দুর্ভাগ্যবশত হাইকসোরা আমাদেরকে আমাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করার আগে ফারাও ম্যামোজ একদিনের জন্যও তার সমাধিতে শুয়ে থাকতে পারেন নি। যখন আমরা দেশ ত্যাগ করে দীর্ঘ যাত্রা শুরু করেছিলাম, তখন তার স্ত্রী রানি লসট্রিস আমাদেরকে ফারাওয়ের মমিকরা দেহটি সাথে নিয়ে যেতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এর অনেক বছর পর রানি লসট্রিস আরও দক্ষিণে কয়েক হাজার লিগ দূরে জঙ্গল এলাকা নুবিয়ানে আরেকটি সমাধিসৌধ নির্মাণের নকশা বানাতে নির্দেশ দিলেন। এখন সেখানেই ম্যামোজ শায়িত রয়েছেন।
এতোবছর যাবত রাজার উপত্যকায় মূল সমাধিসৌধটি শূন্য পড়ে রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল, আমার নকশা অনুযায়ী নীল নদীর তীরে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া মন্দির থেকে রাজকীয় সমাধি পর্যন্ত যে খালটা আমি খনন করিয়েছিলাম, তা এখনও চমৎকার অবস্থায় রয়েছে। আমি এটা জানতাম, কেননা মাত্র কিছুদিন আগে আমি আমার ছোট্ট দুই রাজকুমারিকে তাদের বাবার শূন্য সমাধি দেখাবার জন্য নদীর তীরে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিলাম।
এতোগুলো বছর কেটে যাবার পরও আমি ম্যামোজের শবাধারবাহী বজরার সঠিক আয়তন মনে করতে পেরেছি। আমার স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর। আমি কখনও কোনো বিষয়, সংখ্যা কিংবা মুখ ভুলি না।
এবার আমি মিনোয়ান সম্পদবাহী তিনতলা জাহাজ তিনটির আয়তন পরিমাপ করলাম। তারপর জারাসকে বললাম জাহাজগুলো শান্ত পানিতে নোঙর করতে। এরপর সাঁতার কেটে জাহাজের তলায় গিয়ে অনুমান করলাম খোলে মূল্যবান সম্পদের ওজনসহ জাহাজটির কতটুকু পানি প্রয়োজন পড়বে। এই পরিমাপটি এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে একেক রকম হল।
সবকিছু দেখার পর খুশিমনে পানির উপরে ভেসে উঠলাম। এখন আমি ফারাও ম্যামোজের শববাহী বজরার সাথে আমাদের জাহাজের আয়তন মেলাতে পারবো। এই খালে আমাদের সবচেয়ে বড় জাহাজটি চলাচলের সময় দুই পাশে দশ কিউবিট জায়গা আর তলদেশে পনেরো কিউবিট জায়গা খালি রাখতে পারবে। আরও স্বস্তিদায়ক ব্যাপারটা হল এতো বছর ধরে আমি খালের দুইপাশে গ্র্যানাইট পাথরখণ্ড লাগিয়েছিলাম আর খালে সবসময় নীল নদীর পানি প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য একধরনের জলকপাট আর পানি উত্তোলনের জন্য সেচযন্ত্র-শাডুফ তৈরি করেছিলাম।
আমার অভিজ্ঞতা থেকে আমি জেনেছি, যদি তুমি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধার সাথে দেবতাকে সম্মান করে তার কাছে কিছু আশা কর, তাহলে তুমি নিশ্চয়ই তার প্রতিদান পেতে পার। যদিও দেবতারা অনেকসময় খামখেয়ালি হন, তবে এবার তারা ঠিকই আমাকে মনে রেখেছেন।
