যখন আমি হাইকসো ভণ্ড বিওনকে তিনটি তীর ছুঁড়ে মেরে ফেড়ে ফেলেছিলাম, সেই তিনটি তীর ছোঁড়ার ঘটনার বর্ণনা দেবার সময় মিসরের সমস্ত সভাসদ আসন ছেড়ে লাফিয়ে উঠে উল্লাসে হর্ষধ্বনি দিয়ে উঠলেন। আর ফারাও এমন জোরে আমার বাহু চেপে ধরলেন যে, এরপর অনেকদিন তার দাগ রয়ে গিয়েছিল।
বাকি সবার সাথে আমি নিজেও হাসি আর কান্নার মাঝে রইলাম আর সবশেষে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিলাম।
সমাপ্তিতে পৌঁছার সময় সে বিশাল প্রবেশ পথের দিকে ঘুরে দুই হাত দুই দিকে মেলে ধরে বলতে লাগলো।
তারপর মহান তায়তা মিসরের সমস্ত দেবতা আর ফারাও ত্যামোসের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে কেঁদে বলতে শুরু করলেন, এটা কেবল সামান্য একটি নমুনা আমি আপনার জন্য অর্জন করেছি। সেই সম্পদের কেবল এক হাজার ভাগের একভাগ আমি আপনার সামনে হাজির করেছি। হে ফারাও ত্যামোস, আপনার প্রতি আমার ভালোবাসা আর কর্তব্যের এটি একটি প্রমাণ।
বাইরে মরুভূমিতে একটি মাত্র ঢাক বাজতে শুরু করলো আর তাঁবুর প্রবেশ পথ দিয়ে শিরস্ত্রাণ আর বর্মপরা দশজন সৈন্য ভেতরে ঢুকলো। ওরা একটা কাঠের তক্তা বহন করে নিয়ে এলো, যার উপর কতগুলো চকচকে রূপার বাট পিরামিড আকারে সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
সবাই একযোগে উঠে দাঁড়িয়ে প্রশংসা আর হর্ষধ্বনি করতে লাগলো।
ওরা চিৎকার করে বলে উঠলো, জয় হোক ফারাও রাজার! সকল প্রশংসা তায়তার!
জারাসের বলা শেষ হওয়ার পর তাকে ওরা যেতে দিচ্ছিল না। ফারাও কয়েকমিনিট তার সাথে কথা বললেন। পুরুষেরা তার সাথে হাত মেলালো আর কেউ কেউ তার পিঠ চাপড়ালো। আর কয়েকজন মহিলা যারা মদ পান করেছিল তারা ফিক ফিক করে হেসে তার গায়ের সাথে বেড়ালের মতো নিজেদের গা ঘসতে লাগলো।
যখন সে আমার সামনে এলো, আমি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে তার প্রশংসা করে বললাম, খুব ভালো লিখেছ আর চমৎকার বলেছো, জারাস। তুমি একজন যোদ্ধা আবার একজন কবিও বটে।
সে উত্তরে বললো, আপনার মতো একজন বিখ্যাত কবির কাছ থেকে একথা শুনে আমার খুবই আনন্দ হচ্ছে। আন্তরিকভাবে তার এই কথা বলাটা আমার মন ছুঁয়ে গেল। তারপর সে সমবেত দর্শকশ্রোতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চললল। সবশেষে রাজকুমারি তেহুতির সামনে এসে মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়াল।
ওরা তাঁবুর অন্য প্রান্তে আমার কাছ থেকে বেশ দূরে ছিল। তবে কারও ঠোঁট নাড়া দেখে আমি তার কথা বুঝতে পারি, যেরকম একটা প্যাপিরাস থেকে পড়তে পারি।
