পরিশেষে আমি প্রধান পুরোহিতকে সমাধি আর অন্যান্য স্থাপনায় ঢোকবার সমস্ত চাবির গোছা আমার হাতে দিতে নির্দেশ দিলাম। তারপর আমি আর জারাস জাহাজে ফিরে গেলাম।
রাজার উপত্যকার প্রবেশ পথ থেকে নদীর তীর পর্যন্ত জায়গাটি বিশ হাত ঢালু ছিল। তবে আমাদের প্রত্যেকটা জাহাজ এই উচ্চতায় তুলতে চারটি আলাদা জলকপাট বা গ্লুইস গেট প্রয়োজন। তারপরই এগুলোকে সমাধিসৌধে আনা যাবে। আমরা প্রথম জাহাজটি দাঁড় বেয়ে মন্দিরের নিচে জলকপাটের মধ্যে এনে এর দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। এই জলাধারের মধ্যে পানির উচ্চতা বাইরের খালের চেয়ে পাঁচ হাত নিচু ছিল।
আমি আমার তিন জাহাজের অধিনায়কদের দেখালাম কীভাবে মাটির কপাটটি খুলতে হয়। উপরের খাল থেকে নিচের জলাধারে পানি নেমে ধীরে ধীরে বিশাল জাহাজটিকে উপরের জলাধারের সমান উচ্চতায় তুলে আনলো। কপাটটি বন্ধ হয়ে যাবার পর গুণ টেনে জাহাজটিকে পরবর্তী জলাধার পর্যন্ত নিয়ে যাবার জন্য আমাদের পঞ্চাশজন মানুষ অপেক্ষা করছিল। এর পেছনে দ্বিতীয় জাহাজটি উপরে তোলার জন্য একই প্রক্রিয়ায় কাজ শুরু হল।
এ-ধরনের কোনোকিছু আমার লোকেরা কখনও দেখেনি, অবশ্য এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, কেননা এই পদ্ধতি আমিই আবিষ্কার করেছিলাম। সারা পৃথিবীতে এরকম পদ্ধতি আরেকটিও নেই। ওরা এতো অবাক হয়ে গিয়েছিল যে, ওদের মনে হয়েছিল এটা একধরনের জাদুকরী ব্যাপার।
সৌভাগ্যবশত এই কাজের জন্য আমার কাছে দুইশো মানুষ ছিল। মিনোয়ানরা যে ক্রীতদাসদের শিকলে বেধে নিচের ডেকে রেখেছিল ওরাও ছিল এদের মধ্যে। অবশ্য ওরা এখন মুক্ত মানুষ, তবে ওরা কৃতজ্ঞতাবশত সব কাজ করে যাচ্ছিল।
জাহাজটি উপরে তোলার জন্য উপরের জলাধার থেকে যে পানি সরানো হয়েছিল তা আবার ভর্তি করার প্রয়োজন ছিল। কয়েকটা সেচ করার শাদুফ যন্ত্র দিয়ে আমি নদী থেকে নতুন পানি পাম্প করে তোলার ব্যবস্থা করলাম। এগুলো ছিল দুই বিপরীত প্রান্তে ওজন রাখা বাকেট শিকল বা কপিকল, যা দুইজন মানুষ চালাতে পারে। এটি একটি পরিশ্রম সাধ্য কাজ যা, প্রত্যেক জাহাজের জন্য চারবার করে করতে হয়েছিল।
প্রথম জলকপাটের মধ্যে তোলার আগে প্রত্যেক জাহাজের পাল আর মাস্তুল উপরের ডেকে সমান করে বিছিয়ে রাখা হয়েছিল। তারপর জাহাজটি নলখাগড়া দিয়ে বুনা মাদুর দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়েছিল, যাতে দেখে মনে হচ্ছিল এটা একটি আকৃতিহীন ময়লার স্তূপ। পরদিন সকালে থিবসের লোকজন ঘুম থেকে উঠে নদীর এপারে তাকালে অস্বাভাবিক তেমন কিছু দেখতে পাবে না। তিনটি তিনতলা জাহাজই অদৃশ্য হয়ে গেছে, যেন কখনও এগুলোর অস্তিত্ব ছিল না।
