ধোকা খাওয়ার মত ভান করে হাতটার দিকে অবাক হয়ে তাকালো। এতোকাল। প্রাসাদ সরকার পদে টিকে থাকতে গেলে একজনকে অবশ্যই পাকা অভিনেতা হতে হয়।
তারপর সে মাথা নাড়তে নাড়তে প্রথমে মৃদুভাবে চুকচুক করলো, তারপর তার খুশির মাত্রা বেড়ে যেতেই হাসিতে ফেটে পড়লো। তার ভুড়ি থেকে শুরু করে শরীরের প্রতিটা অঙ্গ হাসির দমকে কাঁপতে শুরু করলো। তারপর হঠাৎ হাসি থামিয়ে পাশের প্রস্রাবখানায় ঢুকলো। প্রথমে একটু নীরবতা, তারপর জলপ্রপাত থেকে নীলনদের উপর পানির প্রবাহ পড়ার মতো শব্দ শুরু হল। বেশ কিছুক্ষণ এরকম চলার পর এটন ফিরে এলো।
তোমার ভাগ্য ভালো বন্ধু যে, আমি সময়মত প্রস্রাবখানায় পৌঁছতে পেরেছিলাম, আর নয়তো রাজা বিওনের মত তুমিও ডুবে মরতে।
তুমি কীভাবে জানলে যে, বিওন পানিতে ডুবে মরেছে?
তুমি সামনে যা দেখছো, তা ছাড়াও আমার অন্য কান আর চোখ আছে।
এতোই যদি জানো তবে মিনোজের সম্পদ সম্পর্কে কিছু বল?
সে অনুতপ্তভাবে মাথা নেড়ে বললো, এ-সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। তুমি হয়তো জানো।
আমি শুধু জানি যে, তুমি ভুল বলেছিলে।
কী ধরনের ভুল সেটা?
তুমি বলেছিলে এই সম্পদের পরিমাণ এক লাখ হবে, তাই না? সে মাথা নেড়ে সায় দিল।
পরিমাণটা দুঃখজনকভাবে ভুল বলেছিলে।
সে বললো, একথা প্রমাণ করতে পারবে?
আমি তাকে নিশ্চয়তা দিয়ে বললাম, এর চেয়েও ভালো কিছু বলতে পিরবো, এটন। আমি তোমাকে এটি ওজন করতে দেবো। যাইহোক প্রাসাদ ছেড়ে যাওয়ার আগে আমি ফারাওকে একটা বার্তা পাঠাতে চাই।
কামরায় এককোণে রাখা লেখার সরঞ্জামের দিকে দেখিয়ে এটন বললো, তুমি তোমার বার্তাটা লিখে ফেল, সন্ধ্যার আগেই ফারাও তার হাতে এটা পাবেন।
আমার বার্তাটি ছিল ছোট আর সাংকেতিক ভাষায় লেখা। এটনের হাতে বার্তাটা দিয়ে তাকে বললাম, কিছু মনে করো না। প্রায় দুই সপ্তাহ যাবত আমি স্নান করিনি আর পোশাক বদলাইনি। আমাকে এখনি নিজের ঘরে একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হতে হবে।
নিজের ঘরে পৌঁছাবার সাথে সাথে আমি একজন ক্রীতদাসকে রাজকীয় জেনানা মহলে পাঠালাম রাজকুমারিদের কাছে একটা বার্তা পৌঁছাতে।
মাত্র আমি উষ্ণ পানির চৌবাচ্চায় পা দেব, ঠিক তখনই দুই রাজকুমারি মরুর খামসিন ঝড়ের বেগে এসে পৌঁছাল। এই পৃথিবীতে একমাত্র তাদের সামনেই আমি পোশাক না পরা অবস্থায় দাঁড়াই। আর আমার ক্রীতদাসদের সামনে, ওরা অবশ্য আমার মতোই খোঁজা।
এখন তেহুতি আর বেকাথা আমার মার্বেল পাথরের স্নানের চৌবাচ্চার কিনারায় পা ঝুলিয়ে বসলো। বেকাথা তার ছোট্ট সুন্দর পাদুটো দোলাতে দোলাতে অনুযোগ করলো, তুমি যাওয়ার পর সবকিছু একেঘেয়ে লাগছিল। কী এমন তুমি করছিলে যে এতো দেরি হল ফিরতে তোমার? এখন কথা দাও, এরপর কোথাও গেলে আমাদের সাথে নিয়ে যাবে। এই কঠিন প্রতিজ্ঞা এড়াতে আমি গরম পানি মাথায় ঢালতে শুরু করলাম।
