে হবে যেন, জীবিত কোনো মানুষ বিশেষত সর্বাধিরাজ মিনোজ যেন এটা চিনতে না পারে।
এবার তিনি একটু সুর নরম করে বললেন, সেটা কীভাবে সম্ভব তায়তা?
আমাদেরকে প্রতিটা রূপার বাট ভেঙে অর্ধেক ডেবেন সমান ওজনের ছোট ছোট মুদ্রার টুকরা তৈরি করতে হবে। তারপর প্রতি টুকরা মুদ্রার উপর আপনার মুখের ছবির ছাপ মারতে হবে।
এবার ফারাও বিড়বিড় করে বললেন, হুমম! তাহলে তা আমার এই রূপার নতুন মুদ্রার নাম কী হবে? আমি জানতাম তার নিজের ছবি রূপার ছোট টুকরাগুলোর উপর থাকার কথা শুনে ফারাও খুশি হবেন।
ফারাও অবশ্যই একটি নতুন নামের কথা ভেবে থাকবেন। তবে আমার একটা ধারণা এই মুদ্রাগুলোর নাম রূপার মেম দেওয়া যেতে পারে।
এবার তিনি খুশি হয়ে মৃদু হেসে বললেন, আমার মনে হয় এটাই সঠিক হবে তাতা। আর নতুন এই রূপার মুদ্রায় অপর পিঠে কী ছবি থাকবে?
আমি মাথা ঝুঁকিয়ে বললাম, অবশ্যই ফারাও সে সিদ্ধান্ত নেবেন।
তিনি একমত হয়ে বললেন, অবশ্যই আমি তা নেব, তবুও তোমারও একটা মতামত আছে, তাই না?
আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, আপনার জন্মক্ষণ থেকে আমি আপনার সাথে আছি তাই না মহামান্য?
হ্যাঁ, দেবতা হোরাস জানেন তুমি কতবার একথা আমাকে শুনিয়েছ। যখনই তুমি বর্ণনা কর প্রথম যে কাজটি আমি করেছিলাম, তা হল আমি তোমার উপর পেচ্ছাব করে দিয়েছিলাম, তখন ভাবি কেন আমি তখন আরও জোরে আর অনেকক্ষণ ধরে পেচ্ছাবটা করলাম না।
আমি তার কথার শেষাংশটা না শোনার ভান করে বললাম, আমি সবসময় আপনার কাছাকাছি আর পেছনে বিশ্বাসী এবং অনুগত ছিলাম। আমার মনে হয় এই ঐতিহ্য বজায় রাখাই মঙ্গলজনক। একথা বলে আমি থামলাম কিন্তু ফারাও আমাকে কথাটা শেষ করতে বলে বললেন, বলে যাও। তবে আমি মনে হয় বুঝতে পারছি তুমি কোন দিকে যাচ্ছ।
আমি অত্যন্ত বিনীতভাবে বলছি, হয়তো সবদিক বিবেচনা করে ফারাও রূপার মেম মুদ্রার পেছনে আহত বাজপাখির ছবি লাগাবার নির্দেশ দিতে পারেন। আমার কথা শেষ হতেই ফারাও জোরে হেসে উঠলেন।
সত্যি তুমি কখনও আমাকে হতাশ করোনা তাতা। তুমি প্রথম থেকেই সবকিছু ভেবে রেখেছিলে! একটিা ভাঙা ডানাসহ বাজপাখির ছবি আমার ব্যক্তিগত গূঢ়লিপি।
রাজানুকূল্যে আর কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখে আমি ম্যামোজের সমাধিক্ষেত্র এলাকায় একটি টাকশাল বসালাম। এই রূপার টুকরাগুলো বর্ণনা করার জন্য আমি মুদ্রা নামে একটি নতুন শব্দ ঠিক করলাম। ফারাও সাথে সাথে এর অনুমোদন দিলেন।
এই মুদ্রা ব্যবস্থাটি ছিল আমার আরেকটি অর্জন যা আমাদের মিসরের উন্নতি আর অগ্রগতির জন্য অসাধারণ একটি সহায়তা হিসেবে প্রমাণিত হল। একটি সুষম মুদ্রানীতি আজকাল সরকার পরিচালনা আর ব্যবসা-বাণিজ্যের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি হাতিয়ার। এটা ছিল মিসরের প্রতি আমার অন্যতম একটি উপহার আর এটিই অন্যতম প্রধান একটি কারণ যেজন্য আমরা সবসময় পৃথিবীর সবচেয়ে অগ্রগণ্য জাতি হয়ে থাকবো। অবশ্য এরপর থেকে অন্যান্য জাতিও আমাদের অনুকরণ করেছে আর রূপার মেম এখন এমন একটি মুদ্রা যা পৃথিবীর সব দেশে স্বীকৃত এবং সানন্দে গৃহীত হয়েছে।
