সাবধানে কাপড়ের ভাঁজটা খুলতেই একটা আংটি ঝিকমিক করে উঠলো। সে দম আটকে চেঁচিয়ে উঠলো। এতো উজ্জ্বল জিনিস আমি কখনও দেখিনি।
আমি বললাম, এটা তোমার মধ্যমায় পর।
এটা খুব বড়। খুলে যায়।
তার কারণ এটা একটা বিশেষ ধরনের পাথর। তুমি এটা কোনো পুরুষকে দেখাবে না, শুধু...
শুধু কি?
শুধু যদি তুমি চাও সে তোমার প্রেমে পড়ক। আর নয়তো এটা তোমার হাতের তালুতে লুকিয়ে রাখবে। মনে রেখো এর জাদু শুধু একবারই কাজে আসবে। কাজেই খুব সাবধানে এটা কাউকে দেখাবে।
সে আঙুল দিয়ে আংটিটা শক্ত করে চেপে ধরে রাখলো। তারপর দৃঢ়কণ্ঠে উত্তর দিল, আমি চাই না কোনো পুরুষ আমাকে ভালোবাসুক।
কেন?
কারণ, ওরা শরীরে একটা বাচ্চা ঢুকিয়ে দিতে চেষ্টা করে। আর একবার বাচ্চাটা ভেতরে ঢুকলে আর বের হতে চায় না। আমি হেরেমে অনেক মহিলাকে চিৎকার করে আর্তনাদ করতে শুনেছি। আমি এরকম করতে চাই না।
আমি মৃদু হেসে বললাম, একদিন তুমি তোমার মত বদলাবে। তবে এই পাথরের আরও কিছু গুণের কারণে এটা বিশেষ ধরনের হয়েছে। বেকাথা বলে উঠলো, বল, কী এমন বিশেষ গুণ আছে এটার তায়তা?
একটা গুণ হল এটা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্ত জিনিস। কোনো কিছু দিয়ে এটা কাটা যায় না, আর সবচেয়ে ধারালো ব্রোঞ্জের ড্যাগার দিয়েও এটার গায়ে আঁচড় কাটা যায় না। এজন্য এটাকে বলা হয় হীরা–সবচেয়ে কঠিন জিনিস। পানিতে ভিজে না। তবে যে মেয়ে এটা পরবে তার গায়ে এটা জাদুর মতো লেগে থাকবে।
সন্দেহের সুরে তেহুতি বললো, তোমার কথা আমি বিশ্বাস করি না তায়তা। এটা তোমার বানানো আরেকটা গল্প।
ঠিক আছে, দেখো আমার কথা ঠিক হয় কি না। তবে মনে রেখো, যদি তুমি কাউকে সত্যিকার ভালোবাস আর চাও যে সেও তোমাকে সারাজীবন ভালোবাসুক, তাকে ছাড়া আর কোনো পুরুষকে এটা দেখাবে না। জানি না কেন তাকে একথা বললাম, তবে মেয়েদুটো আমার কাছে গল্প শুনতে পছন্দ করে আর আমি কখনও তাদের হতাশ করি না।
টাব থেকে উঠে গা মুছার জন্য আমার প্রধান দাস রুস্তিকে ডেকে একটা তোয়ালে আনতে বললাম।
এবার তেহুতি অনুযোগ করে বললো, তুমি আবার চলে যাচ্ছো তায়তা। এখন সে বেশ বড় হয়েছে আর একজন সাবালিকার মতোই ভেবেচিন্তে কথা বলতে শিখেছে। মাত্র এক ঘন্টার জন্য এসে আবার চলে যাচ্ছ। এবার হয়তো চিরদিনের জন্য চলে যাচ্ছ। তার চোখে পানি চলে এসেছে।
আমি তোয়ালেটা ফেলে তাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, না! না! এটা সত্য নয়। আমি শুধু পূর্ব তীরে তোমার বাবার শূন্য সমাধি পর্যন্ত যাচ্ছি।
বেকাথা বললো, যদি এ কথা সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে আমাদেরকেও সাথে নিয়ে চল।
কথাটা শুনে ভেবে দেখলাম প্রস্তাবটা মন্দ নয়। ওদের মতো আমারও ভালো লাগবে।
ছদ্ম অনিচ্ছা দেখিয়ে বলো, একটা সমস্যা আছে। আমরা খুব গোপন একটা কাজ করতে যাচ্ছি। তোমাদেরকে কথা দিতে হবে যা দেখবে তা কাউকে বলতে পারবে না।
কথাটা শুনে বেকাথার দুচোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো, সে বললো, গোপন ব্যাপার! সমস্ত দেবতার নামে আমি শপথ করছি তায়তা, কাউকে কিছু বলবো না।
.