ঠিক করলাম সূর্যাস্তের পর খালে ঢুকবো। অন্ধকারে ফারাও ম্যামোজের অন্ত্যেষ্টি মন্দিরের নিচে পাথরের জেটিতে জাহাজ বেঁধে রাখলাম। অবশ্য ম্যামোজ এখন একজন দেবতা আর তার নিজের মন্দিরও নীল নদীর তীরে রয়েছে। এখান থেকে হেঁটেই জেটিতে পৌঁছা যায়।
মন্দিরটা বেশি বড় নয়। যখন আমরা থিবসের যুদ্ধে হাইকসোদের পরাজিত করে ফিরে এসেছিলাম তখন রানি লসট্রিস তার প্রয়াত স্বামীর স্মৃতির সম্মানে একটি মন্দির নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল তার স্বামীর প্রতি সম্মান দেখান আর নির্বাসন থেকে দেশে ফেরার জন্য দেবতার প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা।
নিশ্চিতভাবে আমাকেই তিনি এই মন্দির নির্মাণের আহ্বান জানালেন। তার ইচ্ছা ছিল এমন একটি বিশাল আর জমকালো মন্দির নির্মাণ করা, যা মিসরের আর সবকিছুকে ম্লান করে দেবে। তিনি চেয়েছিলেন মন্দিরটিতে চারশো পুরোহিত থাকবে, তবে আমি অনেক বলে তাকে সংখ্যাটি কেবল চারজন পুরোহিতে নামিয়ে এনেছিলাম।
এখন আমি আর জারাস কাউকে না জানিয়ে নদী থেকে মন্দিরের পেছন দিক দিয়ে চক্রনাভি বা মূল অংশে ঢুকলাম। সেখানে পৌঁছে আমরা আবিষ্কার করলাম সেই চার পুরোহিত পাম থেকে তৈরি সস্তা মদ পান করে একটু মাতাল হয়ে আছেন। ওদের সাথে আরও দুইজন অল্পবয়সী নারীও ছিলেন। ওরা সবাই নগ্ন হয়ে একসাথে কাদামাটির ইটের তৈরি মেঝেতে গোল হয়ে হাঁটছিলেন আর পুরোহিতরা হাততালি দিয়ে জোরে জোরে কিছু মন্ত্রোচ্চারণের মতো চিৎকার করছিলেন।
আমরা পৌঁছার কিছুক্ষণ পর তারা আমাদের উপস্থিতি টের পেলেন, মেয়েদুটো দ্রুত দেবতা ম্যামোজের মূর্তির পেছনের গোপন দরজা দিয়ে ছুটে অদৃশ্য হয়ে গেল। এরপর আর তাদের আমরা দেখিনি।
ম্যামাজের এই চার পুরোহিতের আমার প্রতি যথেষ্ট ভক্তি রয়েছে। রানি লসট্রিসের মৃত্যুর আমি তাদের মাসিক মাসোহারা নিশ্চিত রেখেছিলাম। ওরা চারজনই আমার সামনে হাঁটুগেড়ে বসে আমাকে ভক্তিশ্রদ্ধা জানিয়ে দেবতার নামে আমার মাথায় আশীর্বাদ বর্ষণ করলো।
ওদের হাঁটু গেড়ে বসে থাকা অবস্থায় আমি রাজকীয় বাজপাখির সিলমোহরটা বের করে ওদের দেখালাম। এটা দেখে ওদের মুখে আর কথা জোগাল না। প্রধান পুরোহিত হামাগুড়ি দিয়ে সামনে এগিয়ে আমার পায়ে চুমু খাওয়ার চেষ্টা করলো। আমি পিছিয়ে গেলাম আর জারাস তাকে আর সামনে এগোতে দিল না।
তারপর আমি ঐ চার পুরোহিতকে সংক্ষিপ্তভাবে আর কঠোরভাবে বললাম ফারাও ত্যামোস ছাড়া আর কাউকেই যেন ঘুণাক্ষরেও এই তিনতলা ট্রাইরেম জাহাজ সম্পর্কে কিছু না বলা হয়। এছাড়া সারা দিনরাত মন্দিরে, শূন্য সমাধিসৌধ আর খালের দুইপাশে সশস্ত্র প্রহরা থাকবে। এরপর থেকে এই পবিত্র স্থানে কেবল ক্যাপ্টেন জারাসের অধীনস্থ লোকেরা ঢুকতে পারবে। আর একই প্রহরীরা নিশ্চিত করবে যেন এই চার পুরোহিত এই জায়গার মধ্যেই নিজেদেরকে অবরুদ্ধ করে রাখে।