আমার কনুইয়ের মৃদুস্পর্শ পেয়ে ফারাও তার পিতার সমাধিক্ষেত্রের নাম পরিবর্তন করে রাজকীয় টাকশাল নাম দিলেন। এরপর ফারাও আমাকে এই প্রতিষ্ঠানের প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। এটা আমার অন্যান্য দায়িত্বের বাইরে বাড়তি আরেকটি দায়িত্ব। তবে যে কোনো দায়িত্ব পালনে আমি কখনও অনুযোগ করি না।
প্রশাসক পদে আসীন হওয়ার পর আমার প্রথম কাজটি ছিল জারাসকে রাজকীয় টাকশালের অভিভাবক ও কোষাধ্যক্ষ নিযুক্ত করা। এ দায়িত্ব পালনে সহায়তার জন্য জারাসকে অধিনায়ক করে তার অধীনে এক পল্টন সেনা দিতে আমি ফারাওকে অনুরোধ জানালাম। অবশ্য এতে জারাস পুরোপুরি আমার অধীনে চলে আসবে।
রাজকুমারী তেহুতি কৌশল করে জারাসকে তার হীরার আংটিটি পরীক্ষা করতে বাধ্য করেছিল আর এতে তার উদ্দেশ্য আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছিল। তাই আমি অত্যন্ত সাবধানে তাকে নীলনদের পশ্চিম তীরে পৃথক করে রাখার ব্যবস্থা করেছিলাম। আমি জানি আমার আদরের রাজকুমারী যখন কোনোকিছু করতে মনস্থির করে তখন সেখান থেকে তাকে সরানো খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
আমার শুধু একটাই চিন্তা ছিল যতক্ষণ তার যথোপযুক্ত নিয়তি নির্ধারণ করতে না পারি ততক্ষণ রাজকুমারী তেহুতি আর জারাসের মাঝে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে। এটা পরিষ্কার, তার নিয়তি হচ্ছে একজন রানি এবং পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ব্যক্তির সঙ্গিনী হওয়া। একজন সাধারণ সৈন্য সে যতই সুন্দর আর ভালো হোক না কেন, তেহুতি তার খেলার সাথী আর তাঁবুর সহগামি হতে পারে না।
একটা বিষয় আমি জানতাম যে, রাজরক্তের সুন্দরী নারীর প্রতি সর্বাধিরাজ মিনোজের বিশেষ অনুরাগ আছে। তবে সত্যি বলতে কী কথাটা প্রমাণিত সত্য নয়। এটা আসলে একটা গুজব যা বার বার রটানোর ফলে সত্যে পরিণত হয়েছে।
তবে আমার বিশ্বাস ছিল যে, এই অসীম শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব আমার দুই রাজকুমারীর অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ নিশ্চয়ই এড়াতে পারবেন না। আর এর মাধ্যমে আমি মিনোয়ানদেরকে আমার আর মিসরের মঙ্গলের কাজে লাগাত পারবো। নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিলাম যে, রাজসিংহাসনে আসীন হওয়া আর এই বর্বর হাইকসোদের হাত থেকে আমাদের প্রিয় মিসরকে রক্ষা করার চেয়ে অধিক সম্মানিয় আর উচ্চতর আর কোনোকিছুই তেহুতি আশা করতে পারে না। এটা যখন সে বুঝতে পারবে তখন জারাসের মতো সাধারণ মানুষের প্রতি তার আকর্ষণ হারিয়ে ফেলবে।
