কেবল এখন বুঝতে পারলাম এদের দুজনের এর আগে কখনও দেখা হয়নি। তেহুতি রাজপ্রাসাদের হেরেমের ছোট্ট পৃথিবীতে বিচরণ করতো। সেখান থেকে সে উপযুক্ত সহচরী পরিবেষ্টিত হয়ে বাইরের জগতে পা রাখতো। সম্ভবত আমিই ছিলাম সেই প্রতিরক্ষামূলক শৃঙ্খলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একজন সুন্দরী হিসেবে তার কুমারীত্ব রাজা এবং রাজ্যের জন্য অমূল্য। হয়তো কোন রাজকীয় অনুষ্ঠানের সময় দূর থেকে জারাস তাকে দেখেছে। তবে সে কখনও রাজপ্রাসাদের রক্ষীবাহিনীর দায়িত্বে ছিল না। তার সমস্ত সামরিক জীবন কেটেছে দূর রণাঙ্গণে কিংবা সামরিক প্রশিক্ষণে। আমি নিশ্চিত আজকের আগে এতো কাছ থেকে রাজকুমারির অসামান্য সৌন্দর্য্য দেখার সুযোগ তার কখনও হয়নি।
আমি তাকে দ্রুত নির্দেশ দিলাম, তোমার লোকজনদের খাওয়া দাওয়া করতে বল আর প্রত্যেককে অতিরিক্ত এক মগ বিয়ার দাও। আমি আবার নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওদেরকে বিশ্রাম নিতে বল। একথা বলে আমি দুই রাজকুমারিকে নিয়ে উপরে চললাম। জারাস পেছন থেকে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
.
সমাধিগর্ভের ফটক থেকে বের হয়ে একটু থেমে পূর্বদিকে তাকিয়ে দেখতে পেলাম, ভোরের গোলাপি লাল আভা পুব আকাশে ফুটে উঠেছে। তারপর নিচে তাকিয়ে দেখলাম জারাস ঠিকই বলেছিল, সমস্ত লোকজন পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে।
দ্রুত পায়ে তৃতীয় জাহাজটির সিঁড়ি বেয়ে ডেকে উঠতেই নদীর ওপার থেকে তুর্যধ্বনী শোনা গেল, আর সেই সাথে দ্রুতবেগে এগিয়ে আসা রথের চাকার শব্দও শোনা গেল। আমি জাহাজের রেলিং ধরে সামনে অন্ধকার নদীর তীরের দিকে তাকালাম।
অগুণতি মশালের আলো আর হট্টগোল থেকে বুঝা গেল ফারাও ফিরে এসেছেন। আমার বার্তা পেয়ে তিনি থিবসে ফিরেছেন। রাজার কাছাকাছি হলেই আমার বুক খুশিতে নেচে উঠে। আমি দ্রুত জাহাজের কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে আরও মশাল জ্বালতে আর রাজকীয় সম্মানের জন্য সৈন্যদের প্রস্তুত হতে নির্দেশ দিলাম।
একটুপরই অনুচরদের অনেক পেছনে ফেলে অন্ধকার ভেদ করে ফারাও নিজে রথ চালিয়ে উপস্থিত হলেন। আমাকে দেখার সাথে সাথে উল্লাসে চিৎকার করে আমাকে সম্ভাষণ জানিয়ে রথের রাশে হেলান দিলেন।
রাশটা তার সহকারীর হাতে ছুঁড়ে দিয়ে চাকা চলন্ত অবস্থায় রথ থেকে একলাফ দিয়ে মাটিতে নেমে বললেন, খুব ভালো লাগছে তায়তা তোমাকে দেখে। অনেক দিন দেখা হয় নি তোমার সাথে। তারপর একজন দক্ষ রথীর মতো মাটিতে পা ফেলে দ্রুত কয়েক পদক্ষেপে আমার কাছে পৌঁছালেন। সমস্ত লোকজনের সামনেই আমাকে বুকে জাপটে ধরে শূন্যে তুললেন। তার ছেলেমি দেখে আমার হাসি পেল।
