আমি নতজানু হতেই আমার কাঁধে এক হাত রেখে বাধা দিয়ে বললেন, না তায়তা। আমার একান্ত ইচ্ছা তোমাকে একজন মহান সদস্য করে আমার ভেতরের সভাসদদের একজন করে নেওয়া। তুমি আর আমার সামনে নতজানু হবে না।
আমি আমার নিজস্ব ভূমিকা নিয়ে বললাম, ফারাও অত্যন্ত দয়াশীল। আমি এমন সম্মানের যোগ্য নই।
তিনি একমত হয়ে বললেন, অবশ্যই তুমি তা নও। তবে আমি শুধু আমার সামনে তোমার এই নিচু হওয়াটা বন্ধ করতে চাই। শেঠের দিব্যি দিয়ে বলছি, তোমার এই কাজ দেখলে আমার মাথা ঝিম ঝিম করে। সোজা হয়ে দাঁড়াও তারপর বল মোট কত রূপা আমার জন্য এনেছ।
আমি আপনাকে বলেছিলাম ৬০০ লাখ ফারাও। তবে গণনার পর এই পরিমাণ থেকে বিশ লাখ কম পাওয়া গেছে।
আমার রাজ্য ফিরে পাবার জন্য আর তোমার মাথা উঁচু করার জন্য এটা অনেক বেশি। দরবারের সবাই কি এসেছেন?
সেনাপতি ক্রাটাসসহ সকলেই এসেছেন। তিনি এক ঘন্টা আগে থিবসে পৌঁছেছেন।
আমাকে সেখানে নিয়ে চল।।
সমাধিক্ষেত্রের ফটক থেকে বের হতেই আমি বুঝতে পারলাম এটন আমার সম্মানে কী বিশাল আয়োজন করেছে। উৎসবের পোশাক পরা রাজকীয় রক্ষিবাহিনীর মধ্য দিয়ে ফারাও আমাকে নিয়ে খালের তীরে স্থাপন করা বিশাল তাঁবুর দিকে এগিয়ে চললেন।
সেখানে পৌঁছেই দেখলাম রাজদরবারের সকল সদস্য সেখানে আমাদেরকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত রয়েছেন। সেখানে পুরো রাজপরিবার ছিল: তার দুই বোন, তার বাইশজন স্ত্রী আর ১১২ জন উপপত্নী। এছাড়া আরও ছিল অভিজাত সভাসদগণ, সেনাপতি, রাজ্য সদস্য আর অন্যান্য উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারি।
আমরা ঢুকতেই সবাই উঠে দাঁড়াল আর পুরুষরা তাদের তরবারি উঁচু করে আমার আর ফারাওয়ের যাওয়ার পথে একটা খিলান রচনা করলো। একইসাথে তাঁবুর বাইরে বাদকদল বীণা আর বাঁশির সমন্বয়ে একটি বিজয় সঙ্গীতের সুর বাজাতে শুরু করলো।
নির্দিষ্ট আসনে গিয়ে বসতে আমাদের বেশ সময় লাগলো। সমবেত প্রত্যেকে চাচ্ছিল আমাকে স্পর্শ করতে, আমার হাত ধরতে আর আমাকে অভিনন্দন জানাতে।
তাঁবুর ভেতরের দেয়ালের চারপাশে একটু পর পর এক মানুষ সমান উঁচু বিরাট মদের পাত্র সাজানো রয়েছে। সবাই যার যার আসনে বসার পর ভৃত্যরা লম্বা জার থেকে বড় বড় গ্লাসে লাল মদ ভরে দিল। একটা বড় মদ ভর্তি গ্লাস ফারাওয়ের সামে রাখতেই তিনি হাত দিয়ে সেটা ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বললেন।
এখানে আমরা তায়তাকে সম্বর্ধনা জানাতে এসেছি। তাকে ভালো লালমদ পরিবেশন কর, আজ গ্লাসে সেই প্রথম চুমুক দেবে।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে গ্লাস হাতে নিয়ে ফারাওয়ের উদ্দেশ্যে তুলতেই বিশাল তাঁবুর মাঝে সবার চোখ তখন আমার দিকে ফিরলো।