তেহুতির প্রথম কথাটা ছিল, ধিক আপনাকে ক্যাপ্টেন জারাস! আপনার কবিতা শুনে আমার কান্না পেয়েছিল। তার এই কথার সাথে সাথে জারাস তার সামনে হাঁটুগেড়ে বসে পড়লো। তার মুখ আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না, তাই তার কথাও বুঝতে পারিনি। তবে তার কথা শুনে তেহুতি হেসে উঠলো।
আপনি একজন বীর, ক্যাপ্টেন। তবে এক শর্তে আমি আপনাকে ক্ষমা করতে পারি। তাহল, কথা দিতে হবে যে আরেকদিন আপনি আমাদেরকে গান গেয়ে শোনাবেন। একথার উত্তরে জারাস হয়তো সম্মতি জানিয়েছিল, তাই তেহুতি আবার বললো, তাহলে এই কথাই রইল। এরপর জারাস উঠে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত সম্মান দেখিয়ে পেছন দিকে হটলো।
হায় ঈশ্বর! আমি ভাবলাম! হায় রে বোকা ছেলে, ফিরে এসো ওখান থেকে। তুমি ওদের সমকক্ষ নও। যুদ্ধের ময়দান থেকেও ভয়ঙ্কর বিপদে তুমি এখন পড়েছ। কিন্তু তেহুতি আবার তাকে থামাল।
আমি ওর ঠোঁট নাড়া দেখে কথাগুলো বুঝতে পারলাম, কী ঝামেলা হল। আমার আংটিটা মনে হয় মাটিতে পড়ে গেছে। একটু আগেই এটা আমার আঙুলে ছিল। দয়া করে একটু খুঁজে দেখুন না ক্যাপ্টেন জারাস?
একাজ করার জন্য সে এক পায়ে খাড়া ছিল। তেতির সামনে আবার মাটিতে ঝুঁকে সে আংটিটা খুঁজতে শুরু করলো আর প্রায় সাথে সাথে ওটা পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে এক হাত সামনে বাড়িয়ে ধরে বললো, এটাই কি আপনার হারানো সেই আংটি, মহামান্য? এবার সে আমার দিকে একটু ঘুরে দাঁড়াতে আমি তার ঠোঁট নাড়া পড়তে পারছিলাম।
হ্যাঁ, এটাই তো। একজন বিশেষ মানুষ আমাকে এটা উপহার দিয়েছেন। যার প্রশংসা আজ সন্ধ্যায় আপনি করেছেন। তবে সে সাথে সাথে আংটিটা জারাসের হাত থেকে ফেরত নিল না।
আপনি প্রভু তায়তার কথা বলছেন?
সে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললো, অবশ্যই! আপনার হাতে ধরা আংটিটার পাথরটার দিকে তাকিয়ে দেখুন তো। দেখুন কী স্বচ্ছ।
কাছাকাছি একটা মশালের কাছে আংটিটা নিয়ে সে সায় দিয়ে বললো, পানির মতো পরিষ্কার। তেহুতি তাকে বাধ্য করলো আংটিটা খুঁটিয়ে দেখতে, তারপর সে হাত বাড়িয়ে বললো।
ধন্যবাদ, ক্যাপ্টেন জারাস। তারপর জারাস আংটিটা তেহুতির বাড়ানো হাতে তুলে দিতেই তেহুতি তার মুঠো বন্ধ করলো।
আমি মনে মনে ভাবলাম, আংটিটার মধ্যে কোনো যাদু না থাকলেও, রাজকুমারি তেহুতি, তোমার হাসিতে যে জাদু আছে তাতে মেমফিস আর থিবসের দেয়াল দুপাশ থেকে চেপে পিষ্ট করে ফেলতে পারবে। জারাসের মতো একজন অপরিপক্ক যুবক কী করে তোমার ছলনা ঠেকাতে পারবে?
.
এখন সবচেয়ে প্রথম আর জরুরী কাজটি হল, কোনো ধরনের চিহ্ন না রেখে এই বিশাল তিনটি ক্রেটান তিনতলা জাহাজ গায়েব করে ফেলা। সর্বাধিরাজ মিনোজের মনে যেন বিন্দুমাত্র সন্দেহ না থাকে যে, হাইকসো বিওনই তার রত্নভাণ্ডারসহ জাহাজগুলো চুরি করেছে। ক্রোধে সে উম্মুক্ত হয়ে যাবে যখন জানবে যে, তার কথিত মিত্ৰই আসল অপরাধী।