একেবারে সত্যি কথা মহামান্য। অনেক দিন হয়ে গেল। এক ঘন্টা আপনি না থাকলে মনে হয় এক সপ্তাহ সূর্য উঠেনি।
এবার তিনি আমাকে মাটিতে নামিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। দেখলাম তার সারা দেহ ধূলিধূসরিত আর ময়লায় মাখামাখি হয়ে রয়েছে। বুঝা যাচ্ছে কষ্টকর একটি অভিযান থেকে সদ্য এসেছেন। তবে তার মাঝেও ফারাওয়ের মর্যাদা পরিস্ফুট হয়ে রয়েছে। পাশেই অপেক্ষারত বোনদের দেখে একের পর এক দুজনকেই বুকে জড়িয়ে আদর করার পর আবার আমার কাছে এলেন।
জেটিতে বাঁধা বিশাল তিনতলা জাহাজ তিনটে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এগুলো কি জাহাজ? মাস্তুল আর দাঁড় ছাড়াই এগুলো আমার দেখা যে কোনো জাহাজের চেয়ে দ্বিগুণ বড় মনে হচ্ছে। এগুলো কোথায় পেলে তায়তা? তাকে আমি যে বার্তা পাঠিয়েছিলাম তা ছিল সাংকেতিক আর সেখানে বিশদ বর্ণনা ছিল না। যাইহোক আমার উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করে সাথে সাথে আবার বললেন, ষণ্ডা-গুণ্ডার মতো চেহারার ওই লোকগুলোর পরিচয় কী? আমি তোমার সাথে মাত্র কয়েকজন লোক দিয়েছিলাম, আর এদিকে তুমি দেখছি তোমার নিজস্ব ছোট্ট একটা সেনাবাহিনী নিয়ে ফিরে এসেছ তায়তা।
তিনি জেটি থেকে সমাধির ফটক পর্যন্ত সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর দিকে তাকালেন। তার কাছাকাছি যারা ছিল তারা কাঁধের বোঝা মাটিতে নামিয়ে নতজানু হয়ে তার প্রতি সম্মান দেখাতে শুরু করলো।
এদের চেহারা দেখে ভুল বুঝবেন না, মহামান্য। এরা ষণ্ডা-গুণ্ডা নয়। এরা মিসরের সাহসী তোক আর প্রকৃত যোদ্ধা।
আবার জাহাজ তিনটির দিকে তাকিয়ে বললেন, কিন্তু এই জাহাজগুলোর বিষয়টা কী? এগুলো সম্পর্কে কী বলবে?
আমি তাকে অনুরোধ জানিয়ে বললাম, দয়া করে আমার সাথে আসুন, নিরালায় বসে সবকিছু খুলে বলছি।
ঠিক আছে তায়তা। তুমিতো আবার সবসময় গোপনীয়তা পছন্দ কর, তাই না? তারপর তিনি সমাধির প্রবেশপথের দিকে এগিয়ে চললেন। আমিও ফারাও ত্যামোসকে অনুসরণ করে তার বাবার অনুমিত সমাধির দিকে এগোলাম।
প্রথম কোষাগারে ঢুকে কামরাভর্তি সারি সারি সাজানো কাঠের বাক্সগুলোর দিকে তাকালেন। তবে কোনো মন্তব্য করলেন না।
দ্বিতীয় কামরায় যাওয়ার আগে কেবল বললেন, আশ্চর্য, সমস্ত বাক্সের গায়ে সর্বাধিরাজ মিনোজের মার্কা মারা রয়েছে দেখছি। তৃতীয় কামরায় পৌঁছতেই এটন তাকে দেখে হাঁটুগেড়ে সম্মান জানাল।
আরও অবাক লাগছে তায়তা, আমার রাজপ্রসাদের পরিচালকও দেখছি তোমার এই গোপন ক্রিয়াকলাপের সাথে নিজেকে জড়িয়েছেন। তারপর ফারাও একটা কাঠের বাক্সের উপর বসে দুপা সামনে ছড়িয়ে দিয়ে বললেন, এবার বল তায়তা। সবকিছু খুলে বল।
