প্রথমে ভাবলাম জাহাজ তিনটা পুড়িয়ে ছাইগুলো নীলনদে ভাসিয়ে দিই। যাতে এগুলো অদৃশ্য হওয়ার রহস্যটা চিরকালের জন্য মুছে যায়। তারপর আবার বিপুল পরিমাণে কাঠ বিনষ্ট হওয়ার বিষয়টা বিবেচনা করলাম।
মিসরে বনাঞ্চল খুব বেশি নেই। আমাদের কাছে কাঠ, সোনা রূপার মতোই মূল্যবান। এই বিপুল পরিমাণ কাঠ থেকে কতগুলো যুদ্ধ জাহাজ আর রথ তৈরি করা যাবে, এই বিষয়টা ভাবতেই এরকম দামি জিনিস পুড়িয়ে ফেলার চিন্তা থেকে নিজেকে বিরত রাখলাম।
বিষয়টা নিয়ে ফারাও আর আমাদের সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক প্রভু কাটাসের সাথে আলোচনা করলাম।
ক্রাটাস বললো, কিন্তু তায়তা, মিসরের কোথায় তুমি এতো কাঠ লুকিয়ে রাখবে? এই কথাটা কি ভেবে দেখেছো?
ফারাও আমার পক্ষ নিয়ে বললেন, একটা বিষয় আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন, ক্রাটাস। সেটা হল তায়তা নিশ্চয়ই তা ভেবে রেখেছে। তায়তা সবসময় সবকিছু ভেবে নিয়ে বলে।
আমি বিড়বিড় করে বললাম ফারাও আমার প্রতি অতি দয়াশীল। তবে আমি যথাসাধ্য বিনীতভাবে চেষ্টা করি। একথা শুনে ক্রাটাস হাসিতে ফেটে পড়লো।
ফারাও ঠিক বলেছেন। এ-বিষয়টা নিয়ে আমার কিছু চিন্তাভাবনা আছে। তবে আসল কথা হচ্ছে রূপারর্বাটগুলো পাহারা দেবার জন্য আপনার দেবত্বপ্রাপ্ত বাবা প্রয়াত ফারাও ম্যামোজের শূন্য সমাধিতে পুরো এক পল্টন সৈন্য রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। আর এই সৈন্যদেরকে দুই কাজে ব্যবহার করা যাবে।
এবার ক্রাটাসও মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনতে লাগলো।
ফারাও বললেন, বলে যাও।
দেখুন, আমি সমাধিকক্ষের পাশের কামরাগুলোর আয়তন আবার মেপে দেখেছি।
তিনতলা জাহাজগুলো ভেঙে যে কাঠের তক্তা পাওয়া যাবে সেগুলো সবই এই মাটির নিচের কুঠরিগুলোতে লুকিয়ে রাখা যাবে। তারপর সুবিধামতো যুদ্ধের প্রয়োজনে এগুলো আবার ব্যবহার করা যাবে। তারপর আমি ক্রাটাসের দিকে তাকিয়ে একটু টিটকারির সুরে বললাম, হয়তো প্রভু ক্রাটাসের এ-বিষয়ে আরও ভালো কোনো প্রস্তাব থাকতে পারে। তিনি হয়তো কাঠের তক্তাগুলো শুধু তার মুখের কথার ভারে লোহিত সাগরের নিচে ডুবিয়ে রাখতে পারবেন।
কিন্তু ক্রাটাস হাসতে হাসতে গর্জন করে বললো, তায়তা, তুমি আমার সাথে ভালোই রসিকতা করলে।
অর্ধেক পল্টন সৈন্যের কয়েক সপ্তাহ খাটুনির পর জাহাজগুলোর সমস্ত তক্তা খুলে প্রতিটার গায়ে সংখ্যা দেওয়ার পর মাটির নিচের কামরাগুলোয় সাজিয়ে রাখা হল। শেষপর্যন্ত আমার কৌশল কাজে লেগে গেল, বিশাল জাহাজগুলো সম্পূর্ণরূপে গায়েব হয়ে গেল।
