আমি বললাম, তার চেয়ে ভালো হবে জিনিসটা আপনাকে দেখালে। তারপর আমি একটা বাক্সের ডালা খুলে চকচকে রূপার একটা পিণ্ড বের করে এক হাঁটু গেড়ে বসে রূপার পিন্ডটা তার হাতে তুলে দিলাম। তিনি জিনিসটা আমার হাত থেকে নিয়ে আস্তে আস্তে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন। আঙুলের ডগা দিয়ে ধাতুর উপর ছাপমারা চিহ্নটার উপর বুলিয়ে দেখলেন। ক্রিটের প্রতীক আক্রমণোদ্যত ষাঁড়ের মূর্তি আঁকা রয়েছে।
তারপর মৃদু কণ্ঠে বললেন, জিনিসটার চেহারা আর ওজন দেখেতো মনে হচ্ছে আসল রূপা। আসলেই কি তাই?
অবশ্যই এটা তাই ফারাও। এখানে আপনি যে-কটি সিন্দুক দেখছেন তার সবকটি এই রূপার বাটে ভরা।
আবার বেশ কিছু সময় চুপ করে রইলেন। তার ধূলিধূসরিত মুখের নিচে আমি দেখতে পেলাম প্রচণ্ড আবেগ। তারপর রুদ্ধকণ্ঠে বললেন।
এখানে কতটুকু আছে তাতা? এবার তিনি আমার সেই ছোটবেলাকার পুরোনো নাম ব্যবহার করলেন। যখনই আমার প্রতি ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন তখন এই নামে ডাকতেন।
আমিও আবার তার শিশুকালের নামে ডেকে বললাম, প্রত্যেকটা সিন্দুক ভরা, মেম। আমি ছাড়া আর কারও এই নামে ডাকার অধিকার নেই।
এসব কথা ছেড়ে আসল কথা বল তায়তা। বল কতটুকু রূপা তুমি আমার জন্য এনেছ? তার গলায় বিস্ময়ের সুর।
আমি উত্তর দিলাম, এটন আর আমি দুজনে মিলে এর বেশিরভাগ অংশ ওজন করেছি।
এতে আমার কথার উত্তর পাওয়া গেল না তাতা।
আমরা প্রথম দুটি জাহাজের পুরো অংশ আর তৃতীয়টার কিছু অংশ ওজন দিয়েছি। হিসেব করে মোট চার শো ঊনপঞ্চাশ লাখ পাওয়া গেছে। সম্ভবত আরও এক লাখের ওজন নিতে হবে। অবশ্য দেড়লাখও হতে পারে।
আবার তিনি চুপ করে মাথা নেড়ে ভ্ৰ কুঁচকালেন। তারপর বললেন, প্রায় ছয়শো লাখ। এতে থিবসের চেয়ে দ্বিগুণ বড় একটা নগরী গড়ে তোলা যাবে এর সমস্ত মন্দির আর প্রাসাদসহ।
একমত হয়ে আমিও মৃদুকণ্ঠে বললাম, আর দশ হাজার জাহাজ নির্মাণ করার পরও বেশ কয়েকটা যুদ্ধের খরচ যোগানোর মতো যথেষ্ট রূপা রয়ে যাবে মহামান্য ফারাও। এই পরিমাণ সম্পদ দিয়ে আপনি বর্বর হাইকসোদের কবল থেকে মিসরকে ফিরিয়ে আনতে পারবেন।
বিষয়টা উপলব্ধি করতে পেরে ফারাও একমত হলেন, আবেগে তার কণ্ঠস্বর উঠানামা করতে লাগলো, তুমি আমাকে প্রয়োজনীয় অর্থ দিয়েছ, যা দিয়ে আমি বিওন আর তার পুরো শক্তি ধ্বংস করতে পারবো।
এটন উঠে আমাকে আড়াল করে ফারাওয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বললো, আপনি অনেক দেরি করে ফেলেছেন ফারাও। হাইকসোর বিওন ইতোমধ্যেই পানিতে ডুবে মরেছে। তারপর এক পাশে সরে গিয়ে আমার দিকে আঙুল তুলে বললো, তায়তা তাকে মেরে ফেলেছে।
এবার ফারাও আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এটন যা বললো তা সত্যি? দেশের জন্য এতোকিছু করার পর তুমি বিওনকেও মেরে ফেলেছে?