পরদিন সূর্যোদয়ের সময় আমরা সমতল ভূমির উপর দিয়ে জাহাজগুলো টেনে নিয়ে ম্যামোজের সমাধিসৌধের প্রবেশ পথের কাছে এসে বাঁধলাম। লোকগুলো এত পরিশ্রমের পর ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, তাই আমি জারাসকে নির্দেশ দিলাম ওদের সবার খাবারের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে আরও কিছু শুকনো মাছ, বিয়ার আর রুটি দিতে আর দিনের বাকি গরম সময়টা বিশ্রাম নিতে বললাম।
পায়ে চলার পথ দিয়ে হেঁটে আমি মন্দিরে ঢুকলাম। মনে হল পুরোহিতরা গত সন্ধ্যার কষ্টসাধ্য যাবতীয় ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের ধকল কাটিয়ে উঠেছে। মন্দিরের ডিঙিতে করে ওরা আমাকে নদীর উপর দিয়ে নিয়ে চললো। আমার অভিযানের সফলতার খবর দেবার জন্য আমি ফারাওয়ের কাছে যাচ্ছি।
এই দায়িত্বটি আমি খুবই পছন্দ করি। ফারাওয়ের প্রতি আমার পরম ভক্তি ছিল, তবে এর চেয়েও বেশি ছিল তার মা লসট্রিসের প্রতি। তবে এইটুকুই শুধু বলবো যে, রাজপরিবারের সকল সদস্যের প্রতি আমার ভক্তি ছিল।
আমার অনুগত পুরোহিতরা আমাকে শহরের বাজারের কাছে নদীর তীরে সিঁড়ির কাছে নামিয়ে দিল। সকাল হলেও বাজারে লোক সমাগম যথেষ্ট ছিল। সরু গলি দিয়ে প্রাসাদের ফটকের দিকে হেঁটে চললাম। ভাঙাচোরা শিরস্ত্রাণ আর মুখ ঢাকা ময়লা মুখোশের কারণে কেউ আমাকে চিনতে পারেনি।
প্রাসাদের ফটকে পৌঁছার পর মুখ থেকে ছদ্মবেশ সরাতেই প্রাসাদ রক্ষীদলের অধিনায়ক সাথে সাথে আমাকে চিনতে পেরে শ্রদ্ধার সাথে অভিবাদন জানালো।
আমি তাকে বললাম, আমাকে এখনি ফারাওয়ের সাথে দেখা করতে হবে। একজন বার্তাবাহক পাঠিয়ে তাকে জানাও আমি তার সাথে দেখা করার জন্য আনন্দের সাথে অপেক্ষা করছি।
ক্ষমা করুণ প্রভু তায়তা। ফারাও থিবসে নেই। খুব শিগ্রি ফিরে আসবেন বলে মনে হয় না।
আমি মাথা নাড়লাম। একটু হতাশ হলেও খুব একটা অবাক হই নি। জানতাম ফারাও অধিকাংশ সময় উত্তরে হাইকসোদের বিরুদ্ধে অন্তহীন অভিযানে সময় আর শ্রম ব্যয় করেন। তাহলে আমাকে প্রাসাদ সরকার প্রভু এটনের কাছে নিয়ে চল।
এটনের কামরার দরজায় পৌঁছতেই সে ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। তারপর বললো, কী খবর বন্ধু? তোমার অভিযান কেমন হয়েছে?
আমি মুখ অন্ধকার করে বললাম, খবর বেশ গুরুতর। তামিয়াত দুর্গে সর্বাধিরাজ মিনোজের ধনভাণ্ডার লুট হয়েছে। আর রাজা বিওনকে হত্যা করা হয়েছে।
সে আমাকে দুই হাতে ধরে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, তুমি আমার সাথে মজা করছো, তায়তা। যেকোন সৎলোক এটা শুনলেই কেঁদে ফেলবে! এমন জঘন্য কাজটা কে করলো?
আমি একটি হাত তার মুখের সামনে তুলে ধরে বললাম, হায়! একই হাত দুটো কাজই করেছে, এটন। যে হাতটি দেখলে তুমি চিনতে পারবে। সে
