দুই রাজকুমারিকে উদ্দেশ্য করে আমি বললাম, এই যে মেয়েরা, তোমরা আমাকে আর এটন চাচাকে সাহায্য করতে পারো। তোমরা দুজনেই গুণতে আর লিখতে পারো, যা এই বোকা লোকগুলোর একশো জনের মধ্যে একজনও পারে কি না সন্দেহ। কথাটা বলে আমি মাথা ঝাঁকিয়ে কাজ করা সারিবদ্ধ অর্ধনগ্ন লোকগুলোর দিকে দেখালাম।
এবার দুই বালিকাই হিসাব রক্ষকের কাজে লেগে পড়লো, যেন এটা একটা খেলা।
আমার নির্দেশ অনুযায়ী জারাস প্রথম ধনাগারে দুটো ভারী দাড়িপাল্লা স্থাপন করেছিল। আমি আর এটন এই দুটো পাল্লার ব্যবস্থাপনায় বসলাম। একটা একটা সিন্দুক পাল্লায় ঝুলাতেই আমি ওজনটা উচ্চারণ করতেই মেয়েরা লিখে রাখতে শুরু করলো। বেকাথা এটনের সাথে আর তেহুতি আমার সহকারী হিসেবে কাজ করতে লাগলো। ওরা একটা একটা সিন্দুকের ওজন একটা লম্বা প্যাপিরাস কাগজে লিখতে লাগলো আর দশটা সিন্দুকের ওজন হতেই সবগুলোর ওজন যোগ করে লিখতে লাগলো।
প্রথম কোষাগারে মোট ২৩৩ লাখ খাঁটি রূপা রাখা হল। এরপর আমি লোকজনদের একঘন্টা বিশ্রাম নিয়ে খাওয়াদাওয়া সেরে নিতে উপরে পাঠিয়ে দিলাম। আমরা একা হবার পর আমি আমার প্রতিজ্ঞামতো মেয়েদেরকে সিন্দুকের ভেতরে যে ধনরত্ন আছে তা দেখালাম। একটা সিন্দুকের ঢাকনা খুলে একটা রূপার পিণ্ড দেখার জন্য ওদের হাতে তুলে দিলাম।
বেকাথা ওরা গলার হারটায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো, এটা আমার গলার হারের মত সুন্দর নয়।
চারপাশের সিন্দুকগুলোর দিকে তাকিয়ে তেহুতি জিজ্ঞেস করলো, এগুলো সব তোমার তায়তা?
আমি গম্ভীরভাবে উত্তর দিলাম, এগুলো সব ফারাওয়ের। আমার কথা শুনে সে মাথা নাড়লো। তারপর চারপাশে চোখ বুলিয়ে পরিমাণটা আন্দাজ করতে লাগলো। গণনা শেষ হওয়ার পর তার ঠোঁটে মৃদ হাসি দেখা গেল। তারপর সে বললো, আমরা তোমার কাজে খুবই খুশি তায়তা!
.