দুই রাজকুমারি, এটন আর আমি যখন ফারাও ম্যামোজের সমাধির ফটকের কাছে পৌঁছলাম, তখনও রত্নবোঝাই জাহাজ তিনটি এর কাছেই জেটিতে বাঁধা ছিল।
আমার অনুপস্থিতিতে জারাস ওর লোকজন নিয়ে কাজ করে চলছিল। আশেপাশের পাহাড়গুলো থেকে যেন আমাদেরকে না দেখা যায়, সেজন্য ওরা সমাধির চারপাশ ঘিরে নলখাগড়ার বেড়ার পর্দা দিয়ে ঢেকে রেখেছিল। আমার ইচ্ছা ছিল রাত জেগে সমস্ত জাহাজগুলো থেকে রতুগুলো নামিয়ে ফেলা। রাতের অন্ধকারের আড়ালে হাইকসো গুপ্তচরেরা এসে উঁকিঝুঁকি দিতে পারে। তাছাড়া আমাদেরকে মশাল জ্বালিয়ে কাজ করতে হবে, কাজেই গোপনীয়তা রক্ষার জন্য পর্দা খুবই জরুরী।
তামিয়াতে আমি যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলাম, তা কাজে লাগিয়ে এখনকার মাল খালাসের বিষয়টা পরিকল্পনা করলাম। দিলবার আর তার লোকজনকে প্রথম জাহাজের ডেক থেকে কাঠের তক্তা খুলে বারকোশের মত কাঠামো বানাতে বললাম। আট হাত চওড়া এই কাঠামোটি জাহাজের খোলের মুখে এঁটে যাবে। তারপর প্রতিটি জাহাজের খোলের মুখের ঠিক উপরের ডেকে তেপায়া টুল আর কপিকল স্থাপন করলাম। সেখান থেকে আমার লোকেরা ভারি কাঠের বারকোশগুলো নিচে নামিয়ে জাহাজের খোলে ঢুকালো। আর খোলের ভেতরে থাকা অন্য দল সিন্দুকগুলো কাঠের বারকোশের উপর সাজিয়ে রাখলো।
বিশটা করে সিন্দুক এভাবে খোল থেকে বের করে উপরে ডেকে তোলা হল, তারপর সেখান থেকে ঝুলিয়ে জেটিতে নামিয়ে রাখা হল।
তেহুতি জিজ্ঞেস করলো, এই সিন্দুকগুলোতে কী আছে তায়তা? আমি নাকে হাত রেখে খুব গোপনীয়তার ভাব দেখিয়ে বললাম, এটাই সবচেয়ে বড় রহস্য। তবে শিঘ্রই আমি তোমাদেরকে দেখাবো কী আছে এগুলোর ভেতরে। আর একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা কর।
বেকাথা আমাকে মনে করিয়ে দিল, আমি কিন্তু বেশিক্ষণ ধৈর্য ধরতে পারবো না।
সার বেঁধে থাকা অনেক মানুষ সিন্দুকগুলো বারকোশ থেকে তুলে নিল। জেটি থেকে শুরু করে মানুষের সারি সমাধির প্রবেশ পথ দিয়ে চারধাপ সিঁড়ি নেমে রং করা সুসজ্জিত সুড়ঙ্গে ঢুকলো, তারপর বিশাল তিনটি কামরা পার হয়ে চারটি ধনাগারে পৌঁছলো। ফারাওয়ের শূন্য সমাধির চারপাশ ঘিরে ধনাগারগুলো স্থাপন করা হয়েছিল। বিশাল একটি পাহাড় কেটে আমি বিশ বছর ধরে দুই হাজার শ্রমিক লাগিয়ে এই প্রশস্ত দালানটি নির্মাণ করেছিলাম। কাজটি করতে পেরেছি বলে আমি এখনও গর্ববোধ করি।