এতে অবশ্য অতিরিক্ত একটা ঝামেলা এড়ানোর কাজের সুবিধা পেলাম। ফারাওকে দিয়ে আমি জারাসকে এই জাহাজ ভাঙার কাজের নেতৃত্বের ভার দিয়েছিলাম। কড়া নির্দেশ ছিল সম্পূর্ণ কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে এই সমাধি এলাকার মধ্যেই থাকতে হবে। কাজেই যখন দুই রাজকুমারি, তেহুতি আর বেকাথা তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলো তখন আমি ভালোমানুষের মতো বলতে পারলাম যে, ফারাও তাকে একটি গোপন সামরিক অভিযানে পাঠিয়েছেন। তার ফিরতেও আরও বেশ কিছুদিন লাগবে।
হাইকসো যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়েও থিবসের রাজপ্রাসাদ জারাসের জন্য অনেক ভয়ঙ্কর। আমি রাতে শুয়ে আমার অনুগ্রহভাজন এই ছেলেটির কথা ভেবে আতঙ্কে ঘামতে লাগলাম। তাকে আমি একজন বিশ্বস্ত বন্ধু ভাবতাম, যে আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে, এছাড়াও সে ছিল একজন অকুতোভয় সেনানায়ক, একজন শিক্ষিত মানুষ আর এখন নিজেকে একজন কবি হিসেবে পরিচিত করেছে। আমাদের দুজনের মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। তবে তার সমবয়সী অন্যান্য যুবকের মতো তার মধ্যেও কিছু দুর্বলতা রয়েছে যা সে এড়াতে পারে না।
আমি এটাও জানতাম একজন যুবতি মেয়ের কামনা তাকে কী রকম নির্মম আর বেপরোয়া করে ফেলে। তাকে প্রথম দেখার সাথে সাথে আমার আদরের তেহুতির দেহ-মনে আগুন জ্বেলেছে। এই আগুন নেভাবার আর কোনো পথ আমি ভেবে পেলাম না।
৩. একের পর এক পরিস্থিতি
থিবিসে ফেরার এরপরের দিনগুলোতে পর একের পর এক পরিস্থিতিতে আমি নিজেকে জড়িয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
হাইকসো আর সর্বাধিরাজ মিনোজের মধ্যে যে রাজনৈতিক ঝড় বয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা করার জন্য ফারাও সর্বক্ষণ আমাকে তার কাছে থাকতে বাধ্য করলেন।
পরিস্থিতির গুরুত্ব আর বিপদ বিবেচনা করে এটন আর আমি একমত হলাম যে, আমাদের সমস্ত গোয়েন্দা অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর এখন নিজেদের মধ্যে যুদ্ধবিরতী ঘোষণা করে সাময়িকভাবে একে অন্যের সহযোগিতা করতে হবে। নিজেদের বাঁচামরা আর মিসরের অস্তিত্ব রাখার প্রয়োজনে আমাদের এটা করতে হবে।
উত্তর দিক থেকে তথ্য আর খবরাখবর বয়ে নিয়ে আসা নাম না জানা বিভিন্ন নারী পুরুষ সারারাত আমাদের আলাদা আলাদা দরজা দিয়ে ঢুকে আবার অন্য দরজা দিয়ে বের হয়ে যেতে লাগলো। এছাড়া সংবাদবাহক কবুতরও সংবাদ নিয়ে আসতে লাগলো।
এটন আর আমি গোয়েন্দাদের কাছ থেকে পাওয়া প্রতিটা তথ্য সাবধানে পরীক্ষানিরীক্ষা করার পর ফারাও আর তার নিজস্ব কর্মকর্তাদের কাছে পাঠাতাম।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল রাজা বিওনের শবদাহ করার খবরটি। আমি তীর ছুঁড়ে তাকে মেমফিসের একটু আগে নীল নদীতে মেরে ফেলেছিলাম। বর্বর হাইকমোরা তাদের নিহত বীরদের দেহ আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলতো, ওরা আমাদের মতো উন্নত আর সভ্য জাতির মত মৃতদেহ মমি করতো না।