সকল প্রশংসা ফারাওয়ের। তিনিই আমাদের মিসর। ফারাও আর মিসর ছাড়া আমরা কেবল ধূলোবালু। এছাড়া কোনো কিছুই সুন্দর নয়। তারপর গ্লাসটা ঠোঁটের কাছে নিয়ে বড় একটি চুমুক দিলাম। সমবেত নারীপুরুষ সবাই দাঁড়িয়ে আমার নামে হর্ষধ্বনি দিল। এমনকি ফারাও মৃদু হাসলেন।
আমি অনুভব করলাম আমি যত কম বলবো ওরা ততই আমাকে ভালোবাসবে, কাজেই আমি ফারাওয়ের উদ্দেশ্যে মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে আমার আসনে বসে পড়লাম।
ফারাও উঠে দাঁড়িয়ে ডান হাত আমার কাঁধে রেখে পরিষ্কার দৃপ্ত কণ্ঠে তার বক্তব্য শুরু করলেন।
তিনি কেবল বললেন, সম্মানিত রাজ-সদস্য তায়তা আমাকে অনুগ্রহ করেছেন। তিনি আমার এবং মিসরের জন্য বিরাট একটি কাজ করেছেন, এতো বড় কাজ তার আগে আর কেউ করেনি। আমিসহ প্রত্যেক জীবিত মিসরীয় আর পরবর্তী প্রজন্ম জন্ম গ্রহণ করবে তাদের সবার উচিত তাকে সম্মান জানানো।
আমি তাকে রাজকীয় উচ্চমর্যাদাপূর্ণ আসন দিয়েছি। এখন থেকে তিনি মেসিরের জমিদার তায়তা নামে পরিচিত হবেন। একথা বলার পর ফারাও একটু থামলেন। সবাই ভদ্রভাবে নীরব হয়ে রয়েছে। মেসির হচ্ছে নীল নদীর পুবতীরে একটি গ্রাম। থিবস থেকে ৩০ লিগ দক্ষিণে। কতগুলো মাটির কুঁড়েঘর আর সাধারণ কিছু মানুষ সেখানে বসবাস করছে। ফারাও এই ধাঁধাটা নিয়ে সবাইকে কিছুক্ষণ ভাবতে দিলেন।
এছাড়া আমি তাকে চিরকালের জন্য নীলনদের পূর্বতীর আর থিবসের দক্ষিণ দেয়ালের মাঝে যত রাজকীয় জমিদারি আছে সব কিছুর মালিকানা তাকে দিলাম।
এটা শোনার পর সমবেত সবাই অবাক হল আর সকলের মধ্য থেকে একটা গুঞ্জন উঠলো। মেসিরের নদীর তীর থেকে থিবস পর্যন্ত ত্রিশ লিগ জমি হচ্ছে পুরো রাজকীয় জমিদারির মধ্যে সবচেয়ে উর্বর।
তার এই মহৎ কর্ম দেখে আমি হতবাক হলাম। যাইহোক তার ডান হাতে চুম্বন দেবার সময় আমার মনে একটা দুষ্ট চিন্তা জাগলো যে, যেহেতু আমি তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী রাজা বানিয়েছি কাজেই আমার প্রতি এই অনুগ্রহ দেখিয়ে তিনি কোনো মন্দ কাজ করেননি।
এবার ফারাও রূপার মদের গ্লাসটি হাতে তুলে নিয়ে সমবেত সবার উদ্দেশ্যে বললেন, আমার রানি, আমার রাজকুমার আর রাজকুমারি, সম্মানিত সভাসদ এবং ভদ্রমহিলাগণ, আমি তায়তার প্রতি কৃতজ্ঞতা। তার প্রতি সম্মান দেখিয়ে আর তার দীর্ঘ জীবন কামনা করে এই সুরা পান করছি।
সবাই উঠে দাঁড়িয়ে পেয়ালা হাতে নিয়ে সমস্বরে বলে উঠলো, প্রভু তায়তার প্রতি কৃতজ্ঞতা, সম্মান আর দীর্ঘজীবন কামনা করছি।
মিসরের ইতিহাসে এটা সম্ভবত প্রথম কোন ঘটনা যে, মিসরীয় একজন ফারাও তার এক প্রজাকে সম্মান দেখিয়ে পান করলেন। তারপর তিনি নিজ আসনে বসে সকলকে বসার ইঙ্গিত করলেন।