এবার তেহুতি কথা শুরু করলো, আমাদের জন্য কোনো উপহার এনেছো তায়তা? নাকি আমাদের কথা ভুলে গিয়েছিলে? বড়বোন হিসেবে খাঁটি জিনিসের মূল্য সে ঠিকই বুঝে।
আমি উত্তর দিলাম, অবশ্যই এনেছি। কী করে আমি আমার ছোট্ট দুই রাজকুমারির কথা ভুলে যেতে পারি। আমার কথা শুনে দুজনেই খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠলো।
বিকাথা কিচমিচ করে বললো, দেখাও।
যাও পাশের কামরায় কৌচের উপর থেকে আমার ব্যাগটা নিয়ে এসো। বেকাথা একছুটে চলে গেল, তারপর নাচতে নাচতে চামড়ার ব্যাগটা হাতে ঝুলাতে বুলাতে ফিরে এলো।
তারপর ব্যাগটা কোলে নিয়ে মার্বেলের মেঝেতে আসন গেড়ে বসলো।
আমি বললাম, খোল! আমার রাজকুমারিদের কথা মনে রেখেই আমি তামিয়াত দুর্গে বন্দী মিনোয়ান সেনাকর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া অলংকার থেকে দুটি অলংকার বেছে নিয়েছিলাম।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, দেখোত লাল কাপড়ে মোড়া একটা জিনিস আছে কি না?
হ্যাঁ, আছে তায়তা, এটা কি আমার? লালটা কি আমার জন্য এনেছ?
হ্যাঁ, অবশ্যই তোমার জন্য।
ছোট কাপড়ের পুটলিটা খুলতে গিয়ে উত্তেজনায় ওর হাত কাঁপছিল। সোনালি হারটা তুলে ধরতেই তার চোখ খুশিতে ঝিকমিক করে উঠলো। ফিসফিস করে সে বলে উঠলো, এতো সুন্দর জিনিস আমি কখনও দেখিনি।
হারটি থেকে ছোট ছোট দুটি মূর্তি ঝুলছে। ছোট হলেও মূর্তিদুটোর খুঁটিনাটি সবকিছু পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে। বড়টি ছিল একটি আক্ৰমণদ্যোত ষাঁড়ের মূর্তি। শিং দুটো বাঁকা করে আক্রমণের ভঙ্গিতে মাথা নোয়ান। সবুজ পাথরের ছোট ছোট দুটো চোখ। বঁড়টি একটি সুন্দর মেয়ের মূর্তিকে আক্রমণ করছিল। ভয়ংকর শিংদুটোর আওতার বাইরে মেয়েটি নাচছে। মাথায় ফুলের মালা আর বুকে দুটো লাল রুবি। মাথা পেছনে হেলিয়ে মেয়েটি হাসছিল।
হারটা দুই হাতে দোলাতে দোলাতে বেকাথা বললো, মেয়েটি এতো দ্রুত ছুটছে যে ষাঁড়টি কখনও তাকে ধরতে পারবে না।
ঠিক বলেছ তুমি। ভয়ঙ্কর বিপদের বিপরীতে মেয়েটি হল সৌন্দৰ্য্য। তুমি এটা পরলে বিপদ তোমাকে ছুঁতে পারবে না। এটা তোমাকে সবধরনের বিপদ থেকে রক্ষা করবে। ওর হাত থেকে হারটা নিয়ে ওর গলায় পরিয়ে পেছনের হুকটা লাগিয়ে দিলাম। সে নিচের দিকে তাকিয়ে কাঁধে ঝাঁকুনি দিতেই মূর্তিদুটো নেচে উঠলো। হেসে উঠতেই তাকে আরও সুন্দর দেখালো।
তেহুতি এতোক্ষণ ধৈর্য ধরে চুপ করে বসেছিল। আমি একটু অপরাধবোধ করে তার দিকে ফিরে বললাম, রাজকুমারি, তোমার উপহারটা ঐ নীল কাপড়ে মোড়ানো আছে।