লোকজন আবার ফিরে এলে আবার ওদেরকে কাজে লাগালাম। ওরা
দাঁড়িপাল্লাটা দ্বিতীয় কোষাগারে নিয়ে চললো। এটা আগেরটার চেয়ে একটু ছোট, এতে আমরা আরও ২১৬ লাখ রূপা রাখলাম।
এমন সময় জারাস জেটি থেকে ফিরে এসে জানাল প্রথম দুটি তিনতলা ট্রাইরেম জাহাজের মাল সম্পূর্ণ খালাস করা হয়ে গেছে। এখন কেবল শেষ জাহাজে কিছু রূপা রয়ে গেছে।
সে একটু সতর্কসুরে বললো, ভোর হয়ে আসছে তায়তা। লোকজন সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আসলে কাজ করতে করতে আমার খেয়ালই ছিল না যে কখন রাত শেষ হয়ে এসেছে। আমিও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম, তবে অধিকাংশ লোকের তুলনায় আমার কর্মক্ষমতা অনেক বেশি ছিল।
তোমরা সবাই বেশ ভালো কাজ করেছ জারাস। তবে আমি তোমাদেরকে আরেকটু থাকতে বলবো। এখন জেটিতে গিয়ে দেখতে চাই আর কতটুকু কাজ বাকি আছে।
আর তখনই আমি একটা মারাত্মক ভুল করে ফেললাম।
পেছন ফিরে দেখলাম তেহুতি টুলে বসে মাথা নুইয়ে প্যাপিরাস কাগজ নিয়ে হিসেবের কাজ করছিল। একমাথা সোনালি চুল ঢেউয়ের মত নিচে নেমে তার মুখ ঢেকে ফেলেছিল। কাজের চাপে সে চুল আঁচড়াবারও সময় পায় নি।
তাকে বললাম, তেহুতি, তুমি একজন ক্রীতদাসির মতো অনেক পরিশ্রম করেছ। এখন আমার সাথে উপরে চল। রাতের শীতল বাতাসে একটু সতেজ হয়ে নেবে।
তেহুতি উঠে দাঁড়াল। মাথা ঝাঁকিয়ে মুখ থেকে চুল সরিয়ে জারাসের দিকে তাকাল। জারাসও তার দিকে তাকাল।
মশালের আলোয় আমি দেখলাম তেহুতির সবুজ চোখের মনিদুটো বড় হয়ে উঠেছে। আর একই সাথে শুনতে পেলাম অন্ধকারের দেবতার হাসি।
ওরা একজোড়া মার্বেল পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
আমি তেতির চোখ দিয়ে জারাসের দিকে তাকালাম। যদিও আমি পুরুষের চেয়ে একজন নারীর সৌন্দর্য্যের সঠিক পরিমাপ করতে পারি, তবে আজ প্রথম লক্ষ্য করলাম যে, জারাস সাধারণের চেয়ে অনন্য। তার বংশ পরিচয় তেমন আহামরি না হলেও তার চতুর্দিক ঘিরে একধরনের কর্তৃত্বব্যঞ্জক আভা রয়েছে। তার ভাবভঙ্গি এবং আচরণ অভিজাত শ্রেণীর।
আমি জানি তার বাবা থিবসের একজন বণিক, নিজ প্রচেষ্টায় বিশাল ভাগ্য গড়ে তুলেছেন। ছেলেকে মানুষ করতে যথাসাধ্য করেছেন। জারাস বুদ্ধিমান। এবং রসজ্ঞান সম্পন্ন। একজন ভালো সৈনিক। তারপরও তার বংশ পরিচয়ের কারণে সে ত্যামোস রাজবংশের একজন রাজকুমারির সমকক্ষ হতে পারে না। যাইহোক ফারাও সিদ্ধান্ত নেবেন কে হবে রাজকুমারির উপযুক্ত পাত্র, তবে
আমার কাছ থেকে অবশ্যই এ বিষয়ে উপদেশ নেবেন।
অতিদ্রুত আমি ওদের দুজনের মাঝে দাঁড়িয়ে তাদের চোখাচোখি হওয়ার সুযোগটা ভেঙে দিলাম। তেহুতি এমনভাবে আমার দিকে তাকাল যেন আমি একজন আগন্তুক, যাকে সে আগে কখনও দেখেনি। তার হাত ছুঁতেই সে কেঁপে উঠে এবার আমার চোখে চোখ রাখলো।
আমি বললাম, এসো আমার সাথে তেহুতি। তারপর তার মুখের দিকে লক্ষ্য করলাম, সে অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে আমাকে বললো,
হ্যাঁ, অবশ্যই যাবো তায়তা। ক্ষমা কর, আমি একটু অন্যমনষ্ক হয়ে পড়েছিলাম। চল যাই।
আমি পথ দেখিয়ে তাকে কোষাগার থেকে বের করে আনলাম, জারাসও অনুসরণ করলো। তার প্রতিটি পদক্ষেপে মনে হচ্ছিল যেন, সে একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে। আমি তাকে ভালোকরেই জানতাম, তবে তার এরকম অবস্থা কখনও দেখিনি।
আবার আমি সেই তরুণ যুগলের মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে বললাম, তুমি নয় ক্যাপ্টেন জারাস। তুমি দাঁড়িপাল্লাটা পরের কামরায় নেবার ব্যবস্থা কর। তারপর তোমার লোকজন একটু বিশ্রাম নিতে পারে।