আমি মাথা ঝুঁকে সায় দিলাম। গর্ব করাটা আমি ঘৃণা করি, বিশেষত আমার নিজের মধ্যে তা নেই।
সবকিছু খুলে বল তায়তা। ঐ দানবকে কীভাবে মারলে তার সবকিছু আমি জানতে চাই।
আমি উত্তর দেবার আগেই এটন মাঝখান থেকে বলে উঠলো, দয়া করে আর একবার আমার কথা শুনুন ফারাও। তারপর সে রাজার সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে বললো, এই কাহিনী আপনার পুরো রাজদরবারের সবার শোনা উচিত। জালিম হাইকসোদের উপর পূর্ণ বিজয়ের পর এটা আমাদের গৌরবময় সামরিক ইতিহাসের একটি অংশ হয়ে থাকবে। পরবর্তী প্রজন্ম তাদের সন্তানদের এই কাহিনী শোনাবে। আপনি যদি আমাকে অনুমতি দেন তাহলে আজ বিকেলে একটা বিজয়োৎসবের আয়োজন করবো। এতে রাজ্যের সমস্ত সভাসদ আর রাজপরিবারের সমস্ত সদস্য উপস্থিত থাকবেন। আর এই বিজয়োৎসব আমাদের ইতিহাসের এমন একটি সামরিক বিজয়কে সম্মান জানাবে যা আর কখনও হয়নি।
আপনি ঠিক বলেছেন এটন। তায়তা আমার জন্য এমন একটি কাজ করেছে যার প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাতে হবে। এই অভূতপূর্ব সৌভাগ্যের কথা আমি এখুনি আমার সভাসদদেরকে জানাবো। আটজন সভাসদ এখন থিবসেই আছেন। সেনাপতি ক্রাটাস শিঘ্রই উত্তর থেকে আসছেন। আর আপনারা দুজনেই আছেন। আশা করি তিন চার ঘন্টার মধ্যেই রাজদরবারের সমস্ত সদস্যকে একত্রিত করতে পারবো।
ফারাওয়ের পোশাকের বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে আমি বললাম, এই সময়ের মধ্যে মাহামান্য ফারাও স্নান সেরে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিতে পারবেন।
ঠিক বলেছ তায়তা। তবে গায়ের এই ময়লা কিন্তু পরিশ্রম আর হাইকসোদের রক্তের মূল্যে হয়েছে। যাইহোক দাসদের বল স্নানের পানি গরম করতে।
.
মিসরের পুরো রাজদরবার এক হওয়ার আগেই তৃতীয় তিনতলা জাহাজটি থেকে সমস্ত রূপার বাঁট নামিয়ে এনে দাঁড়িপাল্লায় ওজন করা হয়েছে। বিজয়োৎসবের প্রস্তুতি শেষ করার সাথে সাথে সূর্য অস্ত গেল।
আমি ফারাওকে খবরটা দিতে এলাম যে, অনুষ্ঠানের সমস্ত আয়োজন প্রস্তুত। প্রাসাদে ফিরে যাবার কষ্ট লাঘব করার জন্য আমি তার বাবার সমাধি কক্ষেই তার থাকার জন্য একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা করেছিলাম। এই কক্ষে কখনও কোনো মৃতদেহ আনা হয়নি, তাই এখানে মৃত্যুর গন্ধও নেই। শীতল এই জায়গাটি বেশ নীরব আর আরামদায়ক। তার দাসেরা তার জন্য বিছানা আর বহনযোগ্য কিছু আসবাবপত্রের ব্যবস্থা করেছিল।
তবে কোনো ধরনের বিশ্রাম না নিয়ে তিনি কামরায় পায়চারি করছিলেন আর তার তিনজন সচিবকে পত্রের তলিপি করছিলেন। পরিষ্কার পোশাকের উপর বুকে পোলিশ করা ব্রোঞ্জের বর্ম পরেছেন। এর উপরে সোনার কাজ করা। পরিষ্কার আর আঁচড়ানো কোঁকড়ানো চুল দেখে তাকে তার মায়ের মতোই সুন্দর দেখাচ্ছিল।
